স্ট্রিম প্রতিবেদক

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে আলোচনার জন্য বিরোধীদলীয় নেতার দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে আগামী মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দুই ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা হবে। তবে এর আগে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা নিয়ে সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে অনির্ধারিত বিতর্ক হয়েছে।
ঈদের ছুটির পর আজ রোববার (২৯ মার্চ) বেলা ৩টায় ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন আবার শুরু হয়। এতে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালনরত ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সভাপতিত্ব করেন। সংসদে বিভিন্ন বিষয়ে তারকা চিহ্নিত ও সম্পূরক প্রশ্ন তুলেছেন সংসদ সদস্যরা। তবে সংসদে আজ উত্তাপ ছড়িয়েছে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সংসদ মুলতবি প্রস্তাব এবং তা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যে।
বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাব
কার্যপ্রণালি বিধি ৬২ অনুযায়ী জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাবের আওতায় প্রাপ্ত নোটিশগুলোর নিষ্পত্তি করতে গিয়ে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল জানান, প্রথম মুলতবি প্রস্তাবের নোটিশটি দিয়েছেন ঢাকা-১৫ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
ডেপুটি স্পিকার জানান, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫)-এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে আলোচনা করার জন্য সংসদের কাজ মুলতবি করার প্রস্তাব করেছেন। এরপরে তিনি কার্যপ্রণালি বিধির ৬৫ বিধি অনুযায়ী বিরোধীদলীয় নেতাকে মুলতবি প্রস্তাবটি উত্থাপনের অনুমতি প্রার্থনার আহ্বান জানান। শফিকুর রহমান অনুমতি চাইলে তাঁকে অনুমতি দেওয়া হয়।
প্রস্তাব উত্থাপনের শুরুতে বিরোধীদলীয় নেতা গত সাড়ে ১৭ বছর যাঁরা বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়েছেন তাঁদেরকে বিশেষভাবে স্মরণ করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আজকের এই সংসদটি গতানুগতিক কোনো সংসদ নয় এবং স্বাভাবিক ধারায় এটা গঠিত হয়নি। এই সংসদ বিশেষ একটা প্রেক্ষাপটে গঠিত হয়েছে। আমরা সকলেই এখানে আজকে যাঁরা আছি কমবেশি সাড়ে ১৫ বছর একটি স্বৈরশাসনের ফ্যাসিবাদী শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট ছিলাম। আমার ধারণা জেলের ভাত না খাওয়া মানুষ এখানে বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর যদি দু-একজন পাওয়া যায় তারা খুবই ভাগ্যবান। তারা হয়তো দেশেই ছিলেন না এজন্য তাদের জেলের ঠিকানা খুঁজতে হয়নি।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এরকম একটা প্রেক্ষাপটে আমাদের এই সংসদ গঠিত হয়েছে। এটাও ঠিক সাড়ে ১৫ বছর ধারাবাহিকভাবে এই ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করেছি, সংগ্রাম করেছি, আন্দোলন করেছি। কিন্তু সে আন্দোলনের কোনো সুফল আমরা হাতে তুলে নিইনি। এর মধ্য দিয়ে আমরা অনেকেই ২৩-২৪ সালে জেলে ছিলাম।’
