বিদায়ী সরকারের মেয়াদের শেষ ভাগে সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছিল। এই পে-স্কেল নির্বাচিত নতুন সরকার বাস্তবায়ন করবে বলে সেসময় সিদ্ধান্ত হয়। স্বাভাবিকভাবেই বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—এই বাড়তি বেতন কাঠামো নতুন সরকারের ওপর কোনো আর্থিক চাপ তৈরি করবে কি না? বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে আলোচনা-সমালোচনা হলেও, আমি মনে করি, এটি অর্থনীতির ওপর খুব বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব বা সংকট তৈরি করবে না। বরং এটি একটি যৌক্তিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
প্রথমত, এই পে-স্কেলটি সময়ের দাবি ছিল। প্রায় ১২-১৪ বছর ধরে সরকারি খাতে কোনো পূর্ণাঙ্গ পে-স্কেল হয়নি। বিভিন্ন সময়ে অ্যাডহক ভিত্তিতে ভাতা বৃদ্ধি বা নির্দিষ্ট সেক্টরের বেতন বাড়ানোর ফলে অন্যান্য সেক্টরে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছিল, যা মোটেই কাম্য নয়। তাই সব খাতের জন্য একটি সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামো প্রয়োজন ছিল। এই পে-স্কেলের মাধ্যমে সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগসহ সকল খাতের বেতন কাঠামো সংশোধন করা হয়েছে, যা একটি সামগ্রিক পদক্ষেপ।
দ্বিতীয়ত, অর্থের সংকুলানের বিষয়টিও আমরা ভেবেছি। কোনো পে-স্কেলই একবারে বাস্তবায়ন করা হয় না। এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে। আমার প্রস্তাবনা ছিল, প্রথম বাজেট সাইকেলে (জুন পর্যন্ত) শুধুমাত্র মূল বেতনের (বেসিক পে) অংশটি প্রদান করা হোক। পরবর্তী বাজেটে বাড়িভাড়া বা টিএ/ডিএ-এর মতো ভাতাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হোক এবং তৃতীয় ধাপে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ও ভাতাগুলো সমন্বয় করে প্রদান করা হোক।
অনেক অপ্রয়োজনীয় ভাতা ছিল, সেগুলোকেও যৌক্তিকীকরণের সুযোগ রয়েছে। এভাবে দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে প্রায় তিনটি বাজেটের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়িত হলে তা অর্থনীতির ওপর বড় কোনো বোঝা হয়ে দাঁড়াবে না। কারণ, এই সময়ের মধ্যে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে পারলে অর্থের সংস্থান করা কঠিন হবে না।
এরই মধ্যে আমরা দেখেছি, অনেক মন্ত্রণালয় তাদের উন্নয়ন বা রাজস্ব বাজেটের পুরো অর্থ খরচ করতে পারেনি। সেই অব্যবহৃত অর্থও পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে কাজে লাগানো যেতে পারে। তাছাড়া, বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় নানা ধরনের ইনসেনটিভ বা ভাতার নামে যে বিপুল অর্থ খরচ হয়, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে সেই খরচগুলোও কমে আসবে। সুতরাং, কিছুটা আর্থিক চাপ পড়লেও তা সামাল দেওয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের রয়েছে।
পে-স্কেলের একটি পরোক্ষ প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়—বেসরকারি খাতে মজুরি বৃদ্ধির চাপ। বলা হয়, সরকারি বেতন বাড়লে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে বাধ্য হবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যারা হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করছেন বা ক্যাশ ইনসেনটিভ পাচ্ছেন, তাদের কতজন সেই লাভের অংশ শ্রমিকদের দেন?
অনেকেই মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা করছেন। কিন্তু বাজারের মূল্যস্ফীতি কেবল টাকার সরবরাহের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বা কারসাজির মাধ্যমে কীভাবে দাম বাড়ানো হয়, তা আমরা দেখেছি। ১০ টাকার বেগুন ঢাকায় এসে ৬০ টাকা হওয়ার পেছনে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও চাঁদাবাজি দায়ী।
মানুষের হাতে টাকা থাকলেই দাম বাড়বে—এই ধারণাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। বেতন না বাড়লেও তো গত এক বছরে ১২-১৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। সুতরাং, বেতন বৃদ্ধিই মূল্যস্ফীতির একমাত্র কারণ, এই যুক্তি ধোপে টেকে না। বাজার নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক না করলে জিনিসপত্রের দাম বাড়তেই থাকবে।
পে-স্কেলের একটি পরোক্ষ প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়—বেসরকারি খাতে মজুরি বৃদ্ধির চাপ। বলা হয়, সরকারি বেতন বাড়লে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে বাধ্য হবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যারা হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করছেন বা ক্যাশ ইনসেনটিভ পাচ্ছেন, তাদের কতজন সেই লাভের অংশ শ্রমিকদের দেন? তারা তো শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি দিতেই গড়িমসি করেন। তবে হ্যাঁ, নতুন পে-স্কেলের ফলে ইনফরমাল সেক্টর বা নিম্ন মজুরির শ্রমিকদের ওপর কিছুটা চাপ আসতে পারে।
অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেতনের দিকে তাকালে দেখা যায়, একজন প্রাইভেট ব্যাংকের ম্যানেজারের বেতন আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা, যা একজন ঊর্ধ্বতন বিসিএস কর্মকর্তার বেতনের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু ব্যাংক নয়, ফার্মাসিউটিক্যালস বা গার্মেন্টস খাতেও উচ্চ পদে বেতন অনেক। তাই সরকারি বেতন কাঠামোকে আকাশচুম্বী ভাবার কোনো কারণ নেই।
সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে, নতুন পে-স্কেল একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। হ্যাঁ, কিছুটা আর্থিক চাপ পড়বে, তবে পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি সহজেই সামাল দেওয়া সম্ভব। যদি আমরা বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে পারি এবং কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে পারি, তবে এই পে-স্কেল দেশের অর্থনীতিতে কোনো বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। বরং এটি সরকারি কর্মচারীদের কর্মস্পৃহা বাড়াতে সহায়ক হবে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা