leadT1ad

নাসির আলী মামুনের সাক্ষাৎকার

‘এই মালটাকে নিয়ে যাও’

‘ফটোজিয়াম: লাইফ অব পোয়েট্রি' নামে লেজেন্ডারি পোট্রেট ফটোগ্রাফার নাসির আলী মামুনের একটা এক্সিবিশন চলতেছে আলিয়ঁস ফ্রসেঁজের লা গ্যালারিতে। বাংলাদেশের লিটারেচারের দুই জায়ান্ট, পোয়েট আল মাহমুদ আর পোয়েট শামসুর রাহমানের অসংখ্য ছবি নিয়া আয়োজন করা এই এক্সিবিশন। আলিয়ঁস ফ্রসেঁজের ক্যাফেতে নাসির আলী মামুনের সঙ্গে পপ স্ট্রিমের পক্ষ থেকে তাঁর মুখোমুখি হন রায়হান রাহিম ও হুমায়ূন শফিক। দুই কবির রিলেশন আর গ্যাঞ্জাম, বাংলাদেশের লিটারেচারের নানা বাঁক বদল, নাসির আলী মামুনের লগে উনাদের দুজনের পার্সোনাল কানেকশন, তাঁর ছবি তোলার জার্নিসহ নানান বিষয় ইন্টারভিউতে উইঠা আসছে।

ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

রায়হান রাহিম: এমনিতে বাংলাদেশে তো ছবি তোলার জন্য অনেক সাবজেক্ট, অনেক ফর্মেটই আছে। কিন্তু বিয়িং এ ইয়াং ফটোগ্রাফার, যখন শুরু করেছেন আপনি, পোর্ট্রেট তোলার প্রতি এত সিরিয়াস কেন হইলেন? এইটার কী বিশেষ কোনো কারণ আছে?

নাসির আলী মামুন: নানা কারণ। অনেক ক্যামেস্ট্রি এইটার সাথে জড়িত। প্রথমত পূর্ব পুরুষদের একটা যোগসূত্র ছিলো। তাঁরা ইমেজ, ছবি, পেইন্টিং ভালোবাসতো। আমার যে গ্রেট গ্রেট গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার, ঐ ভদ্রলোক, জনাব তায়েব খান, উনি ১১৫ বছর, আমাদের বংশধরদের কেউ কেউ বলে গেছেন ১২০ বছর জীবিত ছিলেন। উনিই সবচেয়ে বেশি বছর জীবিত ছিলেন এই বংশের মধ্যে। অনেকে ১০৫ বছরও ছিলেন, ১০২ বছরও ছিলেন কেউ কেউ, ৯০ এর ওপর সবাই। শুধু আমার আব্বা এক বছর কম ৯০ এ মারা গেছেন। তাও আবহাওয়া জনিত কারণে।

Ad 300x250

তো তায়েব খান, উনি প্যারিস গেছিলেন, লন্ডন গেছিলেন অনেকবার। তখন তো হেঁটে কাফেলা যেতো। তখন তো বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ঘুরে, আফগানিস্তান ইরান হয়ে লিবিয়া টিবিয়া হয়ে ইউরোপে ঢুকতে হতো। এখনকার মতো না। নদী পথে ঘুরে ঘুরে যেতে হয়েছিল তাঁর। তখন তিনি ইস্ট লন্ডনে অনেক দিন ছিলেন, প্যারিস গেছেন, ল্যুভর মিউজিয়াম সহ আরও অনেক মিউজিয়াম তিনি ঘুরছেন। ট্রাফালগার স্কয়ারে একটা মিউজিয়াম আছে ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারি, ব্রিটিশ মিউজিয়ামের উলটা দিকে। ন্যাশনাল পোর্ট্রেইট গ্যালারিতে পৃথিবীর বেশ বড় বড় মানুষদের, বিশেষ করে যারা ব্রিটিশ, তাদের পোর্ট্রেট আছে, আঁকা। উনি গিয়ে এসব পোর্ট্রেট দেখলেন। এতো পোর্ট্রেটের মধ্যে একটা পোর্ট্রেটে তার চোখ চলে গেছে। তাঁর নাম তিনি জানতেন। উইলিয়াম শেকসপিয়ার। ছবিটা ছিল পনেরোশ’ শতাব্দির, ষোল শ কত সালের জানি ! তখন কুইন এলিজাবেথ ওয়ান রানী আরকি ! উনি বলতেছিলেন শেকসপিয়ারের চোখটা নাকি ছিলো ভয়ার্ত! এই গল্প উনার ছেলের ছেলের কাছে করেছেন। এইভাবে এই গল্প আমার দাদার কাছে আসছে।

ব্রিটিশ ইন্ডিয়াতে উনি ছিলেন ক্যাপ্টেনের আগের র‍্যাংক! ঐ সময় ভারতীয়দের জন্য হাবিলদার ছিলো অনেক বড় পোস্ট। উনি ইংরেজি জানতেন, জার্মান জানতেন, ডাচ জানতেন, পর্তুগিজ জানতেন, ফ্রেঞ্চ জানতেন। বলতে পারতেন, বুঝতে পারতেন না। ইংরেজিটা ফ্লুয়েন্ট ছিলো। পশতু ভাষা জানতেন, তাঁর নিজের ভাষা যেটা, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের। তো উনি কার্ল মার্ক্সের নাম জানতেন, ডাস ক্যাপিটাল উনি ১৮৭২ তে উনি পড়ছেন। ১৮৬৮ সালে বইটা বের হইছিলো, ছোট্ট একটা চটি বই ছিলো।

তিনি যখন প্যারিস গেলেন, হঠাৎ কইরা দেখেন যে, সেন নদীর তীরে, ছবি আঁকার তিনটা পায়ার মধ্যে দড়ি দিয়ে, সুতা দিয়ে বাঁধা বাক্স। ওইটা ক্যামেরা আরকি! ১৮৩৮ সালের কথা বলতেছি আমি। ১৮২৬ সালে প্রথম ছবি তোলা হয়। পৃথিবীর প্রথম ফটোগ্রাফ উঠতে ৮ ঘণ্টা সময় লাগছে ১৮২৬ সালে। তার মানে ১৮৩৮ সালে, ১২ বছর পরে উনি এই জিনিসটা দেখতেছে।

অনেকেই আসতেছে। আপনারা আমাকে উঠতে দিয়েন না! যেই আসবে, বলবেন ৫ মিনিট লাগবে!

রায়হান রাহিম: (হাসি) থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ!

নাসির আলী মামুন: উনি কী ভাগ্যবান ! ১৮৩৮ সালে উনি বীজ বপন কইরা আসছিলো যে বিশ্ব ফটোগ্রাফির ২০০ বছরের ইতিহাস, আমার উত্তর প্রজন্মের কেউ পালন করবে এবং সে ফটোগ্রাফারই হবে !

রায়হান রাহিম: হলি !

নাসির আলী মামুন: উনার সেই গল্প ওরাল হিস্ট্রি হিসেবে আসতে আসতে আমার কাছে আসছে। কিন্তু যখন আমার কাছে আসছে, তখন কিন্তু আমার হাতে ক্যামেরা চলে আসছে। সেটাই বলি যে ব্লাডের মধ্যেই ছিল। উনি অনেক ছবি দেখতেন। ছবির গল্প করতেন খালি ছেলেদের সাথে। উনার ছেলেরাও ছবি দেখতো।

তাঁরা ভারতবর্ষে মোঘল আর্মিতে ছিল, ৪০০ বছরের ইতিহাস আছে তাঁদের। তো ওরা ছিল পাঠান। এখন যে মর্দান শহর, নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ারে, যেটা ৩৫ সালে পাকিস্তানে ঢুকছে, তার আগে আফগানিস্তানে ছিল। ওই শহরে লোকেরা পাহাড়ের উপরে থাকতো, তারা সবাই ছিল সোলজার। বন্দুক বানাইতে পারতো, গোলাবারুদ বানাইতে পারতো, ব্যায়নেট বানাইতে পারতো কুটির শিল্পের মতো। এবং ঘরের মেয়েরা তলোয়ারের খাপের চারিদিকে সুন্দর সুন্দর নকশা করতো। এইসব এখন ওইসব অঞ্চলের মিউজিয়ামে আছে।