এই সময় স্পিকার বিধি অনুযায়ী লিখিত বিবৃতিটি পড়ে শোনানোর অনুরোধ করেন। কথা শেষ করার জন্য এক মিনিট সময় চেয়ে নিয়ে শফিকুর রহমান আবার বলতে থাকেন, ‘আমরা জেলে ছিলাম। আমাদের জেলে রেখেই একটা “আমি-ডামি” নির্বাচন হয়েছে। সেই নির্বাচনের পরে একটা বিশেষ প্রেক্ষাপটে আমাদের তরুণ যুবসমাজের একটা দাবিকে অগ্রাহ্য-অমান্য করার কারণে গায়ের জোরে দমন করার পথ বেছে নেওয়ার কারণে তারা জীবন বাজি রেখে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছিল, নেতৃত্ব দিয়েছিল। আমি তাদের প্রতি আবারো কৃতজ্ঞতা জানাই, অভিনন্দন জানাই। সেই আন্দোলনে দলমত নির্বিশেষে সমস্ত মজলুম মানবতা তাদের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিল। আন্দোলন সফল হয়েছিল, সেই সফলতার প্রেক্ষাপটেই সময়ের ধারাবাহিকতায় আজকের এই সংসদ।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এই সংসদ যে কারণে হয়েছে এটার প্রত্যাশা আমরা সকলেই জানি। এই সংসদ ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটনের জন্য দায়িত্ব নিয়ে হয়েছে। আবার যাতে ফ্যাসিবাদ ফিরে না আসে এই জন্যই সংস্কারের প্রস্তাবগুলো আমরা সর্বসম্মতিক্রমে সিগনেচার করে, তার সিগনেটরি হয়ে আমরা এখানে এসেছি।’
এরপরে উত্থাপিত প্রস্তাবে তিনি জানান, আইনে থাকা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের নিরঙ্কুশ জয়ের ফলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা আইনানুগভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিতে বাধ্য। এসব কারণ দেখিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা সংসদ মুলতবি করে এ বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেন।
আইনমন্ত্রীর ব্যাখ্যা
শফিকুর রহমানের বক্তব্য শেষ হলে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিষয়টিকে বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাব আকারে আনাকে অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেন। বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে জানিয়ে তিনি বলেন, তবে এ আলোচনার আগে একটু সময় প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রত্যেক সংসদ সদস্যের টেবিলের সামনে বাংলাদেশের সংবিধান, জুলাই সনদ, এই বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশ—এই কয়েকটি কপি অবশ্যই থাকতে হবে। কারণ জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে গোটা জাতি এক ধরণের বিভ্রান্তির মধ্যে আছে যে কারা সত্য?’
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেখাতে চাই, আমরাও চাই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন হোক। আমরা জুলাই জাতীয় সনদের পথ ধরে হেঁটে চলেছি। আমরা জুলাই জাতীয় সনদের প্রত্যেকটি ধারা, উপ-ধারা কীভাবে ধরে এগিয়ে চলেছি সেটা আমরা দেখাবো। যেমন সেই কারণে এই বইগুলো আপনাদের সামনে থাকা দরকার।’
এ সময় তিনি বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, ‘অ্যাট দ্য সেম টাইম আমি এটাও দেখাতে চাই, ইতিমধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এর কোন কোন ধারা আপনারা লঙ্ঘন করেছেন। সেটা আমরা উপস্থাপন করতে চাই। এটা ডিবেট হওয়া প্রয়োজন। অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ, অত্যন্ত সময়োপযোগী এই সাবজেক্টে আলোচনার জন্য মাননীয় স্পিকার আপনি একটি সময় নির্ধারণ করে দেন এবং এই চারটি বই তার সাথে আমি অনুরোধ করবো যদি সম্ভব হয় উনারা জানেন আরও তিনটি বই লাগবে।’ আলোচনার জন্য একটি তারিখ নির্ধারণ করে দেওয়ার অনুরোধও জানান আইনমন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যাখ্যা ও বিতর্ক
