অস্ত্রের লড়াই বনাম অবকাঠামোর রাজনীতি: যুদ্ধের ছায়ায় চীনের নীরব জয়যাত্রা

প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৩: ০০
স্ট্রিম গ্রাফিক

একুশ শতকের তৃতীয় দশকে বিশ্বরাজনীতি এক অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের অস্ত্রের ভান্ডার ও অর্থনীতিকে বিসর্জন দিচ্ছে। একদিকে কামানের গর্জন আর ক্ষেপণাস্ত্রের ঝিলিক যখন পরাশক্তিগুলোকে যুদ্ধের চোরাবালিতে নিমজ্জিত করছে, ঠিক তখনই হয়তো বেইজিংয়ের দপ্তরে সংগোপনে আঁকা হচ্ছে আগামীর বিশ্ব পুনর্গঠনের নীলনকশা।

রাশিয়া, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যখন পারস্পরিক সামরিক ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিতে জর্জরিত, চীন তখন তার অক্ষত অর্থনীতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার দিকে ধাবমান বলেই প্রতীয়মান হয়।

অস্ত্রের লড়াইয়ে যখন সবাই ক্লান্ত, চীন তখন দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল নির্মাণ কৌশলের অগ্রভাগে। এই নীরব জয়যাত্রা কেবল সামরিক শক্তি নয়, বরং অবকাঠামোর রাজনীতি দিয়ে বিশ্বকে জয় করার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।

ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই ‘ড্রাগন’ কি তবে যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর ভাগ্যবিধাতা হতে চলেছে? এমন এক প্রেক্ষাপটে রণক্ষেত্রের উন্মাদনাকে ছাপিয়ে চীনের এই কৌশলগত উত্থানই সম্ভবত এখন বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় কৌতূহল।

যুদ্ধের চোরাবালিতে বিশ্বশক্তি: ক্লান্ত পশ্চিম ও বিপর্যস্ত রাশিয়া

বর্তমান বিশ্ব এক ছায়াযুদ্ধের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে, যেখানে প্রচলিত পরাশক্তিগুলো তাদের দীর্ঘদিনের সঞ্চিত সামরিক ও অর্থনৈতিক পুঁজি রণক্ষেত্রে বিসর্জন দিচ্ছে। রাশিয়া ও আমেরিকা—উভয় পক্ষই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই রণক্লান্তি কেবল অস্ত্রের ভাণ্ডারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিশ্বমঞ্চে তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও নীতিনির্ধারণী সক্ষমতাকেও ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু করে তুলছে।

রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ

ইউক্রেন যুদ্ধের দুই বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর রাশিয়ার অর্থনীতি এখন পূর্ণাঙ্গ ওয়ার ইকোনমিতে রূপান্তরিত হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য একটি অশনি সংকেত। যদিও মস্কো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা করে তাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু এর সিংহভাগই আসছে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন থেকে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে না।

যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে প্রায় ৫ লক্ষাধিক নিয়মিত সৈন্য ও আধুনিক টি-৯০ ট্যাঙ্কের মতো প্রযুক্তির বিশাল অংশ নিয়োজিত থাকায় দেশটির অভ্যন্তরীণ উৎপাদনশীলতা ও শ্রমবাজার সংকটের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে সাইবেরিয়া বা দূরপ্রাচ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে নতুন পরিকাঠামো বা রাস্তাঘাট নির্মাণের বাজেট এখন ডনবাসের যুদ্ধের ময়দানে কামানের গোলা হয়ে বিস্ফোরিত হচ্ছে।

উচ্চ সুদের হার এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপে সাধারণ রুশ নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, যা পুতিন সরকারের জন্য ভবিষ্যতে একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তির জন্য রাশিয়ার চীনের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা প্রমাণ করে যে, দেশটি সামরিকভাবে টিকে থাকলেও অর্থনৈতিকভাবে তার সার্বভৌমত্ব হারাতে বসেছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত রাশিয়ার ‘গ্রেট পাওয়ার’ ইমেজকে আজ কেবল একটি আঞ্চলিক সামরিক শক্তিতে সংকুচিত করে ফেলেছে।

আমেরিকার অস্ত্রের ভান্ডার ও সরবরাহ সংকট

আমেরিকা বর্তমানে ইউক্রেন এবং ইসরায়েল—এই দুই ফ্রন্টে সমান্তরাল সামরিক সহায়তা দিতে গিয়ে তাদের কয়েক দশকের অস্ত্রের মজুদ বা ‘স্টকপাইল’ নিয়ে চরম উদ্বেগের মুখে পড়েছে। পেন্টাগনের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইউক্রেনকে প্রতি মাসে কয়েক হাজার ১৫৫ মিমি আর্টিলারি শেল সরবরাহ করতে গিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন ক্ষমতা তার সীমার শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে। প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেম এবং জ্যাভলিন অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইলের মতো অত্যাধুনিক অস্ত্রের মজুদ এতটাই কমেছে যে, এখন তা আমেরিকার নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অনেক সমর বিশেষজ্ঞ মনে করেন।