১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ যখন হয় ওইখান থেকে তারা চলে আসছিল। তখন আমাদের বংশ স্প্লিট হয়ে যায়। কেউ মারা গেল, অনেকরে ব্রিটিশরা ফাঁসি দিয়ে দিল, কারণ যুদ্ধ তো সাকসেসফুল হয় নাই। এই তায়েব খান কোনোভাবে বেঁচে যায়, কারণ উনি অনেক বয়স্ক ছিলেন। উনাকে রিকগনাইজ করতে পারে নাই। উনার দুই ছেলে, তারাও আর্মিতে ছিল। উনার র‍্যাংকটা ভালো ছিল হাবিলদার, আর ছেলেরা ছিল সোলজার। তো তারা ৫৭ সালে পালায় চলে আসলো এই পূর্ব বাংলায়। আসলো যে, কারণ হাজী শরীয়তুল্লাহর নাম তাঁরা জানতো, আর জানতো তাঁর এলাকায় ব্রিটিশ বাহিনী ঢুকতে পারে না।

পদ্মা নদী, ময়নাকাটা নদী, আরও একটা কী জানি আড়িয়াল খাঁ, সম্ভবত আড়িয়াল খাঁ। তিনটা নদী পরিবেষ্টিত মাদারীপুরের একটা গ্রাম। ঐ গ্রামের নাম হইলো…… নামটা ভুলে গেছি। আমাদের পূর্ব পুরুষদের গ্রাম। ঐখানে আইসা তাঁরা উঠলো। এখন তাঁরা বাধ্য এই দেশে থাকতে। কারণ বাইরে গেলে তো ধরলে ফাঁসি দিয়ে দিবে তাঁদের, কারণ তাঁদের চেহারা দেখলে বুঝতে পারতো। ওরা আস্তে আস্তে বাংলাদেশের মেয়েদের বিয়ে করলো। সিপাহী বিদ্রোহ করা তায়েব খানের দুই ছেলে একজনের নাম মোহাম্মদ মেহের খান, আরেকজন মোহাম্মদ লাল খান। মেহের খানের বংশধর আমরা। মেহের খান ছেলের নাম রাখলো আমিনুদ্দিন খান। আশ্চর্য, ওই লোকও নাকি ছবি দেখতে পছন্দ করতো। সে অনেকবার কলকাতায় গিয়া কলকাতার মিউজিয়াম ঘুরে আসছে। সে হলো এই পূর্ব বাংলায় ১০০ জন প্রথম এন্ট্রান্স পাসের একজন। আমিনুদ্দিন খান তার ছেলের নাম রাখলো মোহাম্মদ মহসিনুদ্দিন খান, উনি আমার দাদা।

মানে বললাম যে বীজ বপন করছিল, ফটোগ্রাফি দেখতো, সব বাই জেনারেশন আসছে। আমার আব্বা এগুলার ধার ধারতো না। উনি মিউজিয়াম-টিউজিয়াম, ছবি-টবি অপছন্দ করতো না, বুঝতেই পারতো না। উনি ৪৮ সালে ঢাকায় আসছে, ৫৩ সালে ঢাকায় আমার জন্ম, পুরোনো ঢাকায়। কেন্দ্রীয় কারাগারের উল্টা দিকে। তারপরে আমি... ৫৮ সালের দিকে, খবরের কাগজগুলি তখন ঘাঁটতে শুরু করি। যখন নাইন-টেনে পড়ি তখন আমি মাস্টার্স ক্লাসের বই পড়ি। কোন বই পড়তাম? বাংলা বই, ইতিহাসের বইগুলা, আর বাইরের অন্য বই পড়তাম, জীবনী, আত্মজীবনী। এগুলাতে আমার আগের থিকাই ঝোঁক ছিলো।

হুমায়ূন শফিক: মানে আত্মজীবনীর দিকে আপনার আগে থেকেই আগ্রহ ছিল?

নাসির আলী মামুন: আগে থেকেই। আমি যেই লাইনে আছি, এই লাইনে আমি একদিন দুইদিনে আসি নাই। অনেক লম্বা রাস্তা। লম্বা রাস্তাটাই ছোট কইরা বলতে চেষ্টা করতেছি আপনারা যেন বোরিং না হন।

রায়হান রাহিম: আমরা একদমই বোরিং হইতেছি না। উই হ্যাভ বিন প্রিভিলাইজড টু হিয়ার সাচ স্টোরিজ!

নাসির আলী মামুন: তো ’৫৩ তে জন্ম হইছে, ৭-৮ বছর থেকেই ছবির প্রতি আমার একটা ঝোঁক। কাগজের মধ্যে, তারপরে দোকানে গেলে ঠোঙ্গার মধ্যে……

হুমায়ূন শফিক: মানে এটা কি আপনার আঁকা ছবির প্রতি?

নাসির আলী মামুন: হ্যাঁ, আঁকা ছবি। তবে, ফটোগ্রাফি হলে আরও আশ্চর্য হয়ে দেখতাম। এবং খবরের কাগজ যখন আনতো, তখন যখন পড়তে পারি না তখনও আমি ছবি দেখতাম। কার ছবি জিজ্ঞেস করতাম, আমার আব্বা বলতো এইটা সে, এইটা ও! কোনো সময় একটা থাপ্পড় মেরে দিত, যে বারেবারে জিজ্ঞেস করতেছে! আবার উনি অনেক সময় পেপার পড়ার আগেই কোনো মানুষের ছবি আমি কেটে ফেলতাম। যখন বোঝা শুরু করলাম যে এই লোকটা কোনো একটা দেশের প্রেসিডেন্ট, সে কবি, বিখ্যাত কোনো লোক, ফিল্ম স্টার। এক কলাম ছবি !

ইংরেজি কাগজ বেশি আসতো আমাদের বাসায়। পাকিস্তান অবজার্ভার আর মর্নিং নিউজ। আব্বা ইংরেজি কাগজ পড়তো আরকি। তো ওই পত্রিকায় উনি পড়ার আগেই কাটতাম। তো উনি বুঝতে পারতো যে এটা আমি কাটছি। মারতো ধরতো, বুঝতে পারতো না যে আমি... আমি তো এগুলির ভক্ত হয়ে গেছি তখন। আমার ব্লাডের মধ্যে ঢুকে গেছে। বিখ্যাত লোক দেখলেই আমি চমকে উঠি! তাঁদের আমার স্বায়ত্ত্বের মধ্যে আনতে চাই। মাছ যেরকম ধরে না? জালে নিয়ে আসে, ছোট্ট একটা পয়েন্টের মধ্যে নিয়ে আইসা ধরে, ওই রকম।

তো ক্যামেরা কীভাবে ছবি তোলে, চিন্তা করতাম যে ক্যামেরাটা কী। ছোটবেলায় আব্বা-আম্মার সাথে গেছি স্টুডিওতে। ঢাকা তখন আধুনিক। মানে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার যখন গ্রো করতেছে বাংলাদেশে, মধ্যবিত্ত গ্রো করতেছে, সেই সময় তাদের শখ হইতো যে স্টেডিয়ামের মার্কেটে গিয়ে অথবা নিউ মার্কেটে গিয়ে , বড় স্টুডিওতে গিয়ে, যেখানে কার্পেট আছে, বড় আয়না আছে, ড্রেসিং টেবিল আছে সেইখানে একটা ছবি তুলবে। পাড়ায় পাড়ায় তো তখন স্টুডিও ছিলো না।

আমার আব্বার কাছেই শুনছি যে ওইগুলা বড় স্টুডিও, নামকরা। ওইখানে নুরুল আমিন সাহেব গেছিলেন নাকি।

রায়হান রাহিম: পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী?

নাসির আলী মামুন: হ্যাঁ, মুখ্যমন্ত্রী। আমার আব্বা বলতো এইসব কাহিনী ! আতাউর রহমান খান সাহেব নাকি গেছেন। হাই কোর্টের একজন ইংরেজ জাস্টিস; উনি গেছেন! তখন বুঝলাম যে এটা গুরুত্বপূর্ণ। আব্বাও বুঝতে পারছেন। উনি আমাদের নিয়ে গেছিলেন কয়েকবার। সেই স্টুডিওতে আমি তাকায়ে দেখতাম যে ফটোগ্রাফার কীভাবে ছবি তোলে। কোনো কথা বলে কী না। তখন দেখলাম যে ফটোগ্রাফার সে এমন একটা ডিরেকশন দেয়, দ্বিতীয়বার দেখলাম যে একই ডিরেকশন দিতেছে। তৃতীয়বার দেখলাম যে আরেক স্টুডিওতে গিয়ে সে একই ডিরেকশন দিচ্ছে। গৎবাঁধা ডিরেকশন!

রায়হান রাহিম: এইগুলা কী আপনার তেমন ভালো লাগে নাই?

নাসির আলী মামুন: হ্যাঁ। সবাই একইভাবে ছবি তুলতেছে। দেখলাম যে ফটোগ্রাফার একই কথা বলে, একই ভাবে ছবি তোলে, একই বক্স ক্যামেরা। ক্যামেরাটা এরকম সোজা স্ট্যান্ডের মধ্যে থাকতো, স্টুডিওর ক্যামেরা। আমি খুব অবাক হইতাম যে একই জিনিস, সব জায়গায় একই রকম, ছবি একই ব্যাকগ্রাউন্ডে, একই রকম লাইট-টাইট। তখন আমি চিন্তা করলাম যে আমি তো ফটোগ্রাফার হবো! তাইলে আমারে কি করতে হবে? তখন দেখলাম যে আমারে যাইতে হবে এমন একটা জায়গায়, যেই রাস্তায় কেউ কর্ষণ করে নাই, যেই রাস্তায় কেউ হাঁটে নাই। আমি নতুন একটা রাস্তা, একটা ফ্রন্টিয়ার ওপেন করবো। সেইটা কী? সেইটা হলো পোর্ট্রেট। মানুষের যে বিভিন্ন মুহূর্ত, যেগুলি স্টুডিওতে মানবে না। দেখি যে একই রকম বসে। হাসা যায় না, এদিকে তাকাও, মুখ বন্ধ করো, ডিরেকশন দেয়, ধমকও দেয় ক্যামেরাম্যানরা। ছোটবেলায় দেখছি, সবাই দেখছে। এই অভিজ্ঞতা হয়তো অনেকেরই আছে। আপনাদের হয়তো নাই, কারণ এখন তো স্টুডিও তেমন নাই আরকি।

তো আমি দেখলাম যে অন্য ফ্রন্টিয়ারে আমার যাইতে হবে, নাইলে তো আমি স্টুডিওর দলেই চইলা গেলাম। তখন আরেক দল দেখতাম যারা প্রেস ফটোগ্রাফার, যখন আরও বড় হইলাম, ১৪-১৫ বছর বয়স। ওরা প্রেস ফটোগ্রাফি করে। ওরা কোনো অনুষ্ঠানে গেলে দেখতাম সামনের থেকে ছবি তোলে। ব্যানার যেখানে আছে, সাইনবোর্ড আছে, ওইটা সহ ছবি তোলে। কারণ তার দরকার, পরের দিন পত্রিকায় ছাপা হবে। তো এইটা দেখে দেখে আমি যখন ৭১ সালে ছবি তোলা শুরু করলাম, আমি বঙ্গবন্ধুর একটা অনুষ্ঠানে গেলাম ৭১ এ। তেসরা মার্চ, ১৯৭১, পল্টন ময়দানে। ইত্তেফাকে একটা এক কলাম বিজ্ঞাপন দিছিল যে উনি আসবে। তখন আমি পত্রিকা দেখতাম। ‘আজকের ঢাকা’—এরকম লম্বা স্ক্রলের মতো থাকতো। বিভিন্ন অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে থাকতো, কালচারাল অনুষ্ঠান বিশেষ করে। ওগুলা আমি পড়তাম আগেই। তখন আমি বুঝতাম এখানে ওই নেতা আসবে, এখানে ওই কবি আসবে, এখানে ওই সাহিত্যিক আসবে, বিজ্ঞানী আসবে।

তো গেলাম, সমস্ত জাতীয় নেতার উপস্থিতি। তারপরে একটা গায়েবানা জানাজার মোনাজাত। সেই জানাজা একজন হুজুর পড়লেন, বঙ্গবন্ধু নিজে মোনাজাত করলেন। সমস্ত নেতা, বাংলাদেশের যত জাতীয় নেতারা ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময়, এবং পরবর্তীতে যাঁরা সরকার গঠন করছেন, মুক্তিযুদ্ধের পরে এবং বড় বড় মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডাররা সবাই ছিল। সব ছাত্র নেতারা ছিল। জেনারেল ওসমানী সাহেব ছিল। চার বড় নেতা, ওরা ছিল। তো আমি দেখলাম সামনে থেকে ছবি তুললে আমার দরকার স্টেডিয়ামটা, আর আমার ব্যানার দরকার নাই। আমি তো প্রেস ফটোগ্রাফার না।

আমি ওইটার পাশে চলে গেলাম। এমন একটা জায়গায় মোটামুটি সবাইকে ছবির মধ্যে দেখা যায়। খন্দকার মোশতাক সহ আর যাঁরা যাঁরা আছে সবাই। সেই তেসরা মার্চেই হঠাৎ অনেকে বলতেছে, পাকিস্তান আর্মি আসতেছে, পাকিস্তান আর্মি আসতেছে। এই রকম গুঞ্জন। হঠাৎ লোকজন সরে যায়, আবার লোক আইসা গ্যাপ পূরণ করে, পল্টন ময়দানে।

৭ই মার্চে যে এত বড় একটা পরিস্থিতি তৈরি করবে, আমরা কেউ জানি না। তো যাই হোক, ছবি তুললাম সেদিন, বাসায় চলে আসলাম। তারপরে ৭ই মার্চে গেলাম। আমরা গেলাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজনের গাড়িতে। উনি আমার বন্ধুর বাবা। আমি তো গ্রিন রোডে থাকতাম তখন। আমার সেই বন্ধুর বাবার নাম ইয়ার মোহাম্মদ খান। বিখ্যাত লোক। উনি এমএলএ ছিলেন। উনি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন আর সাপ্তাহিক যে ইত্তেফাক ছিল, ট্যাবলয়েড সাইজ, ওইটার উনি প্রথম প্রকাশক। উনার নামেই ছিল। প্রকাশক ইয়ার মোহাম্মদ খান, প্রতিষ্ঠাতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। প্রিন্টেড থাকতো। তাঁরা যখন জেলে ছিল, তখন মানিক মিয়া সাহেব ওইটা নিয়ে নিছে। যাই হোক, ওই ইয়ার মোহাম্মদ খান সাহেব তাঁর নিজের গাড়ি, কর্টিনা, ওটা চালায়ে উনার দুই ছেলে, আমি আর উনার এক মেয়ের জামাই, আমরা চারজন আসছি।

তো সেই ওয়ান টুয়েন্টি বক্স ক্যামেরা, স্টুডিও নেহার ছিল আমার বাসার কাছে। ইয়ার মোহাম্মদ খান সাহেবের বিরাট বাড়ি, গ্রিন রোডের ওপরে, ২৪ গ্রিন রোড, তখন ঠিকানা। ওইখানে অনেকগুলো দোকান ছিল বাড়ির সামনে। আগে থাকতো না? বড় বড় বাড়ি, বড় বড় জায়গাওয়ালাদের, যদি কমার্শিয়াল জায়গা থাকতো সামনে দোকান থাকতো, দোতলা থাকলে, উপরে ব্যাংক-ট্যাংক অফিস-টফিস থাকতো। তো নিচে স্টুডিও ছিল, একটা স্টুডিও নেহার। সে স্টুডিও নেহারের বয়স হলো ৬৩ সাল থেকে। জন্ম আমার চোখের সামনে। সে নেহার যেহেতু আমার বাসার সামনে, আমরা তখন থাকতাম গ্রিন রোড স্টাফ কোয়ার্টারের ১১ নম্বর বিল্ডিংয়ে। রাস্তা পার হলেই ১০০ ফিটের মধ্যে, ১০০ ফিটও না, আরও কম। তো ওই স্টুডিও নেহারে যাওয়া-আসা করতাম আমি। খুবই যোগাযোগ ছিল, তার মালিকের সাথে, ক্যামেরাম্যান যারা কারিগর ছিল, রিটাচ ফিনিশিং ফটোগ্রাফার, সবার সাথে। ওদের একটা ক্যামেরা ধার নিলাম। ঐদিন কী একটা ছুটির দিন ছিল। এর আগেও দিছিল ওরা আমাকে। সেইটা নিয়ে, ৭ই মার্চে একটা ফিল্ম নিয়ে গেলাম।

