মাইগ্রেন কেন হয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন নতুন কথা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

মাইগ্রেন। সংগৃহীত ছবি

কিছুদিন আগেই মাইগ্রেনের ব্যথায় মৃত্যুবরণ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার ইউএনও। মাইগ্রেন আর সাধারণ মাথাব্যথা যে এক জিনিস নয়, এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হয়েছেন ঠিকই কিন্তু এই ব্যথা কেন হয় বা কীভাবে এই ব্যথাকে জীবন থেকে পুরোপুরি বিদায় করা যায়, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি।

যাদের মাইগ্রেনের সমস্যা আছে, তারা জানেন ব্যথাটা কীভাবে ধীরে ধীরে কাবু করে ফেলে রোগীকে। মনে হয় মগজ আর খুলির মাঝখানে অনেকটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়েছে। মাথা একটু কাত করলেই সেই ফাঁকা জায়গায় তরল আগুনের মতো ব্যথা গড়িয়ে পড়ে। ব্যথাটা চোখের মণির পেছনে গিয়ে ঠিক একটা ছুরির মতো বিঁধে থাকে, তারপর ছড়িয়ে পড়ে চোয়াল পর্যন্ত।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বজুড়ে ১১০ থেকে ১২০ কোটি মানুষ এই যন্ত্রণার ভুক্তভোগী। মানুষকে শারীরিকভাবে অক্ষম বা অচল করে দেওয়ার দিক থেকে এই স্নায়ুবিক রোগটি বিশ্বে দ্বিতীয়। অথচ, এত মানুষের এই সমস্যা থাকা সত্ত্বেও মাইগ্রেন নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞান এখনো নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি।

তবে বিবিসির সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিজ্ঞানীরা এখন মাইগ্রেনের জট খুলতে শুরু করেছেন। কয়েকটি বিষয়ে গবেষণা করে তারা এখন নিশ্চিত—এটি কেবল সাধারণ মাথাব্যথা নয়; এর সঙ্গে স্নায়ুবিক জটিলতাও অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত।

মাইগ্রেন নিয়ে যত কুসংস্কার

আঠারো ও উনিশ শতকে মাইগ্রেনের সমস্যাকে চিকিৎসকরা খুব একটা গুরুত্ব দিতেন না। তারা একে ‘মেয়েলি রোগ’ বা নারীদের ‘ঢং’ বলে উড়িয়ে দিতেন। মনে করা হতো, এই মাথা ব্যথার সমস্যা অতি বুদ্ধিমতী আর সুন্দরী নারীদের ‘হিস্টিরিয়া’ বা মানসিক বিকার।

বিবিসির ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মাইগ্রেন রোগীদের তিন-চতুর্থাংশই নারী। এই লিঙ্গবৈষম্যের কারণেই দীর্ঘকাল ধরে মাইগ্রেন নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয়নি, মেলেনি পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দও।

অথচ মাইগ্রেনের প্রভাব মারাত্মক। সাধারণত ২৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সী মানুষদের মধ্যেই মাইগ্রেনের সমস্যা বেশি দেখা যায়। জীবনের যে সময়টায় মানুষের কর্মশক্তি সবচেয়ে বেশি থাকে, সেসময়টাতেই মাইগ্রেনের ব্যথায় ঘায়েল হয়ে ছটফট করতে হয় বিছানায়।

কারণ নাকি লক্ষণ? দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা

আমরা অনেকেই ভাবি, চকলেট, পনির, কফি খেলাম বা একটু বেশি পারফিউম মাখলাম বলেই হয়তো মাইগ্রেনটা শুরু হলো। এগুলোকে আমরা মাইগ্রেনের ‘ট্রিগার’ বা কারণ বলে মনে করি। কিন্তু বিজ্ঞানীদের নতুন গবেষণা এই ধারণাটিকেও চ্যালেঞ্জ করেছে।

নিউজিল্যান্ডের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডেবি হে বলছেন, আমরা এতদিন মাইগ্রেন নিয়ে যা ভাবতাম তা অনেকাংশেই ভুল। এই খাবারগুলো আসলে মাইগ্রেনের কারণ নয়, এগুলো মাইগ্রেন শুরু হয়ে যাওয়ার ‘লক্ষণ’।

বিষয়টা কেমন? ধরুন, মাইগ্রেন অ্যাটাক আপনার মস্তিষ্কে অবচেতনভাবে শুরু হয়ে গেছে। এর প্রভাবেই আপনার শরীর তখন মিষ্টি বা চর্বিজাতীয় খাবার (যেমন চকলেট বা পনির) চাইছে। আপনি সেই খাবার খাওয়ার পর যখন ব্যথাটা পুরোদমে শুরু হয়, তখন আপনি দোষ চাপান চকলেটের ওপর। আসলে কিন্তু চকলেট খাওয়ার জন্য ব্যথা হয়নি, বরং ব্যথা হবে বলেই শরীর চকলেট চেয়েছিল।

একইভাবে, গন্ধ বা আলোর ব্যাপারটিও কাজ করে। মাইগ্রেন অ্যাটাকের একদম প্রাথমিক ধাপে বা ‘প্রি-মনিটরি ফেজ’-এ মস্তিষ্ক অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। তাই স্বাভাবিক পারফিউমের গন্ধ বা সাধারণ আলোও তখন অসহ্য লাগে।