এই বিশাল সামরিক ব্যয় মেটাতে গিয়ে ওয়াশিংটনকে ক্রমাগত ঋণের বোঝা বাড়াতে হচ্ছে, যার ফলে মার্কিন জাতীয় ঋণের পরিমাণ ৩৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিরক্ষা খাতের এই অস্বাভাবিক বিনিয়োগ সরাসরি মার্কিন মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে, যা সাধারণ মার্কিনিদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। একইসাথে তাইওয়ান প্রণালীতে সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক প্রস্তুতিও এই দুই যুদ্ধের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অস্ত্র সরবরাহের গোলকধাঁধায় আটকে গিয়ে আমেরিকা তার বিশ্বব্যাপী সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দ্রুত হারিয়ে ফেলছে।

মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র: ধ্বংস ও শূন্যতা

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপট কেবল যুদ্ধের ময়দান নয়, বরং এটি একটি বিশাল মানবিক ও কাঠামোগত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। একদিকে ছায়াযুদ্ধের বিস্তার এবং অন্যদিকে সরাসরি সংঘাত অঞ্চলটির অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডকে ভেঙে দিয়েছে। এই শূন্যতা একদিকে যেমন ট্রিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন চাহিদার সৃষ্টি করেছে, তেমনি কয়েক দশকের মার্কিন নিরাপত্তা বলয়কেও চরম আস্থার সংকটে ফেলেছে।

অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি

ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংঘাতের ফলে গাজা, দক্ষিণ লেবানন এবং ইয়েমেনের মতো অঞ্চলগুলোর মানচিত্র আজ আমূল বদলে গেছে। বিশেষ করে গাজা উপত্যকার ৮০ শতাংশের বেশি আবাসন ও নাগরিক পরিষেবা এখন ব্যবহার অনুপযোগী, যা পুনর্গঠনে কয়েক দশক সময় লাগতে পারে।

বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের প্রাথমিক সমীক্ষা অনুযায়ী, এই অঞ্চলের ধ্বংসপ্রাপ্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সমুদ্রবন্দর এবং পানি শোধন ব্যবস্থা পুনরায় সচল করতে কমপক্ষে ১ দশমিক ৫ থেকে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। লেবাননের গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর এবং বৈরুত সামুদ্রিক বন্দরের বাণিজ্যিক সক্ষমতা যুদ্ধের কারণে বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির অর্থনীতি কার্যত দেউলিয়া হওয়ার পথে।

বর্তমান বিশ্ব এক ছায়াযুদ্ধের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে, যেখানে প্রচলিত পরাশক্তিগুলো তাদের দীর্ঘদিনের সঞ্চিত সামরিক ও অর্থনৈতিক পুঁজি রণক্ষেত্রে বিসর্জন দিচ্ছে। রাশিয়া ও আমেরিকা—উভয় পক্ষই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ইয়েমেনের হুদাইদাহ বন্দরের মতো কৌশলগত পয়েন্টগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন বা সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে এক গভীর দীর্ঘমেয়াদী সংকটে নিমজ্জিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ভয়াবহ অবকাঠামোগত শূন্যতা পূরণের জন্য কোনো একক দেশের পক্ষে অর্থায়ন করা সম্ভব নয়, যা অঞ্চলটিকে আন্তর্জাতিক পুঁজি ও নির্মাণ প্রযুক্তির জন্য এক নতুন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পরিণত করেছে।

আমেরিকার কৌশলগত পিছুটান

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের মার্কিন সামরিক একাধিপত্য বর্তমানে এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, যা ওয়াশিংটনের ‘সিকিউরিটি গ্যারান্টার’ ভাবমূর্তিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। ইরাক, সিরিয়া এবং জর্ডানে অবস্থিত আমেরিকার ১৩টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটির ওপর ক্রমাগত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রমাণ করেছে যে, অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকার পরও তারা সম্পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।

এই নিরাপত্তা ব্যর্থতার ফলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মিশরের মতো দেশগুলো এখন কেবল ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর না করে তাদের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতিতে বহুমুখীকরণ আনার কথা ভাবছে। পেন্টাগনের বিপুল সামরিক ব্যয় সত্ত্বেও হুথি বিদ্রোহীদের লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল বন্ধ করা থেকে আটকাতে না পারা আমেরিকার কৌশলগত প্রভাব হ্রাসের স্পষ্ট ইঙ্গিত।