কিন্তু গিয়ে দেখলাম যে স্টেজে ওঠার কোনো ব্যবস্থা নাই। আমরা স্টেজের সামনে গিয়ে বসলাম, ইয়ার মোহাম্মদ খান সাহেবকে নিয়ে গেল আওয়ামী লীগের সব নেতারা, আর আমি, আমার বন্ধু এবং আরও দুই-একজন আমরা কাছাকাছি বসলাম স্টেজের। একসময় মনে হলো যে আমি স্টেজে উঠি। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে স্টেজে উঠলাম। ততক্ষণে সব ফটোগ্রাফাররা ছবি তুলে স্টেজ থেকে নিচে চলে গেছে। দুই-তিনজন আছে, বিদেশি দুই-তিনজন ফটোগ্রাফার আছে, ভিডিওগ্রাফার আছে, মুভি ক্যামেরাম্যান।

আমি উঠলাম। বক্স ক্যামেরা তো। একটু কষ্ট করে ছবি তুলতে হয়। তখন দেখলাম যে বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা দিতেছে, একটা ক্লিক করার সাথে সাথে পাজামা-পাঞ্জাবি পরা, তাগড়া একজন পাঞ্জাবি! অবাক হয়ে গেছি পাঠান দেখে। সে আইসা আমাকে ধরছে এবং খুব ভদ্র ব্যবহার করছে।

‘কোন প্রেসের?’—আমাকে জিজ্ঞেস করছে ভদ্রভাবে, আস্তে আস্তে। বক্তৃতা চলতেছে তো। আমি থতমত খেয়ে গেছি। ‘কার্ড আছে?’— আপনি করে বলতেছে। আমি একদম ছোকড়া, ঢাকা কলেজে পড়ি তখন। তো বললো আপনার নেমে যেতে হবে। এক্ষুনি চলে যান এখান থেকে। যেখানে বসছিলেন ওখানে চলে যান।

তো নাইমা গেলাম। আমার বন্ধুরা দূর থেকে দেখছে। আমি খুবই অপমানিত বোধ করছি। তো রক্ত অনেক গরম। মা বাপ তুইলা গালিগালাজ করি! অর্থ হয় না ! বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা চলতেছে। বক্তৃতা তো অল্প, বেশি সময় দেয় নাই। তো যাক, শেষ হইলো, সবকিছু হইলো।

তারপরে ওইদিন আমার মনে হইলো যে আমি যখন এত বড় নেতার ছবি তুলতে পারছি, আমার ইমেজ মেকার হইতে হবে। এই জাতির আমি ইমেজ মেকার হবো। তাইলে আমি কি করবো? তার আগে থেকেই ছিল যে আমি পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফার হব। যেই ফটোগ্রাফি সারা পৃথিবীতে, ইউরোপে, পশ্চিমা দেশে ব্যাপক চাহিদা এবং প্রচলিত একটা ধারা। কিন্তু বাংলাদেশে পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফার ছিল না। পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি বলতে বাংলাদেশে বুঝে ওই স্টুডিওর তোলা পাসপোর্ট ছবি বা এরকম বাস্ট ফিগার পোর্ট্রেট। যেইটাতে হাসি নাই, কান্না নাই, চিন্তা নাই, মগ্নতা নাই, যেটার মধ্যে আবিষ্কার করার কিচ্ছু নাই।

তারপরে দেখলাম যে আমি আমার দেশে কোন ছবি তুলবো? সৃষ্টিশীল ফটোগ্রাফার যারা, যারা প্রেস ফটোগ্রাফিও করে না, স্টুডিওর ফটোগ্রাফিও করে না, তারা ল্যান্ডস্কেপ বেইজড একটা ফটোগ্রাফি করে। মানে প্রকৃতি, সুন্দর প্রকৃতি তো বাংলাদেশে। কিন্তু আমি এইদিকে তো যাবো না।

রায়হান রাহিম: আপনি যাবেন না কেন?

নাসির আলী মামুন: এমন একটা ফ্রন্টিয়ার আমি উদ্বোধন করি, যেখান দিয়ে কেউ হাঁটে নাই। আমার দেশের যত বিখ্যাত লোক, তখন দেখতাম ফ্ল্যাপে বা কারো কাভারে, কিংবা ক্যাটালগে ছবি আছে, ঐগুলা তেমন জমতো না। বুঝতাম ঐগুলা স্টুডিওতে তোলা। তখন আমি চিন্তা করলাম আমি আলো ছায়া নিয়া খেলা করবো। এই যে আলো ছায়ার যুগলবন্দী, সিতার আর সরোদ যেভাবে বাজে সেইরকম করে। প্রকৃতিতে তো অনেক কালার। আমি সাদাকালোতে কাজ করবো আর বিখ্যাত লোকজনদের নিয়া কাজ করবো, যাদের চেহারার সাথে তার ছবির কোনো মিল নাই। ল্যান্ডস্কেপের বাইরে আমি চলে গেলাম। আমার দেশের কেউ তখন পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি জানে না। আমি প্রথম স্টার্ট করলাম, ১৯৭১ সালে।

হুমায়ূন শফিক: সেভেন্টি ওয়ানে ছবি তোলেন নাই?

নাসির আলী মামুন: কেউ আমারে ক্যামেরা দেয় নাই। অনেকের বাসায়ই ক্যামেরা ছিলো, আমি জানতাম, কেউই দেয় নাই। নেহার তখন বন্ধ। তারপরে তো নেহার খুললো। আমি ক্যামেরা ধার নিলাম। কয়েকজন বন্ধুবান্ধবের দাদার-বাবার ক্যামেরা ছিল, জানতাম। তারাও ধার দিতে থাকলো। এইভাবে আমি আবার শুরু করলাম এবং একটা তালিকা তখন করলাম যে, কারা কারা জীবিত। তখন সবাই জীবিত, ৪৭-এ রাজনীতিবিদের কথা বললাম, যারা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করছে, সবাই জীবিত। ম্যাক্সিমাম জীবিত। শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী মারা গেছে, কিন্তু আর সবাই জীবিত। মাওলানা তর্কবাগীশ ছিল, মওলানা ভাসানী তো সেদিন মারা গেল। ৭৭ এ না ৭৬এ? হ্যাঁ ৭৬ এ মারা গেল, নভেম্বরে।

তো একটা লিস্ট করে আগাই, কিন্তু পাত্তা দেয় নাই কেউ। আর ঠিকানা জানি না, বাসায়ও যাইতে পারি না। তখন গেলাম বাংলা একাডেমিতে। আমি জানতাম যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার দেয়। তো শুনলাম যে ঐখানে সব সাহিত্যিকদের ঠিকানা আছে। তখন তারা হেল্প করলো। লেখকদের ছবি! ওরাও নড়েচড়ে উঠলো! যে লেখকদের ছবি তুলতেছে এই কথা তো জীবনেও শুনে নাই!

বাংলা একাডেমি পুরষ্কার যাঁদের দিছে, তাঁদের একটা তালিকা আমারে দিল। টাইপ মেশিনে টাইপ করা। শামসুজ্জামান ভাই তখন বাংলা একাডেমিতে চাকরি করে। সহকারী পরিচালক। জামান ভাই খুব কোঅপারেট করছে আমারে। যাই হোক লেখকদের ছবি তোলা শুরু করলাম। ঐ সময় যে তালিকাটা পাইলাম ঐটা খুব উদ্বুদ্ধ করছিলো আমারে। লেখকদের কাছে যাই, সে আরও আট দশ জনের নাম বলে আমারে। কেউ কেউ বলে, ‘দেখি তো তোমার তালিকাটা দেখি। না না না, ওর তো লেখাই হয় না। ও তো তিন লাইন লেখতে পারে না। ওর তো বাক্য ভুল।’ অথচ পরে দেখছি সে বিরাট লেখক !