জিনগত প্রভাব

যমজদের ওপর গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, মাইগ্রেনের সঙ্গে জিনের গভীর সম্পর্ক আছে। প্রায় ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রে এই রোগটি আমরা বংশসূত্রে পাই। গবেষক ডেল নাইহোল্ট ১ লাখ মাইগ্রেন রোগীর ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখেছেন, তাদের জিনে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট মিল আছে যা সুস্থ মানুষের নেই। তিনি এমন ১২৩টি জিনের ত্রুটি বা ‘রিস্ক মার্কার’ খুঁজে পেয়েছেন। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, মাইগ্রেনের সঙ্গে যুক্ত এই জিনগুলোর সঙ্গে আবার বিষণ্নতা ও ডায়াবেটিসেরও মিল পাওয়া গেছে।

শুধু রক্তনালী নয়, মস্তিষ্কও দায়ী

মাইগ্রেনের ব্যথায় মাথা যেহেতু দপদপ করে, তাই অনেকদিন ধরে ধারণা করা হতো—মস্তিষ্কের রক্তনালী বা রগ ফুলে গিয়ে রক্তপ্রবাহ বেড়ে যাওয়ার কারণেই এই ব্যথা হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, রক্তপ্রবাহের সঙ্গে মাইগ্রেন হওয়ার নিশ্চিত কোনো সম্পর্ক নেই। মাইগ্রেনের প্রভাবে রক্তনালী ফুলে যাওয়াটা হয়তো একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, কিন্তু মূল কারণ নয়।

বিজ্ঞানীদের এখনকার থিওরি হলো—মাইগ্রেন অ্যাটাককে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘কর্টিক্যাল স্প্রেডিং ডিপ্রেশন’।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো এক রোগীর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের সময় এই তরঙ্গটি সরাসরি প্রত্যক্ষ করেন। দেখা যায়, একটি বৈদ্যুতিক তরঙ্গ মস্তিষ্কের ভিজুয়াল কর্টেক্স থেকে শুরু হয়ে ৮০ মিনিট ধরে পুরো মস্তিষ্কে ধীরগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এই তরঙ্গটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকে সাময়িক বন্ধ করে দেয় এবং ব্যথার স্নায়ুগুলোকে জাগিয়ে তোলে। এ কারণেই রোগীরা ব্যথার আগে চোখে আলোর ঝলকানি বা অনেকে ঝাপসা দেখতে শুরু করেন, যাকে ‘অরা’ বলা হয়।

এছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে, মাইগ্রেন অ্যাটাকের পুরো একদিন আগে মস্তিষ্কের গভীরে থাকা ‘হাইপোথ্যালামাস’ অদ্ভুতভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই অংশটি আমাদের ঘুম ও টেনশন নিয়ন্ত্রণ করে। তাই ঘুমের অনিয়ম বা মানসিক চাপে মাইগ্রেন কেন বাড়ে, তার উত্তরও এখানেই লুকিয়ে আছে।

তবে আমাদের মস্তিষ্কের নিজের কোনো ব্যথার অনুভূতি নেই। ব্যথাটা হয় ‘মেনিনজেস’ নামক মস্তিষ্কের ওপরের পর্দায় এবং মুখের স্নায়ুতে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মেনিনজেসে থাকা ইমিউন কোষগুলো যখন অতি-উৎসাহী হয়ে ওঠে, তখনই মাইগ্রেন হয়। এ কারণেই যাদের অ্যালার্জি আছে, তাদের মাইগ্রেন বেশি হয়ে থাকে। আবার এই মেনিনজেস পর্দাটি ঠান্ডা বা গরম অনুভব করতে পারে বলেই কপালে বরফ বা গরম ভাপ দিলে অনেকে আরাম পান।

কী বলছেন চিকিৎসকেরা

মাইগ্রেন কেন হয়, তার কোনো একক উত্তর নেই। একেকজনের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের একেক ধরণের রাসায়নিক পরিবর্তন বা ‘ককটেল’ কাজ করে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় ‘সিজিআরপি’ নামে এক ধরণের প্রোটিন বা মলিকিউল শনাক্ত করা হয়েছে, যা মাইগ্রেনের চিকিৎসায় গেম চেঞ্জার হিসেবে দেখছেন চিকিৎসকরা।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাইগ্রেন রোগীদের মস্তিষ্কে এই প্রোটিনের মাত্রা অনেক বেশি থাকে। এটি ব্যথার ভলিউম বাড়ানোর সুইচের মতো কাজ করে। সিজিআরপি-কে থামানোর জন্য বাজারে নতুন প্রজন্মের ওষুধ এসেছে।

সবচেয়ে আশার কথা শুনিয়েছে ২০২৫ সালের অক্টোবরের একটি সমীক্ষা। সেখানে দেখা গেছে, ৫৭০ জন রোগী এক বছর ধরে এই নতুন ঔষধ ব্যবহারের পর ৭০ শতাংশেরই মাইগ্রেন অ্যাটাক চারভাগের তিনভাগ কমে গেছে। আর প্রায় ২৩ শতাংশ রোগী মাইগ্রেন থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

দীর্ঘদিনের অবহেলা আর ভুল ধারণার বেড়াজাল ভেঙে আধুনিক বিজ্ঞান এখন মাইগ্রেনকে আর সাধারণ মাথা ব্যথার সমস্যা হিসেবে দেখছে না। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে মাইগ্রেন আর আমাদের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে থাকবে না, বরং সহজেই নিরাময়যোগ্য একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে উঠবে।

সম্পর্কিত