leadT1ad

হারিয়ে যাচ্ছে যেসব খেলা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

শিশুরা ডাংগুলি খেলছে। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

একসময় বিকেল মানেই ছিল খেলার মাঠে শিশু-কিশোরদের কোলাহল, হাসি আর দৌড়ঝাঁপের উত্তেজনা। গ্রামের খোলা মাঠ, উঠান কিংবা পাড়ার ফাঁকা জায়গা হয়ে উঠত খেলাধুলার স্বর্গ। নব্বই দশকের শেষভাগে যেসব শিশুর জন্ম, তারাই জানে দুপুরের তীব্র রোদ শেষে বিকেল গড়ালে গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় ছেলেমেয়েদের বাহারি খেলার আসর বসত।

Ad 300x250

গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, মার্বেল, লাটিম, আরও কত কী খেলা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে বাংলাদেশের অনেক ঐতিহ্যবাহী খেলা এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া যে শুধু নগর জীবনে লেগেছে তা নয়, বাংলাদেশের গ্রামগুলোর দিকে তাকালেও এই আধুনিকতার স্পর্শ ও ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

লোকজ এই খেলাগুলো শুধু বিনোদনের মাধ্যমই ছিল না, বরং এগুলো ছিল সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন ও শারীরিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রামবাংলার শিশুরা এসব খেলায় মেতে উঠত।

কাবাডি। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
কাবাডি। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

কাবাডি

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন লোকজ খেলা কাবাডি। গ্রামবাংলার মাঠে বহুদিন ধরেই এই খেলা জনপ্রিয় ছিল। শক্তি, কৌশল ও দমের সমন্বয়ে খেলাটি গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের জাতীয় খেলাও কাবাডি। এটি আমাদের ক্রীড়া ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমানে শহুরে জীবনে মাঠ কমে যাওয়া, প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের প্রসার এবং অন্যান্য জনপ্রিয় খেলাধুলার কারণে কাবাডির চর্চা আগের তুলনায় কমে গেছে। তরুণদের আগ্রহও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।

ডাংগুলি

গ্রামবাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাগুলোর একটি ছিল ডাংগুলি। একটি ছোট কাঠি ও বড় কাঠি দিয়ে এই খেলা খেলতে হতো। ছোট কাঠিটিকে বড় কাঠি দিয়ে আঘাত করে যত দূরে পাঠানো যায়, সেটাই ছিল খেলাটির মূল উদ্দেশ্য। খেলাটি ছিল খুব সহজ, কিন্তু এতে ছিল প্রচুর উত্তেজনা। আজকাল এই খেলার নাম অনেক শিশুই জানে না।

গোল্লাছুট। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
গোল্লাছুট। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

গোল্লাছুট

গোল্লাছুট ছিল জনপ্রিয় খেলা। দলবদ্ধভাবে খেলোয়াড়রা একটি নির্দিষ্ট বৃত্ত বা ‘গোল্লা’কে কেন্দ্র করে দৌড়ঝাঁপ করত। এতে গতি, কৌশল এবং দলগত সমন্বয় প্রয়োজন হতো। একসময় গ্রামগঞ্জে এই খেলা খুব জনপ্রিয় ছিল, কিন্তু এখন মাঠ কমে যাওয়ায় এর চর্চাও কমে গেছে।

কানামাছি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
কানামাছি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

কানামাছি

‘কানামাছি ভোঁ ভোঁ, যাকে পাবি তাকে ছোঁ’ এই ছড়াটি একসময় প্রায় সব শিশুর মুখে মুখে শোনা যেত। চোখ বেঁধে অন্য খেলোয়াড়দের ধরার চেষ্টা এই সহজ নিয়মেই খেলাটি জমে উঠত। এখনকার শিশুদের কাছে এটি প্রায় অপরিচিত একটি খেলা।

দাঁড়িয়াবান্ধা

এই খেলাটি এখনো কিছু কিছু অঞ্চলে খেলতে দেখা গেলেও প্রায়ই বিলুপ্তির পথে। এই খেলায় খেলোয়াড় সংখ্যা বেশি ও দৌড়ঝাঁপ বেশি থাকায় বেশ উত্তেজনার সৃষ্টির হয়। খেলাটি ছেলেমেয়ে উভয়ে খেলতে পারে।

বউচি

বউচি ছিল মূলত মেয়েদের একটি দলগত খেলা। শ্বাস ধরে প্রতিপক্ষের এলাকায় গিয়ে কাউকে ছুঁয়ে ফিরে আসা—এই নিয়মে খেলাটি চলত। এতে সাহস, কৌশল ও শারীরিক সক্ষমতা প্রয়োজন হতো। অনেক জায়গায় এটি কাবাডির একটি লোকজ সংস্করণ হিসেবে বিবেচিত।

লাটিম খেলা। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
লাটিম খেলা। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