মিত্র দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে, আমেরিকা বর্তমানে ইউক্রেন ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের উত্থান সামলাতে এতটাই ব্যস্ত যে মধ্যপ্রাচ্যের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা তাদের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে নিচে নেমে গেছে। এই আস্থার সংকটই মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে বেইজিং বা মস্কোর মতো বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকতে প্ররোচিত করছে, যারা সামরিক হস্তক্ষেপের বদলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।

চীনের ‘সফট পাওয়ার’ ও অবকাঠামোর রাজনীতি

বিশ্বের প্রধান সামরিক শক্তিগুলো যখন ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্রের মহড়ায় ব্যস্ত, বেইজিং তখন অত্যন্ত সুকৌশলে তার অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বকে পুনর্গঠনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। যুদ্ধ যখন জনপদকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে, চীন সেখানে আধুনিক অবকাঠামো ও উন্নয়নের স্বপ্ন দেখিয়ে দেশগুলোর আস্থার জায়গায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে। মূলত হার্ড পাওয়ার বা সামরিক শক্তির বদলে সফট পাওয়ার বা অর্থনৈতিক নির্ভরতার ওপর ভিত্তি করেই চীনের এই নীরব বিশ্বজয়ের পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। চীনের এই কৌশল তিনটি স্তম্ভের ওপর নির্ভর করে।

পুনর্গঠন খাতে একচেটিয়া আধিপত্য ও নিরপেক্ষতা

চীন নিজেকে কোনো সামরিক ব্লকের অংশ না করে একজন ‘নিরপেক্ষ অংশীদার’ ও ‘নির্মাণকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি মধ্যস্থতা করার পর বেইজিংয়ের গ্রহণযোগ্যতা আকাশচুম্বী হয়েছে। এখন যখন ইসরায়েল-ইরান সংঘাত বা ইউক্রেন যুদ্ধের পর ট্রিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন কাজের প্রয়োজন হবে, তখন ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশগুলো পশ্চিমা শর্তযুক্ত ঋণের চেয়ে চীনের দ্রুত ও কার্যকর নির্মাণ প্রযুক্তিকেই বেছে নেবে। চীনের নিরপেক্ষ অবস্থান তাদের জন্য যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে রাজনৈতিক ঝক্কিমুক্ত ব্যবসা ও একচেটিয়া বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে।

বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ ও লজিস্টিক চেইন

চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম অবকাঠামো প্রকল্প, যা এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকাকে একটি নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুক্ত করছে। যুদ্ধের ফলে যখন মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব ইউরোপের সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়েছে, চীন তখন তার নিজস্ব রেললাইন, সমুদ্রবন্দর এবং ডিজিটাল সিল্ক রোডের মাধ্যমে বিকল্প বাণিজ্য পথ সচল রেখেছে। পশ্চিমা দেশগুলো যেখানে তাদের বাজেট গোলাবারুদ তৈরিতে খরচ করছে, চীন সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট সিটি এবং আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা নির্মাণে বিনিয়োগ করছে। এই কৌশলগত নেটওয়ার্ক দেশগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে চীনের ওপর অর্থনৈতিকভাবে ঋণী ও নির্ভরশীল করে তুলছে।

অক্ষত উৎপাদন ক্ষমতা ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তি

বর্তমান বিশ্বমঞ্চে চীনই একমাত্র পরাশক্তি যার উৎপাদন ক্ষমতা ও শিল্প কাঠামো যুদ্ধের আঁচমুক্ত এবং সম্পূর্ণ অক্ষত। বিশ্বের বৃহত্তম ইস্পাত ও সিমেন্ট উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে পুনর্গঠনের প্রতিটি ব্লকের জন্য বিশ্বকে বেইজিংয়ের দিকেই তাকাতে হবে। পশ্চিমা প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন যেখানে কয়েকশ আর্টিলারি শেলের জন্য হিমশিম খাচ্ছে, চীনের ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেজ সেখানে কয়েক হাজার মাইল রাস্তা বা আধুনিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সক্ষমতা রাখে। এই অতুলনীয় উৎপাদন ক্ষমতা এবং সাশ্রয়ী নির্মাণ খরচ চীনকে যুদ্ধোত্তর বৈশ্বিক বাজারে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও একচেটিয়া সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে।

ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব: সামরিক আধিপত্য বনাম অর্থনৈতিক নির্ভরতা