তখন আমি হাঁটতাম। সমানে হাঁটতাম। টাকা পয়সা কিচ্ছু ছিলো না। বন্ধুবান্ধবরা ফিল্ম কিনে দিত। যারা তখন হেল্প করছে, তাদের একজন জীবিত আছে, বাকিরা মারা গেছে। আমি সমানে সবার কাছে যাওয়া শুরু করলাম। বিজ্ঞানী, খেলোয়াড়। রাজনীতিবিদদের আমি আগে থেকেই জানতাম। আমি অনেক ভালো জানতাম যে কারা রাজনীতিবিদ, কারা ছাত্রনেতা। কারণ ঐসব মিটিংয়ে আমি যেতাম, ফলে ওইটা জানতাম। লেখকদের, বিজ্ঞানীদের, আর্টিস্টদের, সংগীতশিল্পীদের অত জানতাম না। উপরের লেভেলের কিছু নাম জানতাম। তারপরে আর জানতাম না। শামসুর রাহমানরা তো তখন কিছুই না। তখন বড় বড় আবদুল কাদির, ৪৭ এর পরে যেসব মুসলমান কবিরা... জসীম উদ্দীন, বেনজীর আহমদ, খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন, এরাই কবি সব। কারণ এদেরকে আমরা চিনি, ছোটবেলা থেকে পাঠ্যবইতে পড়ি। শামসুর রাহমান তো কিছুই না, পাঠ্যবইতে তো যায় নাই। মানে এরকম একটা ধারণা ছিল। ধারণাটা সত্যও ছিল তখন। এবং তখনকার কবিরা এতো গোছানো ছিল ! কবি আবদুল কাদির প্রত্যেক দিন উঠে লিখতেন। তার টার্গেট ছিল ৬-১০ পৃষ্ঠা। প্রত্যেক দিন! জ্বর থাকলেও লিখতো ! কবি মঈনুদ্দীন প্রতিদিন তাঁর ডায়েরি লিখতেন। কোলকাতা থেকে উনি ডায়েরিটা লেখা স্টার্ট করছিলেন। ওর মধ্যে আবার কবিতা লেখতো, ছড়া লেখতো! উনি মূলত শিশু সাহিত্যিক! আত্মজীবনীও লিখে গেছেন। অত্যন্ত গোছানো ছিলেন তাঁরা!

রায়হান রাহিম: তো শামসুর রাহমান আর আল মাহমুদ, এই দুইজন কবির মধ্যে আপনার সবার আগে খাতির হইল কার সাথে?

নাসির আলী মামুন: আল মাহমুদের সাথে!

রায়হান রাহিম: সেটা কেমনে হইলো?

নাসির আলী মামুন: উনার বাসায় আমি গেছিলাম। গণকণ্ঠে গিয়ে ঠিকানা নিয়ে উনার বাসায় গেছিলাম আমি। যে বাসা থেকে ৭৪ সালে উনি ধরা পড়েন ওই বাসায়। একটা ছোট্ট বাসা। ফ্লোর পাকা, চারিদিকে আংশিক ওয়াল পাকা, আবার একটু টিন। উপরে একটা রেলিং। যেই ঘরের মধ্যে চায়ের কাপ হাতে একটা ছবি এই এক্সিবিশনে আছে। চোখটা অন্য রকম। সেইখানে এক অডিয়েন্স আইসা বলতেছে চোখটা একটু কেমন জানি। উনি যে জেলে যাবে, এই ছবি দেখে বোঝা যাচ্ছে। ঠিক তার দেড় মাস পর উনি জেলে গেলেন।

আর শামসুর রাহমানের সাথে যোগাযোগ ৭৩ সালে। আল মাহমুদ ভাইয়ের ঠিক কয়েক মাস পরে। শামসুর রাহমান কয়েকজন কবির সাথে সরাসরি যোগাযোগ করায় দিলেন। হাসান হাফিজুর রহমান, আহসান হাবীবকে পেলাম, এরকম আরও অনেক কবির সাথে।

ছবি: নাসির আলী মামুনের সঙ্গে শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ
ছবি: নাসির আলী মামুনের সঙ্গে শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ

রায়হান রাহিম: শামসুর রাহমান কি একটু সংগঠক টাইপের ছিলেন?

নাসির আলী মামুন: না, একদমই ছিলেন না। উনি প্রতিষ্ঠানের বাইরে ছিলেন। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ—দুই কবিই কিন্তু প্রতিষ্ঠানের বাইরে। আল মাহমুদ আর শামসুর রাহমানের অনেক বিষয়ে সাদৃশ্য অনেক বিষয়ে বৈসাদৃশ্য আছে। দুইজনই সমসাময়িক। ওই বিভিন্ন সংগঠন এইটা ওইটা বানাইয়া দিছে তাঁদের, ওনারা কিন্তু ওইটার সাথে আসলে জড়িতই ছিল না। উপদেষ্টা করছিল এইসব, এইগুলি আছে। তাঁদের তো একটা চাকরি করতে হইছে, আল মাহমুদও চাকরি করছে, এইরকম কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে তাঁরা জড়িত ছিল না।

হুমায়ূন শফিক: আল মাহমুদ আর শামসুর রাহমান, দুইজন তো দুই ঘরানার। আপনি ছবির মাধ্যমে দুইজনকে এক করার চেষ্টা করলেন ক্যান?

নাসির আলী মামুন: আমি করলাম এই কারণে যে আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান বরাবরই দেখলাম যে বিচ্ছিন্ন থাকে। একজন আরেকজনের সাথে কথা বলে না!

রায়হান রাহিম: কেন? কী কাহিনী ছিল তাঁদের মধ্যে?

নাসির আলী মামুন: কারণটা তো জানি না।

রায়হান রাহিম: এইটা কি পোয়েটিক ইগো?

নাসির আলী মামুন: জানার জন্যই তো আমি গুপ্তচরের মতো তাঁদের পিছে লাগলাম। তাঁদের আত্মজীবনী বের হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। আল মাহমুদের বের হইল। আনফরচুনেটলি বা ফরচুনেটলি সেই আত্মজীবনীর ব্যাক কাভারে আমার তোলা তাঁর গালে হাত দেয়া ছবিটা আছে আরকি। ব্যাকে আমার নামও ছিলো। ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’, তার আত্মজীবনী, আমি বারেবারে পড়লাম। তারপর শামসুর রাহমানের ‘কালের ধুলোয় লেখা’ বেরিয়ে গেল, সেইটা আরও পরে বের হইছে। তখন আমি ঠিক করলাম আমি তাঁদের একটা ইন্টারভিউ নিবো। তখন শামসুর রাহমানকে বলি। উনি গড়িমসি করেন। শামসুর রাহমান রাজি হয় না। আল মাহমুদকে বলি। আল মাহমুদ রাজি হয় না শামসুর রাহমানের জন্য। এইভাবে চার বছর ! একজন আরেকজনের সাথে রাজি হয় না। কিন্তু, ইতিমধ্যে ১৯৮৫ সালে একটা কবি সম্মেলনে আমি তাঁদের সাথে কোলকাতা যাই। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ সহ আরও অনেক কবি ছিল এক সাথে। সেই কবির দলে আমাকেও নিয়ে যায়। কবি বানায়ে নিয়ে যায়। কোলকাতায় যখন যাই তো সেখানকার লোকজন তো সারপ্রাইজড ! আরে এইটা কে! কোলকাতায় বলে না ‘তুই কে রে?’ , ‘ক’টা বই তোর?’ ‘লিখিস তুই?’ , ‘তুই কি কবি?’ — তো যাই হোক! কবি সম্মেলনে তো আমার যাওয়ার কথা না, তো কেন নিয়ে গেছে? তখন শামসুর রাহমান বলতেছে, ‘ও লেখদের, কবিদের ছবি তোলে। ওকে আমরাই নিয়ে আসছি।’

তো সেখানে আমাদের সবাই বেশ ভালোভাবে রিসিভ করছে। আল মাহমুদ, শামসুর রাহমানকে সবাই তখন খুব ফলো করতেছে। দেখে দুইজনে দুইপাশে থাকে। এইটা আবার লক্ষ্য করছে সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বিশেষ করে শক্তি চট্টোপাধ্যায়—যে তাঁরা বিচ্ছিন্ন থাকে কেন? ওরাও খুব চেষ্টা করছে।

তো দেখি যে উনারা আলাদা থাকে। আমি লক্ষ্য রাখতাম মাহমুদ ভাই আর শামসুর রাহমানের ওপর! তো দেখি কলকাতায় একসাথে হয়। আবার একসাথে কোনো অনুষ্ঠানে বসছে, যেমন সত্যজিৎ রায়ের বাসায় একসাথে গেছে, বিভিন্ন আড্ডাতে একসাথে যাইতে হইছে, একটা ট্যুরিস্ট বাসে বা একটা মাইক্রোবাসে করে। ওইটার সঙ্গে আমি। তখন দেখি দূরে দূরে থাকে।

