leadT1ad

এআইয়ে বদলাচ্ছে বলিউড, তৈরি হচ্ছে ‘ডিজিটাল সুপারস্টার’

অনেক সিনেমা একটা অংশ এখন আর সেটে নয়, হচ্ছে স্টুডিওতে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে পুরো কাজের ধরন—কীভাবে গল্প লেখা হয়, কীভাবে দৃশ্য তৈরি হয়, এমনকি কীভাবে অভিনেতার অভিনয়ও উপস্থাপন করা হয়।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৪: ৩৪
এআই জেনারেটেড ছবি

বলিউড মানেই বিশাল সেট, আলো–ঝলমলে আয়োজন, শত শত মানুষের ব্যস্ততা আর পরিচালকের গলা ফাটানো নির্দেশ। সেই চেনা দৃশ্য কি এখন কিছুটা বদলে যাচ্ছে? মুম্বাই কিংবা বেঙ্গালুরুর অনেক স্টুডিওতে ঢুকলে এখন ক্যামেরার চেয়ে বেশি চোখে পড়ে কম্পিউটার, আর শোনা যায় কিবোর্ডের শব্দ।

অনেক সিনেমা একটা অংশ এখন আর সেটে নয়, হচ্ছে স্টুডিওতে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে পুরো কাজের ধরন—কীভাবে গল্প লেখা হয়, কীভাবে দৃশ্য তৈরি হয়, এমনকি কীভাবে অভিনেতার অভিনয়ও উপস্থাপন করা হয়।

Ad 300x250

শুধু সিনেমা নয়, ধারাবাহিকও তৈরি হচ্ছে

Ad 300x250

বেঙ্গালুরুর ‘কালেক্টিভ আর্টিস্ট নেটওয়ার্ক’-এর স্টুডিও এখন যেন সিনেমার নতুন পরীক্ষাগার। তারা দীর্ঘকাল ধরে বড় বড় তারকাদের ক্যারিয়ার সামলেছেন, কিন্তু এখন তারা তৈরি করছেন ‘ডিজিটাল সুপারস্টার’। এই স্টুডিওর ল্যাবে এআই ব্যবহার করে ভারতের জনপ্রিয় পৌরাণিক কাহিনীগুলো নতুন আঙ্গিকে তৈরি হচ্ছে।

এখানে প্রযুক্তি ও অভিনয়ের মিশ্রণ দেখা যায়। অভিনেতারা বিশেষ ধরনের সেন্সর লাগানো পোশাক পরে অভিনয় করছেন। তাঁদের শরীরের নড়াচড়া ৩ডি ডেটা হিসেবে রেকর্ড করা হচ্ছে এবং ক্যামেরায় ধরা হচ্ছে মুখের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি। এরপর এই সব তথ্য এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে রূপান্তরিত হচ্ছে চরিত্রে।

‘কালেক্টিভ আর্টিস্ট নেটওয়ার্ক’। রয়টার্সের ছবি
‘কালেক্টিভ আর্টিস্ট নেটওয়ার্ক’। রয়টার্সের ছবি

যেমন হনুমান পাহাড় তুলে উড়ছেন—এই দৃশ্য আগে বানাতে বিশাল সেট, অনেক মানুষ আর ব্যয়বহুল প্রযুক্তি দরকার হতো। এখন একই দৃশ্য অনেক কম খরচে তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। শুধু সিনেমা নয়, ধারাবাহিকও তৈরি হচ্ছে এই পদ্ধতিতে।

কেন এই পরিবর্তন

এই পরিবর্তনের মূল কারণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক দুটোই। একদিকে দর্শকের অভ্যাস বদলে গেছে। আগে সিনেমা মানেই ছিল হলে গিয়ে দেখা, এখন মোবাইল বা টেলিভিশনের পর্দাই অনেকের কাছে প্রধান মাধ্যম। ফলে হলের দর্শক কমছে। সিনেমা হলের টিকিট বিক্রি থেকে রেকর্ড আয় হলেও, তা কেবল গুটিকয়েক বড় হিট সিনেমার ওপর নির্ভরশীল। মাঝারি বাজেটের ছবিগুলো ব্যবসায়িক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ফলে প্রযোজকদের জন্য খরচ কমানো এখন বাঁচার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখানে সমাধান হিসেবে এসেছে। ‘কালেক্টিভ আর্টিস্ট নেটওয়ার্ক’-এর রাহুল রেগুলপারি রয়টার্সকে জানান, ‘পৌরাণিক বা ফ্যান্টাসি ঘরানার সিনেমায় এআই ব্যবহারের ফলে নির্মাণ খরচ আগের তুলনায় মাত্র ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। আর নির্মাণের সময় কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশে। অর্থাৎ যা আগে এক বছরে তৈরি হতো, তা এখন তিন মাসেই সম্ভব।’

পুরোনো সিনেমা নতুন করে ‘হ্যাপি এন্ডিং’

এআই শুধু নতুন ছবি তৈরিতেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি পুরোনো সিনেমার আয় বাড়ানোর নতুন পথও খুলে দিচ্ছে। গত বছর ‘ইরোস মিডিয়া’ ২০১৩ সালের জনপ্রিয় ছবি ‘রাঞ্জনা’-এর নতুন এআই সংস্করণ মুক্তি দেয়। মূল ছবিতে নায়ক মারা গেলেও, এআই ব্যবহার করে শেষ দৃশ্যটি বদলে সেখানে একটি ‘হ্যাপি এন্ডিং’ বা সুখের সমাপ্তি যোগ করা হয়েছে।