একবিংশ শতাব্দীর এই ক্রান্তিলগ্নে বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—যেখানে পশ্চিমা বিশ্ব ‘নিরাপত্তা’ ও ‘প্রতিরক্ষা’র দোহাই দিয়ে বিলিয়ন ডলারের মারণাস্ত্র বিক্রি করছে, চীন সেখানে ‘উন্নয়ন’ ও ‘অংশীদারিত্বের’ কথা বলে নির্মাণ করছে বন্দর, সেতু আর আধুনিক রেললাইন। পশ্চিমা শক্তির সামরিক আধিপত্য সাময়িকভাবে যুদ্ধের ময়দান নিয়ন্ত্রণ করলেও, দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এখন নির্ধারিত হচ্ছে অর্থনৈতিক নির্ভরতার মানদণ্ডে।

একটি ঐতিহাসিক সত্য হলো, যুদ্ধে জয়ী হওয়া আর যুদ্ধ-পরবর্তী শান্তি ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করা এক কথা নয়; বরং রণক্ষেত্রে বিজয় অনেক সময় বিজয়ীর অর্থনীতিকেই পঙ্গু করে দেয়। আমেরিকা হয়তো তার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে মিত্রদের যুদ্ধে টিকিয়ে রাখতে বা জয়ী করতে পারে, কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে নতুন করে শহর গড়ার আর্থিক ও সাংগঠনিক সক্ষমতা এখন বেইজিংয়ের হাতেই সবচেয়ে বেশি।

যখন ধোঁয়াশাচ্ছন্ন রণক্ষেত্র শান্ত হবে, তখন বিধ্বস্ত দেশগুলো অস্ত্রের চেয়ে অন্ন এবং আশ্রয়ের দিকেই বেশি ঝুঁকবে, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই চীনের অবকাঠামোর রাজনীতি পূর্ণতা পাবে। এর ফলে কামানের গোলার চেয়ে সিমেন্ট আর ইস্পাতের এই লড়াইয়ে চীন নিঃশব্দে বিশ্বব্যবস্থার চালকের আসনে বসতে যাচ্ছে। সামরিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং দেশগুলোর অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড নির্মাণের কারিগর হয়ে চীন এক নতুন ‘প্যাক্স সিনিকা’ বা চীনা শান্তি যুগের সূচনা করছে।

ভবিষ্যৎ ইতিহাসে হয়তো একদিন এক অমোঘ সত্য লেখা থাকবে—যখন একবিংশ শতাব্দীর বড় বড় সামরিক শক্তিগুলো একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করার নেশায় মারণাস্ত্রের মহড়া আর যুদ্ধের উন্মাদনায় মত্ত ছিল, চীন তখন নিঃশব্দে বিশ্বের নতুন ধমনীগুলো অর্থাৎ অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নিশ্ছিদ্র বাণিজ্য পথ নির্মাণ করে ফেলেছিল।

রাশিয়া-ইউক্রেন বা মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে অস্ত্রের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কার জয় বা কার পরাজয় হলো, তা হয়তো ছাপিয়ে যাবে এক বিশাল অর্থনৈতিক বাস্তবতার কাছে। কারণ যুদ্ধের ধোঁয়া যখন কাটবে, তখন বিধ্বস্ত দেশগুলোর টিকে থাকার জন্য কামানের গোলার চেয়ে সিমেন্ট, ইস্পাত আর প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে সবচেয়ে বেশি। ঠিক সেই মুহূর্তেই ‘অবকাঠামোর রাজনীতি’র সুফল ভোগ করবে বেইজিং, যারা ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে নতুন শহর গড়ার সক্ষমতা ও পুঁজি—উভয়ই অক্ষত রেখেছে।

পশ্চিমা বিশ্ব যখন তাদের শেষ গোলাবারুদটুকু ইউক্রেন বা ইসরায়েলের মরুভূমিতে বিসর্জন দিচ্ছে, চীন তখন বিশ্বের বিশাল এক নির্মাণ কৌশলের অগ্রভাগের মেরুদণ্ড হতে যাচ্ছে। এই নীরব জয়যাত্রা প্রমাণ করে যে, বর্তমান বিশ্বে সাম্রাজ্য দখলের লড়াই আর সীমান্তের কাঁটাতারে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে বন্দর, রেললাইন আর ডিজিটাল সিল্ক রোডের জালে। দিনশেষে সামরিক আধিপত্যের পতন ঘটলেও অবকাঠামোর একচেটিয়া নির্ভরতায় চীন বিশাল ব্যবধানে জয়ী হওয়ার পথে আজ অপ্রতিরোধ্য শক্তি।

লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক

সম্পর্কিত