পাবনা-১

বাবার চেয়েও বেশি ভোটে জয়ের আত্মবিশ্বাস নিজামীপুত্র মোমেনের, বাধা সীমানা জটিলতা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
পাবনা

শামসুর রহমান ও ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন। স্ট্রিম কোলাজ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়া বইছে দেশজুড়ে। তবে সীমানা জটিলতা ও আইনি লড়াইয়ের কারণে পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসনের নির্বাচন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই স্থগিতাদেশের ফলে নির্বাচনী উৎসবে ভাটা পড়লেও ভোট নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই তৎপরতা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। দ্রুত লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে পূর্ব ঘোষিত সময়েই ভোট গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

গত ১০ জানুয়ারি নির্বাচন স্থগিত করার প্রতিবাদে গত ১১ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন। ইসির সিনিয়র সচিব ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শাখার উপসচিবকে পাঠানো এই নোটিশে স্থগিতাদেশকে ‘বেআইনি’ উল্লেখ করে অবিলম্বে তা প্রত্যাহার এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া সচল রাখার দাবি জানানো হয়েছে।

তবে ভোট নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলেও বসে নেই প্রার্থীরা। পুরনো কিংবা নতুন দুই ধরনের সীমানা বিবেচনায় নিয়েই নির্বাচনী কৌশল সাজাচ্ছেন তাঁরা।

স্বাধীনতার পর থেকেই পাবনা-১ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন। সাঁথিয়া উপজেলা ও বেড়া উপজেলার পৌরসভা এবং ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে আসনটির এলাকা নির্ধারিত ছিল। আসনটির সাঁথিয়া উপজেলায় জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামীর বাড়ি।

সাঁথিয়ার ভোটার সংখ্যা বেশি হওয়ায় সাঁথিয়াবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল একক আসন করার। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আসন সীমানা নির্ধারনের সময় সাঁথিয়াবাসীর সেই দাবি তুলে ধরে নির্বাচন কমিশনে আবেদন জানান জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার মোমেন। নির্বাচন কমিশন দাবিকে যৌক্তিক বিবেচনায় নিয়ে সাঁথিয়াকে একক আসন ঘোষণা করলে বাঁধে বিপত্তি।

সাঁথিয়াবাসী এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও বেঁকে বসেন পাবনা-১ আসনের বেড়া অংশের ভোটাররা। তাদের পাবনা-২ এর সুজানগরের সঙ্গে যুক্ত করার প্রতিবাদে শুরু হয় রাজপথের আন্দোলন, আইনি লড়াই। কয়েকদফা রিট, পাল্টা রিটে বার বার সীমানা পরিবর্তন হয়। তফসিল ঘোষণার পরেও আইনি নিষ্পত্তি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত গত ১০ জানুয়ারি ভোট স্থগিত করে দেয় নির্বাচন কমিশন।

আসনটিতে ১৯৯১ সালে মতিউর রহমান নিজামী, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, ২০০১ সালে আবার মতিউর রহমান নিজামী এবং ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতা শামসুল হক টুকু বিজয়ী হন। এছাড়াও ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু বিজয়ী হন।

২৪-এর গণ অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটিতে প্রার্থী হয়েছেন নিজামীপুত্র ব্যারিস্টার মোমেন। তাঁর বিপরীতে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছে সাঁথিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ভিপি শামসুর রহমানকে।

জামায়াতের শক্ত ভোট ব্যাংক ও সাংগঠনিক ভিত্তি, প্রার্থীর উচ্চশিক্ষা, স্মার্টনেস আকর্ষণ করছে তরুণ ভোটারদের। নির্বাচনী কর্মকান্ডেও তরুণদের প্রাধান্য ও প্রত্যাশার গুরুত্ব দিচ্ছে দলটি। পাশাপাশি বাবার রাজনৈতিক ইমেজে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থানে থাকলেও, সীমানা নিয়ে রাজনীতি জটিল করে তুলেছে ভোটের হিসাব-নিকাশ।