লাটিম

লাটিম ঘোরানো ছিল এক সময়ের জনপ্রিয় খেলা। কাঠের তৈরি লাটিমে সুতো পেঁচিয়ে মাটিতে ছুড়ে দিলে তা ঘুরতে শুরু করত। কার লাটিম বেশি সময় ঘুরবে বা কার লাটিম অন্য লাটিমকে আঘাত করবে এসব নিয়েই চলত প্রতিযোগিতা। এখন প্লাস্টিকের খেলনা ও ভিডিও গেমের ভিড়ে লাটিম প্রায় হারিয়ে গেছে।

মার্বেল

গ্রামাঞ্চলে কম বয়সী ছেলেমেয়েদের খুবই জনপ্রিয় একটি খেলার মধ্যে একটি মার্বেল খেলা। গ্রাম এলাকায় গেলেই দেখা যাবে ছেলেমেয়েরা গোল হয়ে খেলছে এ খেলা। অতি আধুনিকায়ন ও মোবাইল গেমের আসক্তিতে এসব খেলা এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।

লাঠিখেলা। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস
লাঠিখেলা। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

লাঠিখেলা

প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী একটি খেলা লাঠি খেলা। বিশেষ করে বিয়ের অনুষ্ঠানে এই খেলা খেলতে দেখা যেত। তাছাড়া মুঘল আমলে নানা উৎসব পার্বণে এই খেলার আয়োজন করা হতো। লম্বায় চার থেকে পাঁচ ফুট তৈলাক্ত একটি লাঠি ব্যবহার করে খেলোয়াড়েরা একক ও দ্বৈতভাবে খেলায় অংশগ্রহণ করত। সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট, পঞ্চগড়, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও নড়াইল জেলায় ঈদ উপলক্ষে এখনও লাঠিখেলার আয়োজন করতে দেখা যায়।

কেন হারিয়ে যাচ্ছে এই খেলাগুলো

বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি বড় কারণ এসব খেলার বিলুপ্তির পেছনে কাজ করছে।

প্রথমত, নগরায়ণ ও মাঠের সংকট। আগে গ্রাম বা শহরে খোলা জায়গা ছিল বেশি। এখন বাড়িঘর, রাস্তা ও স্থাপনার কারণে শিশুদের খেলাধুলার জায়গা কমে গেছে।

দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তার। স্মার্টফোন, ট্যাব ও ভিডিও গেম শিশুদের সময়ের বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে। ফলে তারা মাঠে গিয়ে খেলতে আগ্রহ হারাচ্ছে।

তৃতীয়ত, পড়াশোনার চাপ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন। স্কুল, কোচিং ও পড়াশোনার চাপ শিশুদের অবসর সময় কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা শেখার সুযোগও কমে গেছে।

লোকজ খেলাধুলা শুধু শারীরিক ব্যায়াম নয়, বরং এগুলো শিশুদের সামাজিকতা, নেতৃত্ব, সহযোগিতা এবং মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে এগুলো আমাদের লোকজ সংস্কৃতির অংশ। একটি সমাজের সংস্কৃতি শুধু গান, নাচ বা উৎসবেই সীমাবদ্ধ নয় খেলাধুলাও তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

সংস্কৃতি গবেষকদের মতে, এসব খেলা হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু বিনোদনের একটি মাধ্যম হারানো নয়, বরং একটি ঐতিহ্যের অবসান ঘটা।

এই খেলাগুলো বাঁচিয়ে রাখতে হলে উদ্যোগ নিতে হবে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রীড়া কর্মসূচির অংশ হিসেবে লোকজ খেলাধুলা অন্তর্ভুক্ত করা। গ্রাম ও শহরে লোকজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন করলে নতুন প্রজন্ম এসব খেলা সম্পর্কে জানতে পারবে ও খেলায় আগ্রহী হতে পারে।

পাশাপাশি, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসব বা মেলায় লোকজ খেলাধুলার আয়োজন করা হলে তা জনপ্রিয়তা পেতে পারে। গণমাধ্যমেও এসব খেলাধুলা নিয়ে প্রতিবেদন ও অনুষ্ঠান প্রচার করা প্রয়োজন।

ঐতিহ্য বাঁচানোর সময় এখনই

সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলায় এটাই স্বাভাবিক। তবে পরিবর্তনের ঢেউয়ে যদি সব ঐতিহ্য হারিয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের শিকড় সম্পর্কে জানার সুযোগ হারাবে।

বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া খেলাগুলো শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বরং আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। তাই এই খেলাগুলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। মাঠে আবার যদি শিশুদের হাসি, দৌড় আর খেলাধুলার শব্দ ফিরে আসে তবেই বাঁচবে বাংলার সেই হারিয়ে যেতে বসা খেলাধুলার ঐতিহ্য।

Ad 300x250Ad 300x250
leadT1ad

সম্পর্কিত

leadT1ad
leadT1ad