‘রাঞ্জনা’-এর নতুন এআই সংস্করণ
‘রাঞ্জনা’-এর নতুন এআই সংস্করণ

এই পরিবর্তন বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ছবির মূল নায়ক ধানুশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এতে সিনেমার ‘আসল আত্মা’ নষ্ট হয়েছে এবং এটা শিল্পীদের জন্য বিপজ্জনক নজির। তবে প্রযোজকদের কাছে এটা আয়ের নতুন পথ।

ইরোস মিডিয়া এখন তাদের ৩ হাজার সিনেমার বিশাল ভাণ্ডার খতিয়ে দেখছে—কোন কোন সিনেমার শেষ বদলে দিয়ে পুনরায় মুক্তি দেওয়া যায়। মজার ব্যাপার হলো, বিতর্ক থাকলেও দর্শক কিন্তু নতুন সংস্করণটি দেখতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তামিল সংস্করণের টিকিট বিক্রি আগের বছরের গড়ের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি ছিল।

ডাবিং হবে একদম নিখুঁত

ভারত বহু ভাষার দেশ। একটি সিনেমাকে জাতীয় পর্যায়ে সুপারহিট করতে হলে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় ডাবিং করা অপরিহার্য। কিন্তু ডাবিংয়ের বড় সমস্যা হলো সংলাপের সঙ্গে অভিনেতার ঠোঁটের নড়াচড়া মেলে না। এটা দর্শকদের বিরক্তির কারণ হয়।

বেঙ্গালুরুর স্টার্টআপ ‘নিউরল গ্যারেজ’ এই সমস্যার সমাধান করেছে। তারা এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে যা ডাবিং করা সংলাপের সঙ্গে মিলিয়ে অভিনেতার ঠোঁট, গাল ও চোয়ালের নড়াচড়া ডিজিটাল পদ্ধতিতে বদলে দেয়। যশরাজ ফিল্মসের ‘ওয়ার ২’ ছবিতে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে হিন্দি সংলাপকে সফলভাবে তেলুগু ভাষায় রূপান্তর করা হয়েছে। এতে ডাবিং করা সিনেমাকেও একদম অরিজিনাল মনে হয়।

হলিউড বনাম ভারতীয় ‘সিনেমা ইন্ড্রাস্ট্রি’: এআই নিয়ে কার অবস্থান কী

সিনেমায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে হলিউডের চেয়ে ভারত অনেক বেশি আগ্রাসী। হলিউডে অভিনেতা ও পরিচালকদের শক্তিশালী ইউনিয়ন আছে। তাঁরা এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম বেঁধে দিয়েছে। সেখানে অনুমতি ছাড়া কোনো অভিনেতার ডিজিটাল রূপ তৈরি করা আইনত নিষিদ্ধ।

এআই ডাবিং। রয়টার্সের ছবি
এআই ডাবিং। রয়টার্সের ছবি

কিন্তু ভারতে তেমন কোনো ইউনিয়ন বা আইনি বাধানিষেধ নেই। এই সুযোগে গ্লোবাল টেক জায়ান্ট গুগল, মাইক্রোসফট ও এনভিডিয়া ভারতের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। নির্মাতা শকুন বাত্রার সঙ্গে মিলে গুগল এআই-নির্মিত চলচ্চিত্র নির্মাণের পরীক্ষা চালাচ্ছে। এনভিডিয়াও চাইছে কম্পিউটিং খরচ কমিয়ে সাধারণ নির্মাতাদের হাতেও এই শক্তিশালী প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে।

বিতর্ক ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

সিনেমা জগতে এআই-এর এই উত্থান সবাই ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। হলিউডের প্রখ্যাত প্রযোজক জোনাথন ট্যাপলিন মনে করেন, এআই দিয়ে পুরো ছবি বানানো সিনেমার ইতিহাসের জন্য অপমানজনক। তাঁর মতে, এটি পর্দা কেবল ‘যান্ত্রিক জঞ্জাল’ দিয়ে ভরিয়ে দেবে।

পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপও ভারতের এই পরিস্থিতি নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ভারতে সিনেমা এখন স্রেফ ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘ভারতের দর্শকরা পৌরাণিক গল্প খুব পছন্দ করে, আর প্রযোজকরা কম খরচে সেই আবেগ বিক্রি করার জন্য এআই-কে ব্যবহার করছে।’

সব মিলিয়ে বলিউড এখন বড় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে প্রযুক্তির সীমাহীন সম্ভাবনা আর অন্যদিকে সংকট। শেষ পর্যন্ত কি এআই সিনেমাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে, নাকি ধীরে ধীরে মুছে দেবে সেই মানবিক স্পর্শ, যা এতদিন ধরে পর্দার গল্পকে আমাদের জীবনের অংশ করে রেখেছে? উত্তরটা হয়ত সময়ের আড়ালেই লুকিয়ে আছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স

Ad 300x250Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত
leadT1ad

সম্পর্কিত

leadT1ad
leadT1ad