কোলকাতায় একটা পুরোনো বাড়ি, সেটা একটা কোলকাতা হাইকোর্টের জাস্টিস বি.সি বসাক, বিমল চন্দ্র বসাক, এখন মনে পড়ছে! এই বাড়িটাতেই সেই ঐতিহাসিক ছবিটা আমি উঠাইছিলাম। ওই পিঠাপিঠি যে ছবিটা, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান বিপরীতে থেকে, তাঁদের পিঠ ঠেকে দুজনের একসাথে ছবি। শরীরের স্পর্শ, উত্তাপ, সেই ছবিটার মধ্যে আছে। একজনের হাতে গ্লাস, আরেকজনের হাতে সিগারেট। আমি বললাম যে দুইটাই রাখেন যেভাবে আছে, রাজি হয়ে গেল। আমার সাথে সম্পর্ক হয়ে গেছে। শুধু ভক্ত বা শিষ্য না, একদম বন্ধুর মতো সম্পর্ক। দুজনের সাথে। রাজি হয়ে গেলেন। তার বাড়ির ব্যালকনিতে, এই বি.সি বসাক একজন বাঙালি, কোলকাতার খুব বিখ্যাত জাস্টিস, হাইকোর্টের বা সুপ্রিম কোর্টের। উনি বাংলাদেশের মানুষকে পছন্দ করে, কবিতা পড়ে। তাঁর স্ত্রীও শান্তিনিকেতনে পড়া, রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী, সুনন্দা বসাক। সেই বাড়িতে আমি দেখলাম যে একটা বড় সুযোগ, দুজনকে একসাথে পাইছি। ছবি তোলার নাম করে তাঁদেরকে ওইভাবে প্রথমে সামনে তাকাতে বললাম। তারপরে ওই পিঠাপিঠি ছবিটা।

রায়হান রাহিম: এই পিঠাপিঠি ছবিটা আপনি কেন তুললেন? আপনি নিজেই প্রপোজ করছিলেন না উনারা দাঁড়ায় গেলেন হঠাৎ?

পিঠাপিঠি দুই কবি, ছবি: রায়হান রাহিম
পিঠাপিঠি দুই কবি, ছবি: রায়হান রাহিম

নাসির আলী মামুন: আমি প্রপোজ করলাম যে এইভাবে দাঁড়ান। উনারা রাজি হয়ে গেলেন। আমার বিশ্বাস, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ দুইজনই আমার মতলব বুঝতে পারছে যে কেন এই ছবিটা তুলতেছি। তাঁরা খুব বোকা মানুষ না। তাঁদের জীবনে তারাও চাইতেন যে এই নাসির আলী মামুন, আমাদের বিশ্বস্ত এই ছেলেটা, এই ফটোগ্রাফার, এই শিল্পী, এই উদাসীন এবং কৌতূহলী, আলোচিত শিল্পী, তাঁর কাছেই আমাদের জীবনের দুর্লভ, অবিস্মরণীয় মুহূর্ত, পরবর্তী জেনারেশনের জন্য বন্দি হয়ে থাকুক। যাতে পরবর্তী জেনারেশন আমাদের এই ছবি কোনো স্থায়ী জায়গায় রাখতে পারে।

আপনি দেখবেন যে এইসব মানুষেরা অনেক দূরদর্শী। এরা তো দ্রষ্টা, সময়ের আগে চলে। যারা সৃষ্টিশীল মানুষ তাঁরা সময়ের আগে চলে। আর যারা কবি, আপনি বুঝেন যে, কল্পনা করে তারা কবিতা লেখে। বাস্তবের সাথে কোনো মিল নাই। তার মানে তার সৃষ্টিশীল শক্তি, তার চেতনার শক্তি, চিন্তার শক্তি কত প্রখর, তীব্র এবং কী ব্যাপক! এবং সেই জিওগ্রাফিটা কত বড়! কাজেই কবি অনেক জ্ঞানের অধিকারী। উনাদের ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি নেওয়ার দরকার নাই বা পিএইচডির দরকার নাই।

তো শান্তিনিকেতনে গেলাম অইখানে একটা আশ্চর্যজনক অবস্থা! অইখানে অনেক সুন্দর সুন্দর মেয়েরা আল মাহমুদকে দেখতে আসল। অবাক কান্ড! সোনালি কাবিনের কবি! শামসুর রাহমানের কোনো নাম নাই। শামসুর রাহমানও বাসে বসা, আল মাহমুদও বাসে বসা! আমরা চলে আসবো, তখন মেয়েরা বাস বন্ধ করে বাসে উঠে আসল। অটোগ্রাফ নিবে, সুন্দরী মেয়েরা সব! শামসুর রাহমানকে চিনতেছে না! তখন আমি বুঝলাম আল মাহমুদ কী জিনিস!

রায়হান রাহিম: দুইজনের মধ্যে কে সমালোচনা বেশি নিতে পারতো?

নাসির আলী মামুন: দুই জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা নিতে পারতো আল মাহমুদ! শামসুর রাহমানও পারতেন, কিন্তু কম!

হুমায়ূন শফিক: দুইজনের মধ্যে কে কার নামে বেশি সমালোচনা করতেন?

নাসির আলী মামুন: দুজনের মধ্যে কেউ আসলে কারো নামে তেমন সমালোচনা ঠিক করতো না, কিন্তু অলক্ষ্যে একটা বিভাজন ছিল, সেই বিভাজন তৎকালীন আশেপাশের কবিরাই সৃষ্টি করেছিল। শামসুর রাহমান আল মাহমুদ কিন্তু এগুলা করেন নাই। আমরাই করছি। একদল চলে গেছিল শামসুর রাহমানের সাথে, আরেকটা ক্ষুদ্র দল মাহমুদ সাথে। এই যে বিচ্ছিন্ন আল মাহমুদ, তাঁর শেষ জীবনটা অত্যন্ত নিঃসঙ্গ আর একাকীত্বের মধ্যে গেছে। শামসুর রাহমান যেহেতু প্রভাব বিস্তারকারী একজন কবি, বনেদী পরিবারে জন্ম, কাজেই শামসুর রহমান এলিট কবি আর আল মাহমুদ তো গ্রাম থেকে আসছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌড়াইল, মোল্লাবাড়ি। আল মাহমুদ ওই লেভেলে যেতে পারে নাই। কিন্তু আল মাহমুদ তো মুক্তিযুদ্ধ করার লোক, জেল খাটা লোক।

প্রত্যেকটা বড় শিল্পী বড় কবির মধ্যে একটা উত্তাপ থাকে। সেই উত্তাপটা অনেক সময় এমনও হয় আরেকজনকে ছারখার করে দেয়। এটাই স্বাভাবিক। দুনিয়ার সব জায়গায় দুই জন গ্রেট থাকলে এ রকমটা হয়। এই উত্তাপটা যারা বুঝতে পারছে তারাই বিভাজনটা তৈরি করে দিছে। আপনি করেন, ওর কিচ্ছু হবে না। আল মাহমুদের কাছে গিয়ে ওরা বলতো যে শামসুর রাহমান আপনারে এই বলছে, ঐ বলছে। এইগুলা নিয়া গসিপ হইছে, নানা কাহিনী হইছে, যাই হোক এগুলা নিয়ে আমি একটা বই লিখতেছি। গদ্যের বই।

রায়হান রাহিম: পোট্রেট যখন আপনি তোলেন আপনি কি আপনার সাবজেক্টের সাথে আলাপ টালাপ কইরা মোমেন্ট তৈয়ার করেন নাকি অ্যাকসিডেন্টাল মোমেন্টাম ক্যাপচার করেন?

নাসির আলী মামুন: অনেকে আমারে দেখলে মনে করে যে এই লোকটা বোধহয় বোকা টাইপের, গাধা, পড়াশোনা নাই। না না। যদি নাই থাকতো, এতো মানুষের চরিত্র এবং বিভিন্ন মুহূর্ত, কোন মুহূর্ত আমার ক্যামেরার মধ্যে দরকার, কোন মুহূর্ত অডিয়েন্সের জন্য দরকার, আগামী প্রজন্মের জন্য রক্ষা করা দরকার, সেটা আমি কিভাবে করবো যদি ইন্টেলিজেন্স না থাকে ভিতরে?

প্রত্যেকে আমাকে বই উপহার দিছে। প্রত্যেকের বইগুলা আছে। ৫০ বছর আগের, ৪০ বছর আগের বইগুলা। আমি অবাক হইছি। অনেকে ভবিষ্যদ্বাণী করছে অনেকবার। আমার সম্পর্কে, ৪০, ৪৫ বছর আগে। সেগুলিও ফলছে।

রায়হান রাহিম: আচ্ছা ! এখন ঐ ছবির গল্পটা আমাদের বলেন!