আইনমন্ত্রীর কথা বলা শেষ হতেই কথা বলতে দাঁড়ান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শুরুতেই তিনি বলেন, ‘আমাদের মাননীয় আইনমন্ত্রী অত্যন্ত সহৃদয় ব্যক্তি। তাই আমাকে বেশি বলে সবাই সমালোচনা করি। তিনি এক কথায় সব রাজি হয়ে গেছেন—আলোচনা নির্ধারণ করেন, সময় নির্ধারণ করেন; হবস, লকস, রুশোর বই বের করেন; সংবিধান, জুলাই জাতীয় সনদ এবং সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ সবকিছু দেন। তারপর ডিবেট হবে আলোচনা হবে—কোথায় কী ভায়োলেট হয়েছে না হয়েছে।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কিন্তু আমি একটু বিধি মানা লোক, আমি একটু বিধি অনুসারে কথা বলি মাননীয় স্পিকার। আমার পয়েন্ট অব অর্ডার হচ্ছে, প্রথমে মাননীয় স্পিকারকে অনুরোধ করেছিলাম সেদিন যেদিন মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা এই একই বিষয় উত্থাপন করেছিলেন, যে উনাকে নোটিশ দিতে বলেন। …নোটিশ উনি দিয়েছেন, নোটিশের একটা কপি সৌভাগ্যক্রমে আমি পেয়েছি এখানে টেবিলে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ৬৮ বিধিতে নোটিশ দিতে হয়। এর ফলে আধা ঘণ্টা আলোচনার সময় পাওয়া যায়। কিন্তু এই নোটিশটি দেওয়া হয়েছে ৬২ বিধিতে। যেখানে তিন দিনের মধ্যে দুই ঘণ্টা আলোচনার সুযোগ পাওয়া যায়।
এ সময় স্পিকারের উদ্দেশে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দিস ইজ মাই পয়েন্ট অব অর্ডার। মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতাকে সংশোধিত নোটিশ আবার দিতেও বলতে পারেন। আপনার রাইট আছে। ইউ আর মাই লর্ড অব দ্য হাউস, অভিভাবক, ইউ ক্যান ইন্টারপ্রেট। এই পার্লামেন্টে আপনি সবকিছু সংশোধন করতে পারবেন। সেই হিসেবে যদি আপনি এখতিয়ার প্রকাশ করেন, প্রয়োগ করেন তাহলে উনি আবার নোটিশ প্রদান করতেও পারে অথবা আপনি সংশোধিত আকারে নিতে পারেন।’
আরেকটু ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার নোটিশটি ৬৮ ধারায় গ্রহণ করলে আলোচনার সময় আধা ঘণ্টা আর ৬২ ধারায় নোটিশ গ্রহণ করলে তিন দিনের মধ্যে দুই ঘণ্টা আলোচনার সুযোগ স্পিকারের দেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে। স্পিকারকে তিনি বলেন, ‘যদি আপনি সম্মত হন এবং বিরোধীদলীয় সদস্যদের মধ্যে যদি ২৫ জন সেটা সমর্থন করে এবং সরকারি দলের সদস্যদের মধ্যে যদি কেউ আপত্তি না তোলে। এখন আমি আপত্তিও তুলছি না অনাপত্তিও তুলছি না, কারণ সেজন্য আপনার অনুমতি লাগবে, আলোচনা হবে। নোটিশটাই তো বৈধ হয়নি। আপনি বৈধভাবে আগে নোটিশ দিতে বলেন। তারপরে আলোচনা হবে।’
এই পর্যায়ে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের অনেকে একসাথে কথা বললে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তাঁর বক্তব্য শেষ করতে বলেন ডেপুটি স্পিকার। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি বিরোধীদলীয় সদস্যদের ফ্লোর দিবেন অসুবিধা নাই। বাট লেট মি স্পিক। আমরা যেন আগের কালচারে ফেরত না যাই। আপনি যদি আমাকে সময় না দেন তাহলে আমি বসে যাবো—এটাই বিধি।’
ডেপুটি স্পিকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আলোচনা চালিয়ে যেতে বললে প্রায় ১০ মিনিট কথা বলেন তিনি। ‘আপনি এখন ডিসাইড করতে পারেন মাননীয় স্পিকার, ইউ আর মাই লর্ড অফ দ্য হাউস। ধন্যবাদ।’ বলে বক্তব্য শেষ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
ডেপুটি স্পিকারের ঘোষণা
