জাবি ছাত্র জুবায়ের হত্যা: ১৪ বছর পেরোলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে ছাত্রলীগের দণ্ডপ্রাপ্তরা

ছাত্রলীগের হামলায় নিহত জাবি শিক্ষার্থী জুবায়ের। সংগৃহীত ছবি

২০১২ সালের ৮ জানুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের আহমেদের ওপর হামলা চালায় তৎকালীন ক্ষতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। হামলার পরদিন রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী। জুবায়ের মারা যাওয়ার ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে। জুবায়েরের সতীর্থ ও পরিবারের মধ্যেও রয়েছে বিচার কার্যকর না হওয়ার ক্ষোভ।

আসামিরা কোথায় আছেন সে ব্যাপারেও নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না কিছু। তবে জুবায়েরের পরিবারের দাবি, সব আসামিই পালিয়ে বিদেশে চলে গেছেন। ২০১৭ সালে আসামিদের একসঙ্গে বিদেশে অবস্থানের ছবিও দেখা গেছে বলে জানিয়েছে পরিবারের পক্ষ থেকে।

জুবায়ের হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন রেজিস্ট্রার হামিদুর রহমান বাদী হয়ে সাভারের আশুলিয়া থানায় মামলা করেন। ওই বছরই ৮ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭তম ব্যাচের বিভিন্ন বিভাগের ১৩ জন ছাত্রের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন আশুলিয়া থানার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা মীর শাহীন শাহ পারভেজ।

অভিযুক্ত ১৩ জন হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ছাত্র শফিউল আলম সেতু ও অভিনন্দন কুণ্ডু; প্রাণীবিজ্ঞানের আশিকুল ইসলাম আশিক, খান মোহাম্মদ রিয়াজ ও জাহিদ হাসান; দর্শন বিভাগের কামরুজ্জামান সোহাগ, ইশতিয়াক মেহবুব অরূপ ও রাশেদুল ইসলাম রাজু; সরকার ও রাজনীতি বিভাগের মাহবুব আকরাম, ইতিহাস বিভাগের মাহমুদুল হাসান ও মাজহারুল ইসলাম; অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের নাজমুস সাকিব তপু এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের নাজমুল হাসান প্লাবন।

সবশেষ ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী ৫ জন—রাশিদুল ইসলাম রাজু, আশিক, সোহান, জাহিদ ও আকরামকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দিয়ে আদালত রায় ঘোষণা করেন। ইশতিয়াক মেহবুব ও নাজমুস সাকিবকে যাবজ্জীবন ও ছয়জনকে খালাস দেওয়া হয়।

ওই সময় উপাচার্য ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির। হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করা সেই উপাচার্যকে ওই বছরই ২৫ জুলাই সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবেও নিয়োগ দেয় তৎকালীন সরকার।

পরিবার ও সতীর্থদের ক্ষোভ

জুবায়েরের বড় ভাই আব্দুল্লাহ আল মামুন সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটিতে আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। ছোট ভাই হত্যার কাগজে-কলমে বিচারে হতাশা প্রকাশ করেছেন তিনি। জানিয়েছে সাজা কার্যকরের দাবি।

মামুন স্ট্রিমকে বলেন, ‘সাজা পাওয়া আসামির ৭ জনের মধ্যে কাউকেই ধরা যায়নি। সবাই পলাতক আছে; বিদেশে আছে। পুলিশ চাইলেই তাদেরকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে বের করে আনতে পারে। অনেকের কাছে শুনেছি তারা মালয়শিয়া ও ডেনমার্কে অবস্থান করছে। তাদের ছবিও ভাইরাল হয়েছে, মুক্তভাবে বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’

মামুন আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা যদি চায় তাদের বের করে এনে সাজা কার্যকর করা সম্ভব। আমরা চাই রায় বাস্তবায়ন হোক, সাজা কার্যকর হোক। জুবায়েরের হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কাছে আমাদের পরিবারের অনুরোধ থাকবে বিষয়টি দেখার জন্য।’

জুবায়ের হত্যাকাণ্ডের পর বিচার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়। সেই আন্দোলনের একজন সংগঠক ছিলেন ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের তৎকালীন সহ-সাধারণ সম্পাদক তন্ময় ধর। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘বাংলাদেশের ক্যাম্পাসগুলোতে যত ধরনের সহিংসতা কিংবা এরকম হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এটাই ছিল একমাত্র ঘটনা যার রায় আমরা পেয়েছিলাম। তবে রায় কার্যকর হলেই কেবল আমরা বিচারপ্রার্থীরা খুশি হতাম।’

ছাত্র রাজনীতি কেবল ছাত্রদের জন্যই হওয়া উচিত, শিক্ষকদের দ্বারা ব্যবহার হওয়া উচিত না বলে মনে করেন তিনি। পাশাপাশি সাজা কার্যকর হলে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়ে থাকতো বলেও জানান তন্ময় ধর।

এই অবস্থায় কোন পরিস্থিতিতে আসামিদের সাজা কার্যকর করা সম্ভব কি না জিজ্ঞেস করলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দীন খান স্ট্রিমকে বলেন, ‘আসামিরা যেহেতু পলাতক অবস্থায় বিদেশে আছে, সেহেতু ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাদের এনে সাজা কার্যকর করা সম্ভব। এ ছাড়া এটাও খেয়াল রাখতে হবে, যেসব রাষ্ট্রে সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড নেই, সে রকম কোন দেশে অবস্থান করলে তাঁদের হয়তো ওই রাষ্ট্র ফেরত দেবে না।’

এছাড়া সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সাথে প্রত্যার্পন চুক্তি থাকলে কিংবা কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েও রাষ্ট্র চাইলে এই সাজা বাস্তবায়ন করতে পারে বলে মনে করেন এই আইনজীবী।

সম্পর্কিত