হুমায়ূন শফিক: ওই যে আল মাহমুদ নামাজ পড়তেছে, শামসুর রাহমান পাশে বইসা কী জানি খাচ্ছে।

নাসির আলী মামুন: ও ওইটা রোজার দিনে! ৩১ অক্টোবর,২০০৪ সাল। ৩ বাই ১ শ্যামলীতে, দুইজনকেই তার আগে বলে রাখলাম, দুইজনেই রাজি হয়ে গেছে! আমি আল মাহমুদকে নিয়ে, সিএনজিতে করে শামসুর রাহমানের বাসায় চলে আসছি। ইফতারির অনেক আগে। শামসুর রাহমান যে টাইম দিছে, তার এক ঘণ্টা আগে আমি চলে আসছি। আসার সাথে সাথে আমি যে কাজটা করছি, সেইটা হইলো উনার টেলিফোনটা… শামসুর রাহমানের অনেক টেলিফোন আসতো। উনার ভক্তরা, বান্ধবীরা ফোন করতো। তো আমি তারটা খুলে একটা বইয়ের নিচে লুকায় রাখছি। কারণ তারটা যদি দেখা যায়, তাইলে তো আবার লাগায় দিবে… কাজেই আর কোনো ফোন আসলো না। শামসুর রাহমান সাহেবের পুত্রবধূ টিয়াকে আমি বিষয়টা জানাইলাম, যে ‘টিয়া আমি এই কাজটা করছি। বাইরের কেউ আসলে তুমি একটু ডিসকারেজ কইরো, বইলো যে উনি অসুস্থ!’

তো আমি যখন শামসুর রাহমানকে নিয়ে আসছি, ঐ মুহূর্তটা ছিল দেখার মতন! শামসুর রাহমান একদম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছেন! একদম থতমত অবস্থা!

হুমায়ূন শফিক: শামসুর রহমান কি জানতেন না আল মাহমুদ আসতেছেন?

নাসির আলী মামুন: জানতেন! কিন্তু উনি ভাবছিলেন যে এটা হবে না! চার বছর ধরে বলছি, রাজি হয়, রাজি হয় না! উনি দেখে তো অবাক! যদি ফোন করতাম যে নিয়ে আসতেছি, তাইলে হয়তো না করতো! ফোন আর আমি করি নাই! এই প্রথম শামসুর রাহমানের বাসায় আল মাহমুদের যাওয়া! কী মহাকাব্যিক একটা ঘটনা! ভূমিকম্প হয়ে যাওয়ার মতো একটা ঘটনা! ভূমিকম্প মানে হাইপোথিটিক্যালি ভূমিকম্প! এই যে দুইজনের একটা বিনিময়, এইটা অনেক বড় একটা ঘটনা। একটু পরে দেখলাম তাঁরা যেন পঞ্চাশের দশকে ফিরা গেছে! অনেকক্ষণ আমরা চুপচাপ বসে ছিলাম। আল মাহমুদ সিগারেট ধরাইছে! আকাশের দিকে তাকায়া হাসে। শামসুর রাহমানও তাকায়।

রায়হান রাহিম: উনারা কি হাগ করছিলেন একজন আরেকজনরে?

নাসির আলী মামুন: হাগ হয় নাই, কিন্তু তাঁরা হ্যান্ডশেক করছিলেন একজন আরেকজনের সাথে। তো এইটা দেখলাম আমি। এই কম্পনটা আমিই দেখলাম খালি। আর কেউ দেখে নাই। এইটা নিয়ে যদি কেউ গবেষণা করে, লেখে বা ভিডিও করে রাখতো, আমি তো ভিডিও করতে পারি নাই, কিছু স্টিল ছবি খালি।

রোজার মধ্যে শামসুর রাহমান খাইতেছে, আল মাহমুদ তারই রুমে নামাজ পড়তেছে। আনএক্সপেক্টেড! সম্ভব না। ভূমিকম্প হইলে যেভাবে ২০ তলা, ৪০ তলা বিল্ডিং ভেঙে পড়বে, ওইটা তাই ছিল। অথবা ওই যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পরে, বিনা বিচারে, কোনো ক্রাইম না করে যে যাবজ্জীবন হয় না অনেকের? বের হইতেছে, খুন না কইরাও খুনের আসামি হইয়া সে সারাজীবন জেলে থাকছে। কিন্তু মুক্তি যখন পাইলো, সেই একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গেলো। কিসের? বাংলা ভাষার কবিতার। কবিতারও যে একটা জীবন আছে, সে মুক্তি পাইলো। তখন ওই মুহূর্তে মনে হইছে কবিতা ওই তিন বাই এক শ্যামলীর, ওই শামসুর রাহমানের বাসায় কবিতা মুক্ত। মুক্তি পাইছে।

কিন্তু পরে, কবিতা আবার কারাগারে চলে গেছে। একটা কোথায় যেন কথা আছে, Man is born free but everywhere he is in chains. যেই ঘরের থেকে বের হয়ে গেল আবার শিকল।

হুমায়ূন শফিক: এই ছবিটা কি পরবর্তীতে কোনো পত্রিকায় প্রকাশিত হইছিলো?

নাসির আলী মামুন: ওই ছবিটা অনেকদিন কেউ চায়ও নাই, নেয়ও নাই। আমি বই আকারে করবো বলে সিদ্ধান্ত নিছিলাম। তার আগে, নভেম্বর মাসের শেষের দিকে। সম্ভবত ৩০শে নভেম্বর। ২০০৪-এর দিকে, ওইটার একটা অংশ, মতি ভাইয়ের প্রথম আলোয়। প্রথম আলো তো আর ছাপতে চায় না। কয়, ‘না থাক, দুইজন একসাথে। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ! থাক থাক! শামসুর রাহমানের কিছু আছে? থাকলে দ্যান!’ আমি কইলাম, ‘না থাক, গেলে আল মাহমুদ শামসুর রাহমান দুইজনের এক সাথে যাবে!’ তারপর মতি ভাই বললো, এডিটর, বলে যে, ‘তোমাদের কোনো বুদ্ধিসুদ্ধি আছে? আল মাহমুদ শামসুর রাহমান কি কখনো একসাথে বসে? আর ও তো ইন্টারভিউ করে নিয়ে আসছে। আর তোমরা এইটা ছাপতে অনাগ্রহ দেখাইতেছো? ইমিডিয়েটলি ছাপবা।’

পনের দিন ধইরা এগুলি ছাপবে না ছাপবে না, ৩০ শে নভেম্বর প্রথম আলোর সাহিত্য পাতায় এইটা ছাপলো। এইটার হেডিং ছিলো: ‘আমরা কালের অক্ষর লিখতে এসেছি’। প্রথম আলো কোনদিন এতো বড় ইন্টারভিউ ছাপে নাই। সাজ্জাদ শরীফ এইটা নিয়া খুব ইন্টারেস্ট দেখাইলো। কিন্তু তাঁর অ্যাসিস্টেন্ট যে ছিল সে আরকি গাইগুঁই করছে! এইটার মধ্যে আমার যে ভাষা ছিলো সেইটা নাই। আমি আবার আমার বইয়ের মধ্যে ঐটা নিয়ে আসছি।

বিখ্যাৎ সেই ছবির সঙ্গে রায়হান রাহিম। ছবি: হুমায়ূন শফিক
বিখ্যাৎ সেই ছবির সঙ্গে রায়হান রাহিম। ছবি: হুমায়ূন শফিক

এই ইন্টারভিউয়ের সময়, যখন আল মাহমুদ নামাজ পড়তেছিল, শামসুর রাহমান আমাকে ডেকে বলতেছিল যে, ‘এই মালটাকে নিয়ে যাও।’ শামসুর রাহমান আমাকে দুইবার বলছে, ‘এই মালটাকে নিয়ে যাও।’ তো যাই হোক, আল মাহমুদ শোনে নাই। উনি তো স্বতঃস্ফূর্ত ইফতারি খাইছে দাইছে। তারপরে অপেক্ষা করতেছিল যে আরও কথা বলি। রাত্রে নিশ্চয়ই খাওয়াবে। কিন্তু শামসুর রাহমান সেই ব্যবস্থা করে নাই। এটা করা ঠিক হয়নি। রাত ৯টায় আমরা বের হয়েছি, কিন্তু কোনো খাওয়ার ব্যবস্থা করেনি।