এই পর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘আমরা মাননীয় আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনেছি। এর পাশাপাশি মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য শ্রবণ করে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি ৬৫ এর ২ অনুযায়ী আমাদের তিন দিনের মধ্যে এই বিষয়টা নিষ্পত্তি করতে হবে সেই হিসেবে আগামী ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখ রোজ মঙ্গলবার দিনের সর্বশেষ বিষয় হিসেবে দুই ঘণ্টাকাল বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাবটি আলোচনার জন্য সময় নির্ধারণ করছি। আগামী ৩১শে মার্চ, মঙ্গলবার, দুই ঘণ্টা।’
ডেপুটি স্পিকারের এই ঘোষণার পরেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবারও কথা বলতে দাঁড়ান। সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরাও দাঁড়িয়ে যান। এ সময় সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, মঙ্গলবারের আলোচনার সাথে তিনি সম্মতি প্রকাশ করছেন। উত্তরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, সম্মতি প্রকাশ করলে আর কিছু বলার দরকার নেই। ডেপুটি স্পিকার দুই পক্ষকেই বসতে বলেন। ইতিমধ্যে তাঁর সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছে বলেও জানান তিনি। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখনও নোটিশ সংশোধনের কথা বলতে থাকলে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সমস্বরে কথা বলতে থাকেন। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, স্পিকারের ঘোষণার পরে এই বিষয়ে আর কারো কোনো কথা চলে না।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে আলোচনার জন্য বিরোধীদলীয় নেতার দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে আগামী মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দুই ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা হবে। তবে এর আগে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা নিয়ে সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে অনির্ধারিত বিতর্ক হয়েছে।
ঈদের ছুটির পর আজ রোববার (২৯ মার্চ) বেলা ৩টায় ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন আবার শুরু হয়। এতে স্পিকারের অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালনরত ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সভাপতিত্ব করেন। সংসদে বিভিন্ন বিষয়ে তারকা চিহ্নিত ও সম্পূরক প্রশ্ন তুলেছেন সংসদ সদস্যরা। তবে সংসদে আজ উত্তাপ ছড়িয়েছে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সংসদ মুলতবি প্রস্তাব এবং তা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যে।
বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাব
কার্যপ্রণালি বিধি ৬২ অনুযায়ী জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাবের আওতায় প্রাপ্ত নোটিশগুলোর নিষ্পত্তি করতে গিয়ে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল জানান, প্রথম মুলতবি প্রস্তাবের নোটিশটি দিয়েছেন ঢাকা-১৫ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
ডেপুটি স্পিকার জানান, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫)-এর অনুচ্ছেদ ১০ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে আলোচনা করার জন্য সংসদের কাজ মুলতবি করার প্রস্তাব করেছেন। এরপরে তিনি কার্যপ্রণালি বিধির ৬৫ বিধি অনুযায়ী বিরোধীদলীয় নেতাকে মুলতবি প্রস্তাবটি উত্থাপনের অনুমতি প্রার্থনার আহ্বান জানান। শফিকুর রহমান অনুমতি চাইলে তাঁকে অনুমতি দেওয়া হয়।