স্থানীয়রা জানান, অতীত পরিসংখ্যান বিবেচনায় সাঁথিয়ায় জামায়াতের ভোট বেশি। আবার বেড়ায় বিএনপির অবস্থান ভালো। নতুন সীমানা বিন্যাসে সাঁথিয়াকে একক আসন করে বেড়ার অংশ বাদ দেওয়ার ক্ষুব্ধ হয়েছে বেড়ার দলমত নির্বিশেষে সকল ভোটাররা।

বিএনপি নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে এর জন্য ব্যারিস্টার মোমেনকে দায়ী করে আসছেন। পুরনো সীমানা পুনঃবর্হাল হলে বিএনপি এটি নিয়ে রাজনীতি করে সুবিধা নিতে চাইবে সন্দেহ নেই। ভোটাররা তাতে প্রভাবিত হলে সার্বিক চিত্রে প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি জামায়াতকে ৭১-এর স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা তুলে ধরে প্রচারণা চালাচ্ছে বিএনপি। আওয়ামী লীগের ভোট পক্ষে টানারও কৌশলী অবস্থান ও যোগাযোগ করে ফলাফল পক্ষে নিতে আনতে চেষ্টা রয়েছে উভয় প্রার্থীরই।

সাঁথিয়ার বাসিন্দা সাংবাদিক হাবিবুর রহমান স্বপন বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারি পাবনা-১ এ নির্বাচন হবে কি না, যথেষ্ট সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। আর প্রশাসনও এখনো নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে পারেনি। স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রস্তাবককে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার করে মামলায় ফাঁসানোর ঘটনাও ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে কটাক্ষ, অপমানের বাস্তবতা ভোটে ফ্যাক্টর হতে পারে।’

করমজা গ্রামের কৃষক মোতালেব হোসেন বলেন, মতিউর রহমান নিজামী এলাকায় উন্নয়ন করেছিলেন। তার ছেলে হিসেবে ব্যারিস্টার মোমেন যোগ্য উত্তরসূরী। তিনি উচ্চশিক্ষিত ও স্মার্ট। তরুণরাও তাকে পছন্দ করে। কিন্তু সাথিয়াকে আলাদা আসন করতে গিয়ে তিনি বেড়ার মানুষের মনে কষ্ট দিয়েছেন। আগের সীমানায় ভোট হলে বেড়াবাসীকে আস্থায় আনতে হবে।

তবে নির্বাচনী লড়াইয়ে এসব ফ্যাক্টরকে গুরুত্ব দিতে চান না ব্যারিস্টার মোমেন। নিজের জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সাঁথিয়া ও বেড়ার মধ্যে কোন বিভেদ নেই। এলাকাভিত্তিক কোনো সমস্যাও নেই। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী বাস্তবতায় জনগণের যে ইস্যু রয়েছে, যে দাবি রয়েছে তার ভিত্তিতেই মানুষ রায় দেবে। বেড়াতে জামায়াতের ভোট আছে কি নেই, তা ভোট হলেই প্রমাণ হবে।’

জামায়াতের এই নেতা আরও বলেন, ‘বেড়ার প্রতিটি ইউনিয়নে গিয়ে আমি জনমানুষের বিপুল সাড়া পেয়েছি। বেড়ার মানুষ আমার শহীদ পিতাকে বার বার ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। তিনিও এলাকার উন্নয়ন করেছেন। আমি বিশ্বাস করি জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার এই নির্বাচনে মানুষ বাবার চেয়েও বেশি ভোটে আমাকে নির্বাচিত করবে ইনশাআল্লাহ।’

পাবনা-১ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৩০ হাজার ৯৮৮ জন। এর মধ্যে সাঁথিয়ার ৩ লাখ ১৬ হাজার ৫৫৩ জন ও বাকি ১ লাখ ১৪ হাজার ৪৩৫ জন বেড়ার বাসিন্দা।

সম্পর্কিত