leadT1ad

এক্সপ্লেইনার

কলসিন্দুরের মেয়েরা পারে, অন্যরা পারে না কেন?

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৪: ৫৮
ফুটবল খেলছেন কলসিন্দুরের মেয়েরা। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

বাংলাদেশের নারী ফুটবলের কথা উঠলেই একটি গ্রামের নাম সবাই বলেন। সেটি ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার ছোট্ট গ্রাম ‘কলসিন্দুর’। এই গ্রাম থেকেই উঠে এসেছে মারিয়া মান্দা, আঁখি খাতুন, শামসুন্নাহার জুনিয়রের মতো একঝাঁক ফুটবলার, যারা আজ দেশের গর্ব। কলসিন্দুরের এই সাফল্যগাথা যখন হাজারো কিশোরীর জন্য অনুপ্রেরণা, তখনই একটি বড় প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে— কলসিন্দুরের মতো আর কোনো গ্রাম থেকে কেন দলে দলে মেয়েরা জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসছে না? কেন দেশের অন্য হাজারো গ্রামে প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও মেয়েরা ফুটবলে পিছিয়ে থাকছে?

Ad 300x250

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এর নেপথ্যে রয়েছে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, অবকাঠামোর সংকট এবং সুযোগের চরম অসম বণ্টন।

সামাজিক মানসিকতা ও বাধার দেয়াল

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে মেয়েদের খেলাধুলা নিয়ে এখনো গভীর সংকোচ রয়েছে। পরিবার ও সমাজের বড় একটি অংশ মনে করে, ফুটবল মূলত ছেলেদের খেলা। মেয়েরা হাফপ্যান্ট পরে মাঠে দৌড়ালে তা অনেক সময় ‘দৃষ্টিকটু’ হিসেবে গণ্য করা হয়। যেমন ২০২১ সালের ৭ অক্টোবর ইউনিসেফের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেয়েদের খেলাধুলায় অংশগ্রহণে সামাজিক বাধা ও প্রচলিত ধারণা একটি বড় সমস্যা। গ্রামের মানুষেরা মনে করে ফুটবল-ক্রিকেট ইত্যাদি মেয়েদের খেলা নয়। তাই বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামে মেয়েদের মাঠে নেমে ফুটবল খেলাকে ঘোরতর আপত্তিজনক মনে করা হয়।

তবে কলসিন্দুর এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। সেখানে স্কুল, পরিবার এবং গ্রামবাসী একজোট হয়ে মেয়েদের সমর্থন দিয়েছে।

ইউনিসেফের অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামের অনেক মেয়ে কিশোর বয়স পার হতে না হতেই বিয়ে ও সংসারের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়। ফলে নিয়মিত অনুশীলন তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। পাশাপাশি পড়াশোনার চাপ তো আছেই। অধিকাংশ পরিবার মনে করে, খেলাধুলায় সময় দিলে পড়াশোনার ক্ষতি হবে, আর এই আশঙ্কায় মেয়েদের মাঠের বদলে ঘরের কোণে আটকে রাখা হয়।

তৃণমূল পর্যায়ে প্রশিক্ষক ও অভিভাবকত্বের অভাব

কলসিন্দুরের রূপকথার নেপথ্যে কারিগর ছিলেন একদল নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। বিশেষ করে ‘ফুটবল কন্যাদের মা’ হিসেবে পরিচিত কলসিন্দুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যাপক মালা রানী সরকার এবং ফুটবল কোচ জুয়েল মিয়াসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অসামান্য ত্যাগ ও উদ্যোগে সেখানে ফুটবল চর্চা বিপ্লবে রূপ নেয়। অথচ দেশের অধিকাংশ গ্রামে এমন কোনো অভিভাবক বা দক্ষ প্রশিক্ষক নেই। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলার ন্যূনতম আয়োজনও নেই। এছাড়া জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে মেয়েদের জন্য আলাদা একাডেমি বা লিগ না থাকায় আগ্রহীরা পথ খুঁজে পায় না।

ইনোভেশন জার্নাল অব সোশ্যাল সায়েন্স অ্যান্ড রিভিউয়ে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে বাংলাদেশি গবেষক আকলিমা আক্তার তান্নি ও মাসুদুল ইসলাম খান বলেছেন, মেয়েদের খেলাধুলায় না আসার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ—প্রশিক্ষক ও মেন্টরের অভাব, প্রশিক্ষণ সুবিধার ঘাটতি ও প্রতিযোগিতার সুযোগের অভাব।