প্রস্তাব উত্থাপনের শুরুতে বিরোধীদলীয় নেতা গত সাড়ে ১৭ বছর যাঁরা বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়েছেন তাঁদেরকে বিশেষভাবে স্মরণ করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আজকের এই সংসদটি গতানুগতিক কোনো সংসদ নয় এবং স্বাভাবিক ধারায় এটা গঠিত হয়নি। এই সংসদ বিশেষ একটা প্রেক্ষাপটে গঠিত হয়েছে। আমরা সকলেই এখানে আজকে যাঁরা আছি কমবেশি সাড়ে ১৫ বছর একটি স্বৈরশাসনের ফ্যাসিবাদী শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট ছিলাম। আমার ধারণা জেলের ভাত না খাওয়া মানুষ এখানে বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর যদি দু-একজন পাওয়া যায় তারা খুবই ভাগ্যবান। তারা হয়তো দেশেই ছিলেন না এজন্য তাদের জেলের ঠিকানা খুঁজতে হয়নি।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এরকম একটা প্রেক্ষাপটে আমাদের এই সংসদ গঠিত হয়েছে। এটাও ঠিক সাড়ে ১৫ বছর ধারাবাহিকভাবে এই ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করেছি, সংগ্রাম করেছি, আন্দোলন করেছি। কিন্তু সে আন্দোলনের কোনো সুফল আমরা হাতে তুলে নিইনি। এর মধ্য দিয়ে আমরা অনেকেই ২৩-২৪ সালে জেলে ছিলাম।’
এই সময় স্পিকার বিধি অনুযায়ী লিখিত বিবৃতিটি পড়ে শোনানোর অনুরোধ করেন। কথা শেষ করার জন্য এক মিনিট সময় চেয়ে নিয়ে শফিকুর রহমান আবার বলতে থাকেন, ‘আমরা জেলে ছিলাম। আমাদের জেলে রেখেই একটা “আমি-ডামি” নির্বাচন হয়েছে। সেই নির্বাচনের পরে একটা বিশেষ প্রেক্ষাপটে আমাদের তরুণ যুবসমাজের একটা দাবিকে অগ্রাহ্য-অমান্য করার কারণে গায়ের জোরে দমন করার পথ বেছে নেওয়ার কারণে তারা জীবন বাজি রেখে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছিল, নেতৃত্ব দিয়েছিল। আমি তাদের প্রতি আবারো কৃতজ্ঞতা জানাই, অভিনন্দন জানাই। সেই আন্দোলনে দলমত নির্বিশেষে সমস্ত মজলুম মানবতা তাদের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিল। আন্দোলন সফল হয়েছিল, সেই সফলতার প্রেক্ষাপটেই সময়ের ধারাবাহিকতায় আজকের এই সংসদ।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এই সংসদ যে কারণে হয়েছে এটার প্রত্যাশা আমরা সকলেই জানি। এই সংসদ ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটনের জন্য দায়িত্ব নিয়ে হয়েছে। আবার যাতে ফ্যাসিবাদ ফিরে না আসে এই জন্যই সংস্কারের প্রস্তাবগুলো আমরা সর্বসম্মতিক্রমে সিগনেচার করে, তার সিগনেটরি হয়ে আমরা এখানে এসেছি।’
এরপরে উত্থাপিত প্রস্তাবে তিনি জানান, আইনে থাকা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের নিরঙ্কুশ জয়ের ফলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা আইনানুগভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিতে বাধ্য। এসব কারণ দেখিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা সংসদ মুলতবি করে এ বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেন।
আইনমন্ত্রীর ব্যাখ্যা
শফিকুর রহমানের বক্তব্য শেষ হলে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিষয়টিকে বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাব আকারে আনাকে অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী বলে মন্তব্য করেন। বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে জানিয়ে তিনি বলেন, তবে এ আলোচনার আগে একটু সময় প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রত্যেক সংসদ সদস্যের টেবিলের সামনে বাংলাদেশের সংবিধান, জুলাই সনদ, এই বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশ—এই কয়েকটি কপি অবশ্যই থাকতে হবে। কারণ জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে গোটা জাতি এক ধরণের বিভ্রান্তির মধ্যে আছে যে কারা সত্য?’
