leadT1ad

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর: শীতল সম্পর্ক কি উষ্ণ হবে

আহমেদ সুমন
আহমেদ সুমন

প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ৪৮
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ভারত সফরে আছেন। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর এটি তাঁর প্রথম ভারত সফর।

Ad 300x250

বাংলাদেশের নির্বাচন-উত্তরকালে এবং ইরান যুদ্ধে জ্বালানি নিয়ে বিশ্বব্যাপী ত্রাহি অবস্থার মধ্যে খলিলুর রহমানের ভারত সফর তাৎপর্যপূর্ণ। মরিশাসের রাজধানীতে অনুষ্ঠেয় ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ঢাকা ছেড়েছেন। এর আগে দিল্লি যাচ্ছেন। তিনি ৭ ও ৮ এপ্রিল দিল্লিতে অবস্থান করবেন। ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ড. খলিল সফরের প্রথম দিনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ৮ এপ্রিল ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়ালের সঙ্গে বৈঠক করবেন। কূটনীতিক ও পর্যবেক্ষকদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকা এ সফরে কী কী বিষয় প্রাধান্য পাবে, পাঠক মাত্রই সেটি সম্পর্কে জানার আগ্রহ রয়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস বলছে, ড. খলিল এ সফরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২০২৬-২০২৭ সালের সভাপতি পদের জন্য বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ভারতের সমর্থন চাইবেন। দু’দিনের এ সফরে শুধু তার প্রার্থী পদে সমর্থন নয়; বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপাক্ষিক অন্যান্য বিষয় নিয়েও যে আলোচনা হবে, তা অনুমেয়। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. ইউনূস সরকারের সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতির ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত হওয়ার পর সেসব ক্ষেত্রে উন্নয়নের আলাপও স্থান পাবে বলে আশা। এসবের বাইরে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় দুই দেশ কীভাবে পরস্পরকে সহযোগিতা করতে পারে, সে বিষয়ও সামনে আসবে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, সব আলোচনায় ‘আনুষ্ঠানিক’ ও ‘অনানুষ্ঠানিক’ বিষয় থাকে। আনুষ্ঠানিক আলোচনার বিষয় প্রচারমাধ্যমে প্রকাশ পায়। অনানুষ্ঠানিক বিষয়ের গুরুত্ব থাকলেও তা আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সীমিত থাকে। সফর-পরবর্তী উভয় দেশের নেতৃত্বের নীতি-কৌশল বা আচার-আচরণে তা প্রতিভাত হয়। এই সময়ে সবচেয়ে উৎকণ্ঠার বিষয় জ্বালানি সহায়তা নিয়ে ড. খলিল ভারতের জ্বালানিমন্ত্রী হরদ্বীপ পুরির সঙ্গে বৈঠক করবেন। বাংলাদেশে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে অতিরিক্ত জ্বালানি, বিশেষত ডিজেল সরবরাহের জন্য ঢাকার অনুরোধ তুলে ধরবেন। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, ভারতের নিজস্ব চাহিদা, জ্বালানি প্রাপ্যতা ও পরিশোধন ক্ষমতা মাথায় রেখে ওই অনুরোধ পূরণের আশ্বাস দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানি করে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এতে বাধা-বিপত্তি সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের পাশাপাশি ভারত থেকে কিছুটা বাড়তি জ্বালানি পাওয়ার নিশ্চয়তা চাচ্ছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে রাশিয়া থেকেও জ্বালানি কেনার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অনুমতি চাওয়া’র খবর গণমাধ্যমে এলে মানুষের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সেটা যা-ই হোক, ড. খলিল সম্ভবত জ্বালানি সহায়তা বিষয়ে অধিক গুরুত্বারোপ করবেন। অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় এ ধরনের বিষয় ভেতরেই থেকে যায়। আনুষ্ঠানিক আলোচনায় শুষ্ক মৌসুমে ন্যায্যতার ভিত্তিতে নদীর পানি পাওয়ার প্রসঙ্গটি গুরুত্বের সঙ্গে আসতে পারে। স্মর্তব্য, ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৩০ বছর মেয়াদি পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর আওতায় ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশে পানি ছাড়তে বাধ্য ভারত। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আপত্তিতেই মূলত বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী পানি পাচ্ছে না। মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার কারণে সরকারকে এটি নবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।