এছাড়া ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির যৌথ গবেষণায় নিরুপম পাল, রুবাইয়া আনজুম, ভুঁইয়া মো. আমিরুল মোমেনিন, এসএম আবিদ জাওয়াদ আল নূর ও সুদীপ্ত শাহরিয়ার ভুঁইয়া বলেছেন, গ্রামগুলোতে নারীদের খেলার জন্য কোনো অবকাঠামো নেই। নিরাপদ মাঠ নেই। প্রশিক্ষণের অভাব তো রয়েছেই। এসব কারণে গ্রাম থেকে কোনো নারী খেলোয়াড় উঠে আসছে না।

কলসিন্দুরে স্থানীয় ও বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় এসব সরঞ্জামের সংস্থান হলেও দেশের প্রান্তিক জনপদগুলোতে এমন সহায়তা পৌঁছায়নি।

স্কাউটিং ও সুযোগের ঘাটতি

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করলেও প্রতিভা খোঁজার বা স্কাউটিংয়ের কাজ এখনো দেশের সব অঞ্চলে সুষমভাবে বিস্তৃত হয়নি। অনেক প্রতিভাবান মেয়ে জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগই পায় না, ফলে তারা জাতীয় নির্বাচকদের নজরের আড়ালেই থেকে যায়।

এ ব্যাপারে ২০২২ সালে বাফুফের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কাজী সালাহউদ্দীন এক অনুষ্ঠানে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন শুধুমাত্র টাকা চায়, কিন্তু জেলা লিগ বা টুর্নামেন্ট আয়োজনের দায়িত্ব নিতে চায় না। এজন্য নিয়মিত জেলাভিত্তিক খেলার আয়োজন করা যাচ্ছে না।

পরিস্থিতি এখনো সেরকমই রয়েছে। জেলা পর্যায়ে কিংবা বিভাগীয় পর্যায়ে মেয়েদের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে।

এছাড়া স্থানীয় উদ্যোগে মাঝে মধ্যে যেসব টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়, সেগুলোতেও যাতায়াত সমস্যা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে মেয়েরা যোগ দেয় না।

কলসিন্দুরের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। সেখানে স্কুল ও কোচদের নিবিড় তত্ত্বাবধান থাকায় মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারগুলো আশ্বস্ত থাকতে পারে। কিন্তু অন্য গ্রামগুলোতে এমন নিরাপদ কোনো সামাজিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি।

সাফল্যের উদাহরণ ও অনুপ্রেরণার সংকট

সাফল্যই সফলতাকে টানে। কলসিন্দুরের মেয়েরা যখন একে একে জাতীয় দলে জায়গা করে নিল, তখন সেই গ্রামের ছোট মেয়েদের মধ্যেও ফুটবলের প্রতি এক ধরনের উন্মাদনা তৈরি হলো। কিন্তু যেসব গ্রামে এমন কোনো ‘রোল মডেল’ বা সফল উদাহরণ নেই, সেখানকার মেয়েরা খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে ভাবতে সাহস পায় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী ফুটবলকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিতে হলে ‘কলসিন্দুর মডেল’ অনুসরণ করতে হবে। যেমন কলসিন্দুরের ফুটবল কোচ জুয়েল মিয়া একাধিক গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কলসিন্দুরের সাফল্য সারা দেশের মেয়েদের অনুপ্রাণিত করেছে। সঠিক দিকনির্দেশনা ও যত্ন নিলে মেয়েরাও খেলায় ভালো করতে পারে। তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

সুতরাং স্কুল পর্যায়ে মেয়েদের খেলাধুলা বাধ্যতামূলক ও উৎসাহমূলক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত টুর্নামেন্ট এবং স্থানীয় কোচ তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। সঠিক প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং সামাজিক সমর্থন নিশ্চিত করতে পারলে প্রতিটি জেলা থেকেই জাতীয় মানের খেলোয়াড় উঠে আসা সম্ভব।

কলসিন্দুর প্রমাণ করেছে, সামান্য সুযোগ পেলে গ্রামের মেয়েরাও বিশ্বমঞ্চ কাঁপাতে পারে। এখন প্রয়োজন শুধু সেই সুযোগের দুয়ার প্রতিটি গ্রামে পৌঁছে দেওয়া। তাহলে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম থেকেই উদিত হবে নতুন নতুন নারী ফুটবল তারকা।

Ad 300x250Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত
leadT1ad

সম্পর্কিত

leadT1ad
leadT1ad