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেখাতে চাই, আমরাও চাই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন হোক। আমরা জুলাই জাতীয় সনদের পথ ধরে হেঁটে চলেছি। আমরা জুলাই জাতীয় সনদের প্রত্যেকটি ধারা, উপ-ধারা কীভাবে ধরে এগিয়ে চলেছি সেটা আমরা দেখাবো। যেমন সেই কারণে এই বইগুলো আপনাদের সামনে থাকা দরকার।’
এ সময় তিনি বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, ‘অ্যাট দ্য সেম টাইম আমি এটাও দেখাতে চাই, ইতিমধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এর কোন কোন ধারা আপনারা লঙ্ঘন করেছেন। সেটা আমরা উপস্থাপন করতে চাই। এটা ডিবেট হওয়া প্রয়োজন। অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ, অত্যন্ত সময়োপযোগী এই সাবজেক্টে আলোচনার জন্য মাননীয় স্পিকার আপনি একটি সময় নির্ধারণ করে দেন এবং এই চারটি বই তার সাথে আমি অনুরোধ করবো যদি সম্ভব হয় উনারা জানেন আরও তিনটি বই লাগবে।’ আলোচনার জন্য একটি তারিখ নির্ধারণ করে দেওয়ার অনুরোধও জানান আইনমন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যাখ্যা ও বিতর্ক
আইনমন্ত্রীর কথা বলা শেষ হতেই কথা বলতে দাঁড়ান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শুরুতেই তিনি বলেন, ‘আমাদের মাননীয় আইনমন্ত্রী অত্যন্ত সহৃদয় ব্যক্তি। তাই আমাকে বেশি বলে সবাই সমালোচনা করি। তিনি এক কথায় সব রাজি হয়ে গেছেন—আলোচনা নির্ধারণ করেন, সময় নির্ধারণ করেন; হবস, লকস, রুশোর বই বের করেন; সংবিধান, জুলাই জাতীয় সনদ এবং সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ সবকিছু দেন। তারপর ডিবেট হবে আলোচনা হবে—কোথায় কী ভায়োলেট হয়েছে না হয়েছে।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কিন্তু আমি একটু বিধি মানা লোক, আমি একটু বিধি অনুসারে কথা বলি মাননীয় স্পিকার। আমার পয়েন্ট অব অর্ডার হচ্ছে, প্রথমে মাননীয় স্পিকারকে অনুরোধ করেছিলাম সেদিন যেদিন মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা এই একই বিষয় উত্থাপন করেছিলেন, যে উনাকে নোটিশ দিতে বলেন। …নোটিশ উনি দিয়েছেন, নোটিশের একটা কপি সৌভাগ্যক্রমে আমি পেয়েছি এখানে টেবিলে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ৬৮ বিধিতে নোটিশ দিতে হয়। এর ফলে আধা ঘণ্টা আলোচনার সময় পাওয়া যায়। কিন্তু এই নোটিশটি দেওয়া হয়েছে ৬২ বিধিতে। যেখানে তিন দিনের মধ্যে দুই ঘণ্টা আলোচনার সুযোগ পাওয়া যায়।
এ সময় স্পিকারের উদ্দেশে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দিস ইজ মাই পয়েন্ট অব অর্ডার। মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতাকে সংশোধিত নোটিশ আবার দিতেও বলতে পারেন। আপনার রাইট আছে। ইউ আর মাই লর্ড অব দ্য হাউস, অভিভাবক, ইউ ক্যান ইন্টারপ্রেট। এই পার্লামেন্টে আপনি সবকিছু সংশোধন করতে পারবেন। সেই হিসেবে যদি আপনি এখতিয়ার প্রকাশ করেন, প্রয়োগ করেন তাহলে উনি আবার নোটিশ প্রদান করতেও পারে অথবা আপনি সংশোধিত আকারে নিতে পারেন।’
আরেকটু ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার নোটিশটি ৬৮ ধারায় গ্রহণ করলে আলোচনার সময় আধা ঘণ্টা আর ৬২ ধারায় নোটিশ গ্রহণ করলে তিন দিনের মধ্যে দুই ঘণ্টা আলোচনার সুযোগ স্পিকারের দেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে। স্পিকারকে তিনি বলেন, ‘যদি আপনি সম্মত হন এবং বিরোধীদলীয় সদস্যদের মধ্যে যদি ২৫ জন সেটা সমর্থন করে এবং সরকারি দলের সদস্যদের মধ্যে যদি কেউ আপত্তি না তোলে। এখন আমি আপত্তিও তুলছি না অনাপত্তিও তুলছি না, কারণ সেজন্য আপনার অনুমতি লাগবে, আলোচনা হবে। নোটিশটাই তো বৈধ হয়নি। আপনি বৈধভাবে আগে নোটিশ দিতে বলেন। তারপরে আলোচনা হবে।’