মানে এই রকম একটা মানুষ, আল মাহমুদ তাঁর ইন্টারভিউয়ে বারে বারে বলছে, ‘শামসুর রাহমান তো বড় কবি! উনি কোনো কবিতা লেখবেন, আর আমি সেটা পড়বো না, এটা হতে পারে না। আমি তার কবিতার বড় পাঠক। শামসুর রাহমান তার কবিতায় কী অক্ষর লেখেন, কী কাজ করেন তা আমাকে দেখতে হবে।’ শামসুর রাহমান সেটা শুনতেছে। তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই আপনি? আল মাহমুদের কবিতা পড়েন?’ বলে, ‘হ্যাঁ । পড়বো না কেন? আল মাহমুদ তো ভালো কবি।’ তারপর একবার বললো, ‘হ্যাঁ, ও (আল মাহমুদ) বড় কবি।’

তারপরে বললাম যে, ‘মাহমুদ ভাই আপনি তো শামসুর রাহমানরে নিয়ে লিখছেন?’ ‘ হ্যাঁ আমি লিখেছি। কিন্তু সেটা একটা বড় মৌলিক প্রবন্ধ। তাঁর বন্ধুরাও তাঁকে চিনতো না।’ কারা? খান সারওয়ার মুরশিদ, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, কায়সুল হক, রশীদ করিম, এদের নাম উনি বলতে থাকলেন। ‘তাঁর বন্ধুরা তো তাঁকে চেনে না, বুঝতে পারে নাই। প্রথম আমি চিনেছি। আমি তার সম্পর্কে লিখেছিলাম।’ সেইটা তাঁর বইয়ে ছাপা হয়েছে, কবিতার জন্য বহুদূর এই প্রবন্ধে, শামসুর রাহমান। বইটার নামও তাই।’

বলে, ‘শামসুর রাহমান তো আমার জন্য একটা বাক্যও ব্যয় করে নাই’। শামসুর রাহমান চুপ। ‘রাহমান ভাই আপনি এটা কেন করলেন?’ শামসুর রাহমান বলে, ‘না, সময় পাই নাই। না ও ভালো কবি, বড় কবি, আমি... আসলে হয় নাই, এটা সেটা।’ শামসুর রাহমান আসলে এক লাইনও লেখে নাই। কিন্তু উনি (আল মাহমুদ) বারে বারে বলছেন, উনি (শামসুর রাহমান) বড় কবি।

এই যে একটা যুগলবন্দি হয়ে গেল, সেতার আর সরোদের। কাকে বড় বলবো? রবি শঙ্কর? নাকি ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ? দুইজনই সমানভাবে বাজাইছে।

রায়হান রাহিম: আচ্ছা আপনার পোর্ট্রেটের পিছনে যে ব্যাকগ্রাউন্ড, ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে আসলে আপনি কী চিন্তা করেন? ব্যাকগ্রাউন্ড প্রায় সময় দেখা যায় অন্ধকার থাকে। এইটা ইম্পর্টেন্ট কেন?

নাসির আলী মামুন: আমার কাছে সবচাইতে বেশি ইম্পর্টেন্ট ওই মানুষটার চেহারা। তার স্ট্রাকচার। ওই মানুষটার বিশেষ বিশেষ চিহ্নগুলো, তার মুখের, তার শরীরের, এবং তার হৃদয়ের যে বাক্যগুলো, সেগুলি আমি দেখতে পারি কিনা। যখন আমি দেখতে পারি, সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। তখন আমি তাকে সুন্দরভাবে সেই বাক্য রচনা করানোর চেষ্টা করি ছবির মাধ্যমে।

ব্যাকগ্রাউন্ড সেকেন্ডারি অংশ। কিন্তু ইম্পর্টেন্ট একটা অংশ অবশ্যই, কারণ আমি ব্যাকগ্রাউন্ড বেশিরভাগ সময়ই সাদা দেয়াল, কালো করে দিই। অনেকে বলে যে কীভাবে করেন? আমি বলি যে করা যায়, যাবে না কেন? আপনি যদি চান, আপনার চেহারা যেকোনো রকম করতে পারেন না? করা যায় তো! অনেকে বলে আপনি ছবি তুলেন, কিন্তু সাথে কাউরে নেন না। আমি অনেকবার শুনছি কথাটা। হ্যাঁ, আমি কাউরে নেই না, কারণ এইটা তো আড্ডা না।

রায়হান রাহিম: আচ্ছা আপনি এত মানুষের ছবি তুলছেন, কার পোর্ট্রেট তুলতে যেয়ে সবচেয়ে বেশি প্যারা খাইছেন, বা ঝামেলা হইছে, এরকম কোনো ঘটনা আছে কি?

নাসির আলী মামুন: ঝামেলা এরকম হয় নাই। বেশিরভাগই আমাকে কোঅপারেট করছে। যখন আমি বলা শুরু করলাম, ৭০ এর দশকের শেষের দিকে যে দেখেন, আপনারা তো আমাকে সময় দিতে চান না, কিন্তু সময় ব্যয় করে আপনারা স্টুডিওতে যান। স্টুডিওতে অনেক সময় ব্যয় করেন, টাকা দেন। আপনারা তো সেলিব্রিটি। আপনাদের তো কোনো সময় নাই, আপনারা তো খুব ব্যস্ত মানুষ। স্টুডিওতে যান কেন ছবি তুলতে? তো আপনাদের তো আসল চেহারা আসে না। ওই যে ওই চেহারাটা, দেখান তো দেখি, ওটা কি আপনি? আমি বললাম যে এইটা আপনি।

স্টুডিও আপনার বাসায় আসবে। তখন অনেকে নড়েচড়ে বসলো যে স্টুডিও বাসায় আসবে, কী কয়? অনেককে ছবি প্রিন্ট করে করে, কোয়ার্টার সাইজ ছবি দিয়ে আসতাম। দেখে, যারা ছবি বুঝতো, বলতো হ্যাঁ, তো এইটাই তো আমার ছবি।

স্টুডিওরটা তো আপনার ছবি না। আপনার চেহারাটা কালো, চেহারা সাদা। অনেককে বলতাম যে দেখেন, আপনার এই জায়গাটা গর্ত, আপনার গাল ফুলাইয়া দিছে। তখন বুঝতে পারতো যে হ্যাঁ, পার্থক্যটা।

বললাম যে আপনি যা, আপনি তো তাই। আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিলে আপনার যা আসবে, সেটা যদি কেউ পরিবর্তন করে দেয় কিছু দিয়া? তাইলে তো আপনি থাকবেন না। আমি সেটাই বলে বোঝাইতে পারছি। আপনি দেখবেন যে আমাদের দেশে প্রকাশনা জগতে, প্রিন্ট মিডিয়াতে, প্রিন্ট মিডিয়ায় এখন তো অনলাইনও আছে। বিখ্যাত মানুষদের পোর্ট্রেট যে ছাপা হয়, তার আগে স্টুডিওর সব ছবি ছাপা হতো। পাসপোর্ট সাইজের ছবি। এই জায়গাটা আমি একটা নীরব বিপ্লব করার চেষ্টা করছি। এবং মনে হয় যে সাকসেসফুল। এইটা নিয়া কেউ হয়তো গবেষণা করবে একদিন!

পপস্ট্রিম টিমের সঙ্গে নাসির আলী মামুন
পপস্ট্রিম টিমের সঙ্গে নাসির আলী মামুন

রায়হান রাহিম: একটা ফটোগ্রাফার সে যদি ভালো পোর্ট্রেট তুলতে চায়, তার প্রতি আপনার কী সাজেশন থাকবে?

নাসির আলী মামুন: আমার আসলে কোনো সাজেশন নাই। আমি তাদের বলবো যে আপনারা কোনো, কারো কোনো সাজেশন শুনবেন না। আপনাদের হাতে যে গ্যাজেট, সেটা একটা মহাবিশ্ববিদ্যালয়। এবং এই যে নেট তথ্যপ্রযুক্তি, প্রত্যেক সেকেন্ডে সেকেন্ডে নতুন তথ্য দিচ্ছে, যা আপনি জানতে চান। একটা প্রশ্নের হাজারটা উত্তর। এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বড় ফটোগ্রাফার, ম্যাগাজিন, বই, যত পিক্টোরিয়াল জিনিস, যেকোনো মিউজিয়াম, লাইব্রেরিতে আপনারা ঢুকতে পারতেছেন, ভিজিট করতে পারতেছেন।

কাজেই আপনার তো কোনো জায়গায় ভর্তি হওয়ার দরকার নাই। সময় নাই, টাকা নাই, আপনার এই যে শিক্ষক, মহাবিশ্ববিদ্যালয়, আপনারা ওর কাছ থেকে সব জানতে পারবেন। কাজেই আমার কোনো দিক নির্দেশনার দরকার নাই।

leadT1ad

সম্পর্কিত

leadT1ad
leadT1ad