আমরা জানি, ড. খলিল তারেক রহমান সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার আগে মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সময়ে বিএনপির পক্ষ থেকে তার বিষয়ে কড়া সমালোচনা করা হয়। ড. খলিল দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। সে কারণে তিনি বাংলাদেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দেন বলেও অভিযোগ করা হয়। এ অবস্থায় নির্বাচন-উত্তরকালে বিএনপি সরকারের টেকনোক্রেট কোটায় তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে রেখে দেওয়ার ঘটনা বিস্ময় সৃষ্টি করে। ড. খলিল অবশ্য উত্থাপিত অভিযোগের জবাব দিয়েছেন এবং তারেক রহমান সরকারে তার অন্তর্ভুক্তি নিয়েও বক্তব্য তুলে ধরেছেন।

সব আলোচনায় ‘আনুষ্ঠানিক’ ও ‘অনানুষ্ঠানিক’ বিষয় থাকে। আনুষ্ঠানিক আলোচনার বিষয় প্রচারমাধ্যমে প্রকাশ পায়। অনানুষ্ঠানিক বিষয়ের গুরুত্ব থাকলেও তা আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সীমিত থাকে। সফর-পরবর্তী উভয় দেশের নেতৃত্বের নীতি-কৌশল বা আচার-আচরণে তা প্রতিভাত হয়।

একজন পেশাদার কূটনীতিক হিসেবে খলিলুর রহমানের ওপর প্রধানমন্ত্রী আস্থা রেখেছেন। বর্তমান সরকারে ড. খলিলকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে রেখে দেওয়ার বিষয়ে শক্তিশালী কোনো পক্ষের পরামর্শ ছিল বলেও মত রয়েছে। ভারত বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী। উন্নয়ন সহযোগীও। উন্নয়ন, অগ্রযাত্রা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে ভারত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে এগোনোর বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে বাংলাদেশের। চীনও বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী। এর বাইরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান আর যুক্তরাষ্ট্রও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশীজন হিসেবে কাজ করে। এ অবস্থায় সব পক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেই দেশের স্বার্থে নীতি-কৌশল গ্রহণ করতে হয়।

আমরা জানি, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোকে নিজ বলয়ে রাখার লক্ষ্যে ভারত ও চীনের স্নায়ুযুদ্ধ চলমান। বাংলাদেশ এ দুই রাষ্ট্রের সঙ্গে একটা ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখার কৌশল অবলম্বন করছে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে বাংলাদেশ অনেকাংশে ভারতমুখী হলেও ইউনূস সরকারের সময় বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে এবং প্রকাশ্যে ভারতবিরোধিতা লক্ষ করা গেছে। ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’ স্লোগান জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকারীদের মুখে নিয়মিত শোনা গেছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রভাব ইউনূস সরকারের মধ্যেও পড়েছে। পারস্পরিক অভিযোগ ও জনবিক্ষোভে পাল্টাপাল্টি কূটনীতিক তলবের ঘটনা ঘটেছে। ভারত এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সেই সময় থেকে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার অপেক্ষায় ছিল। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন এবং দুই দেশের জনগণের কল্যাণে একসঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন বার্তা তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে। এর মাধ্যমে মোদি বিগত ১৮ মাসের তিক্ততার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বার্তাই দিয়েছেন।

এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারির শেষে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে নরেন্দ্র মোদি শোক জানিয়ে তারেক রহমানের কাছে চিঠি পাঠান। সেটি নিয়ে আসেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী ড. এস. জয়শঙ্কর। তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চিঠি হস্তান্তর করেন।

উপরে বর্ণিত বিষয়াবলির কারণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরে যতটা না আনুষ্ঠানিকতার ওপর ফোকাস থাকবে, তার চেয়ে বেশি ফোকাস থাকবে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারত চলে যান। এখন পর্যন্ত তিনি ভারত সরকারের আশ্রয়ে আছেন। ভারতবিরোধীদের অভিযোগ, ভারত শেখ হাসিনাকে এখনও রাজনীতি করার সুযোগ দিতে চায় এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ফিরে আসুক– ভারত নানাভাবে সে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। হালে ড. ইউনূস সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণ সম্পর্কিত অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করার পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অনেকের ধারণা, দলটিকে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির পরিবেশ তৈরির জন্যও বাংলাদেশকে অনুরোধ জানাবে ভারত। এসব মিলিয়ে ড. খলিলের এ সফরে দু’দেশের সম্পর্ক শীতল থেকে উষ্ণ হবে কিনা, সেটাই দেখার বিষয়।

ড. আহমেদ সুমন : গবেষক ও বিশ্লেষক

leadT1ad

সম্পর্কিত

leadT1ad
leadT1ad