এই পর্যায়ে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের অনেকে একসাথে কথা বললে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তাঁর বক্তব্য শেষ করতে বলেন ডেপুটি স্পিকার। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি বিরোধীদলীয় সদস্যদের ফ্লোর দিবেন অসুবিধা নাই। বাট লেট মি স্পিক। আমরা যেন আগের কালচারে ফেরত না যাই। আপনি যদি আমাকে সময় না দেন তাহলে আমি বসে যাবো—এটাই বিধি।’
ডেপুটি স্পিকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আলোচনা চালিয়ে যেতে বললে প্রায় ১০ মিনিট কথা বলেন তিনি। ‘আপনি এখন ডিসাইড করতে পারেন মাননীয় স্পিকার, ইউ আর মাই লর্ড অফ দ্য হাউস। ধন্যবাদ।’ বলে বক্তব্য শেষ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
ডেপুটি স্পিকারের ঘোষণা
এই পর্যায়ে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘আমরা মাননীয় আইনমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনেছি। এর পাশাপাশি মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য শ্রবণ করে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি ৬৫ এর ২ অনুযায়ী আমাদের তিন দিনের মধ্যে এই বিষয়টা নিষ্পত্তি করতে হবে সেই হিসেবে আগামী ৩১ মার্চ ২০২৬ তারিখ রোজ মঙ্গলবার দিনের সর্বশেষ বিষয় হিসেবে দুই ঘণ্টাকাল বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাবটি আলোচনার জন্য সময় নির্ধারণ করছি। আগামী ৩১শে মার্চ, মঙ্গলবার, দুই ঘণ্টা।’
ডেপুটি স্পিকারের এই ঘোষণার পরেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবারও কথা বলতে দাঁড়ান। সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরাও দাঁড়িয়ে যান। এ সময় সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, মঙ্গলবারের আলোচনার সাথে তিনি সম্মতি প্রকাশ করছেন। উত্তরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, সম্মতি প্রকাশ করলে আর কিছু বলার দরকার নেই। ডেপুটি স্পিকার দুই পক্ষকেই বসতে বলেন। ইতিমধ্যে তাঁর সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছে বলেও জানান তিনি। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখনও নোটিশ সংশোধনের কথা বলতে থাকলে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সমস্বরে কথা বলতে থাকেন। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, স্পিকারের ঘোষণার পরে এই বিষয়ে আর কারো কোনো কথা চলে না।

সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ থাকলেও রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তা কোনো প্রভাব ফেলবে না।
৩ ঘণ্টা আগে
ইন্দোবাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস সংগ্রাম পরিষদের টানা দুই দিনের সর্বাত্মক কর্মবিরতির মুখে নতি স্বীকার করেছে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ। আন্দোলনের মুখে চারজন শ্রমিকের ছাঁটাই আদেশ প্রত্যাহারসহ চার দফা দাবি মেনে নিয়েছে মালিকপক্ষ।
৫ ঘণ্টা আগে
লিবিয়ায় বন্দিশালায় (গেমঘর) দালালের নির্যাতনে মাদারীপুরের দুই যুবক নিহত হয়েছেন। সপ্তাহখানেক আগে মৃত্যু হলেও তা পরিবারের কাছে গোপন রাখা হয়।
৫ ঘণ্টা আগে
পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় (৪২) মারা গেছেন। রোববার (২৯ মার্চ) পশ্চিমবঙ্গ ও উড়িষ্যার সীমান্তবর্তী তালসারি সমুদ্র সৈকতে শুটিং করতে গিয়ে পানি ডুবে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই চলচ্চিত্র জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
৫ ঘণ্টা আগে