leadT1ad

২৩ বছর পর বিধ্বস্ত মার্কিন যুদ্ধবিমান, ইরানের শক্তির উৎস কোথায়

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম গ্রাফিক

আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন হয়তো ফুরিয়ে আসছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক বিমান ভূপাতিত করেছে ইরান। পাশাপাশি দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারেও আঘাত হেনেছে তারা। ট্রাম্প বারবার দাবি করছিলেন ইরানের আকাশ সম্পূর্ণ আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে। শুক্রবার সেই অহংকারের আকাশ ট্রাম্পের মাথার ওপরই ভেঙে পড়েছে।

Ad 300x250

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শুক্রবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল এবং হরমুজ প্রণালির কাছে একটি এ-১০ ওয়ার্থগ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসের কাছে এই খবরের সত্যতা স্বীকার করেছেন।

ভূপাতিত এফ-১৫ বিমানের ক্রুদের খুঁজতে দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের হামলায় সেই হেলিকপ্টার দুটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সেগুলো কোনোমতে ইরানের আকাশসীমা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

যুদ্ধ এখন দ্বিতীয় মাসে গড়িয়েছে। তারপরও আমেরিকার বাহিনী ইরানের এই বিষম চাল বা গুগলি সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ। বিধ্বস্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ইরান কীভাবে এত অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে, সেই প্রশ্ন এখন চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে। জবাব লুকিয়ে আছে ইরানের অসম যুদ্ধকৌশল বা অ্যাসাইমেট্রিক ওয়ারফেয়ারের মধ্যে। অপ্রচলিত পদ্ধতির নিপুণ ব্যবহারের মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দিয়েছে।

মজিদ সিস্টেম এবং ইনফ্রারেডের মরণফাঁদ

যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক বিমানগুলো কীভাবে ধ্বংস হলো, তার নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ইরান দেয়নি। তবে বিশ্লেষকরা মজিদ ইনফ্রারেড আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা বলছেন। পাশাপাশি কাঁধে রেখে ছোড়া যায় এমন ক্ষেপণাস্ত্রের দিকেও ইঙ্গিত করছেন। এই অস্ত্রগুলো রাডারে সহজে ধরা পড়ে না। ভূপাতিত হওয়া মার্কিন বিমান দুটি সম্ভবত অনেক নিচু দিয়ে উড়ছিল। ফলে সেগুলো খুব সহজেই নিশানায় পরিণত হয়।

গত ১৯ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে অত্যাধুনিক স্টিলথ ফাইটার এফ-৩৫ বিমানে আঘাত হেনেছিল ইরান। ধারণা করা হচ্ছে, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য এই মজিদ সিস্টেম দিয়েই সেই হামলা চালানো হয়েছিল।

২০২১ সালে ইরান প্রথমবারের মতো মজিদ সিস্টেম ব্যবহার শুরু করে। নিচু দিয়ে উড়ে আসা বিমান ধ্বংস করতে এই ব্যবস্থা বেশ কার্যকর। এর বড় বৈশিষ্ট্য হলো রাডারের ওপর নির্ভরশীল না হওয়া। প্যাসিভ ইনফ্রারেড বা তাপমাত্রার মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে প্রক্সিমিটি ফিউজ প্রযুক্তি।

রাডার সংকেত নির্গত না হওয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার আগে কোনো বিমানের পক্ষে এই সিস্টেম শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। এর পাল্লা ৮ কিলোমিটার দূরত্ব ও ৬ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। মার্কিন বিমানগুলো খুব সম্ভবত এই সীমানার মধ্যেই উড়ছিল।

মজিদ সিস্টেমের শনাক্ত করার ক্ষমতাই আসল চাবিকাঠি। এর ইনফ্রারেড সেন্সর ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে। এর সঙ্গে বাইরের একটি ‘কাশেফ-৯৯’ ফেজড-অ্যারে সিস্টেম যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে নজরদারির ক্ষমতা ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়। একই সঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর নজর রাখাও সম্ভব হয়। এই মজিদ সিস্টেম একসঙ্গে আটটি ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে সক্ষম।

ক্ষেপণাস্ত্রগুলো রাডারের বদলে প্যাসিভ ইনফ্রারেড গাইডেন্স ব্যবহার করে। ফলে বিমানের সতর্কীকরণ রিসিভারগুলো সহজে এদের উপস্থিতি টের পায় না। এফ-৩৫-এর মতো অত্যাধুনিক বিমান কীভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলো, তার ব্যাখ্যা এখানেই লুকিয়ে আছে। এফ-৩৫ বিমান ওড়ার সময় প্রচুর পরিমাণে তাপ উৎপন্ন করে। এই বিশাল তাপই বিমানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বা ‘অ্যাকিলিস হিল’। এই তাপ অনুসরণ করেই ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।

ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস-এর ইরান কর্মসূচির পরিচালক বেহনাম বেন তালেবলুর মতে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিকল হওয়া মানেই ধ্বংস হওয়া নয়। ইরান এখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে দেখে যুক্তরাষ্ট্রের মোটেও অবাক হওয়া উচিত নয়।

মাটির নিচের শহর ও ভ্রাম্যমাণ লঞ্চার

গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান তাদের স্থায়ী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো থেকে সরে আসে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক শায়েল বেন-এফ্রাইমের মতে, ইরানের বেশিরভাগ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা। ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ বা ক্ষেপণাস্ত্রের শহর এবং দীর্ঘ সুড়ঙ্গের ভেতর এগুলো বসানো হয়েছে। পাশাপাশি দুর্গম উপকূলীয় এলাকাগুলোকেও তারা ব্যবহার করছে।

সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আমেরিকা ও ইসরায়েলের প্রতিনিয়ত হামলা সত্ত্বেও ইরানের অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার এখনো সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে। এর আগে ইসরায়েল দাবি করেছিল ইরানের হাতে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার অবশিষ্ট আছে। গোপন গুহা এবং সুড়ঙ্গের ভেতর লুকিয়ে রাখা হাজার হাজার প্রজেক্টাইল বা নিক্ষেপযোগ্য অস্ত্র সম্পর্কে মার্কিনি গোয়েন্দাদের অজ্ঞতা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছিল।

ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ভ্রাম্যমাণ মিসাইল লঞ্চারের পেছনেও ইরান প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। এই লঞ্চারগুলো খুব দ্রুত নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। ফলে এদের শনাক্ত করা এবং ধ্বংস করা কঠিন। এগুলো মূলত ‘শুট-অ্যান্ড-স্কুট’ কৌশল ব্যবহার করে। অর্থাৎ গুলি করার পরপরই লঞ্চারগুলো অন্য জায়গায় সরে যায়। এই পলায়ন কৌশল মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোকে বোকা বানাচ্ছে।

রাশিয়া ও চীনের প্রযুক্তির ছায়া

চলতি বছরের শুরুর দিকে রাশিয়ার কিছু সরকারি নথি ফাঁস হয়। সেই নথি থেকে জানা যায় ইরান ৫০০টি ‘ভারবা’ পোর্টেবল শর্ট-রেঞ্জ সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল লঞ্চার কেনার চুক্তি করেছে। এগুলো মানুষের কাঁধে বহনযোগ্য বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত। আশপাশের সাধারণ তাপমাত্রার মধ্যেও এগুলো নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে।

শায়েল বেন-এফ্রাইমের ধারণা, ইরান হয়তো চীনের তৈরি আধুনিক দূরপাল্লার মিসাইল ব্যবস্থা ‘এইচকিউ-৯বি’ ব্যবহার করছে। এই অস্ত্রে রাডার এবং ইনফ্রারেড গাইডেন্স উভয় প্রযুক্তিই রয়েছে। ফলে এফ-৩৫ এর মতো স্টিলথ বিমান মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে এই অস্ত্র পারদর্শী। ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রেও এটি অনেক বেশি শক্তিশালী।

সবগুলো কৌশলের এক নিখুঁত সংমিশ্রণ ইরানের আকাশসীমাকে পরিণত করেছে এক মৃত্যুফাঁদে। অন্তত মধ্য ইরানের আকাশ এখন শত্রু বিমানের জন্য চরম আতঙ্কের জায়গা হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক ভূপাতিতের ঘটনায় বোঝা যায়, ইরানের আকাশপথে একচ্ছত্র আধিপত্য অর্জনের নিশ্চয়তা এখন আর কোনোভাবেই দেওয়া সম্ভব নয়।

২৩ বছরের রেকর্ডের পতন এবং ট্রাম্পের মিথ্যাচার

২৩ বছরেরও বেশি সময় পর প্রতিপক্ষের হামলায় কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলো। এর আগে ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের সময় আমেরিকার যুদ্ধবিমান শেষবার ভূপাতিত হয়েছিল। ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা বারবার এক কথা বলে আসছিলেন। তাঁরা দাবি করছিলেন তেহরানের কোনো বিমানবিধ্বংসী ব্যবস্থা অবশিষ্ট নেই। ইরানের আকাশের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখন তাঁদের হাতে।

গত ২৪ মার্চ ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘ইরানের ওপর দিয়ে আমাদের বিমান আক্ষরিক অর্থেই উড়ে বেড়াচ্ছে। তারা কিছুই করতে পারছে না।‘ ঠিক এক সপ্তাহ পর ট্রাম্প ও পুরো বিশ্বকে ইরান কঠিন বাস্তবতা বুঝিয়ে দিল।

তথ্যসূত্র: সিএনএন, ইন্ডিয়া টুডে ও আল-জাজিরা

Ad 300x250Ad 300x250
leadT1ad

সম্পর্কিত

leadT1ad
leadT1ad