‘এক্সেস টু মিনিস্ট্রি’ বৃত্তে জামায়াতের ছায়া মন্ত্রিসভা

ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের পরে সরকারের কাছে ‘এক্সেস টু মিনিস্ট্রি’ বিষয়ে আইনি ভিত্তি চাইবে জামায়াতে ইসলামী। স্ট্রিম গ্রাফিক

ঘোষণার পরও সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ছায়া মন্ত্রিসভা দিতে পারেনি। দেরি করার পেছনে দলটির নেতারা বলছেন, আইনি কাঠামো ছাড়া ছায়া মন্ত্রিসভা কার্যকর হবে না। এজন্য ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের পরে সরকারের কাছে তারা ‘এক্সেস টু মিনিস্ট্রি’ বিষয়ে আইনি ভিত্তি চাইবেন।

ছায়া মন্ত্রিসভার ধারণা যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনিস্টার সংসদীয় ব্যবস্থায় ‘শ্যাডো কেবিনেট’ নামে পরিচিত। এতে বিরোধী দল একটি ছায়া সরকার গঠন করে, যারা ক্ষমতাসীনদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়। সরকার না মানলে তা নিয়ে সংসদে বিতর্ক হয়।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতে সরকার গঠন করে তারেক রহমানের বিএনপি। নির্বাচনে বিএনপি জোটের ২১২ আসনের বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য পেয়েছে ৭৭টি। এর মধ্যে জামায়াত ৬৮ ও এনসিপির আসন ছয়টি।

নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের ঘোষণা দেয় জামায়াত। এরপর বিরোধী দলের নেতারা বিভিন্ন সময়ে সরকারের নীতি পর্যবেক্ষণ, সমালোচনা ও বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক করতে এই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি রাতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লেখেন, ‘আমরা ছায়া মন্ত্রিপরিষদ গঠন করব, ইনশাআল্লাহ।’ তাঁর এই ঘোষণার পরে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল ও ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।

পরদিন ১৫ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে ১১-দলীয় ঐক্যের শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া লেখেন, ‘আমরা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং সার্বিক কার্যক্রমে ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করবে ছায়া মন্ত্রিসভা।’

জামায়াতের নেতারা এখন বলছেন, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার আইনি সুযোগ ছাড়া ছায়া মন্ত্রিসভাকে কার্যকর করা সম্ভব নয়। বিদ্যমান ব্যবস্থায় এ বিষয়ে আইনি কাঠামো নেই। এজন্য জামায়াত আইনি সুযোগ সৃষ্টির পক্ষে কাজ করবে।

গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলের নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেছেন, বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের কোনো আইনি সুযোগ নেই। বিভিন্ন সময় জামায়াত ও এনসিপির নেতারা এই বিষয়ে কথা বললেও আইনি সুযোগ না থাকায় সেটি এগোয়নি।

তিনি বলেন, সংসদে ভালো ভূমিকা পালনের জন্য ছায়া মন্ত্রিসভার ‘এক্সেস টু মিনিস্ট্রি’ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশে এর কোনো আইনি সুযোগ নেই। জামায়াত প্রথম থেকেই মনে করে– ছায়া মন্ত্রিসভার আইনি সুযোগ থাকা উচিৎ, যাতে আমরা মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে পারি এবং সংসদে বিষয়গুলো নিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আলোচনা করতে পারি। কারণ, অন্ধকারে তো আসলে কোনো কিছু করা যায় না।

পরে যোগাযোগ করা হলে জামায়াতের এই নির্বাহী পরিষদের সদস্য স্ট্রিমকে জানান, ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন নিয়ে তাঁর দল কাজ করছে। অন্যদিকে দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট শিশির মনির জানান, ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন মাঝপথে রয়েছে। এ বিষয়ে শিগগির আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।

জামায়াতের এই দুই নেতাই কার্যকর ছায়া সংসদের জন্য যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনিস্টার সংসদীয় ব্যবস্থার আদলে আইনি সুযোগ সৃষ্টির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

এক্সেস টু মিনিস্ট্রি জরুরি কেন

সংসদে কার্যকর ও প্রতিযোগিতামূলক ভূমিকা পালনের জন্য ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের আইনি সুযোগ থাকা উচিত বলে মনে করে জামায়াত। পূর্ণ সুফল পাওয়ার জন্য ‘এক্সেস টু মিনিস্ট্রি’ প্রয়োজন বলে জানান ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, এটি না থাকলে তো আমরা ইচ্ছা করলেও কিছু করতে পারব না। ছায়া মন্ত্রিসভা নিয়ে আমরা কাজ করছি। কিন্তু আমাদের আইনি সুযোগ দরকার এবং এটি হতেই হবে। যেমনটি ব্রিটেনে আছে, আমাদের এখানে থাকলে আমরা সঠিকভাবে কাজ করতে পারব। আইনি সুযোগ পেলে আমরা মন্ত্রণালয় পর্যায়ের প্রয়োজনীয় তথ্য পাব। আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলে তো স্বাভাবিকভাবে মন্ত্রণালয় আমাদের কোনো তথ্য দেবে না।

আইনি সুযোগ না থাকার অসুবিধা উদাহরণ টেনে সাইফুল আলম বলেন, সামনে বাজেট। এখানে সঠিক ভূমিকা পালনে আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। আর সেজন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে এক্সেস থাকতে হবে। সেটি থাকলে আমরা বুঝতে পারব, কী ধরনের বাজেট আমরা করতে চাই। এক্সেস না থাকলে তো পারব না। করা যাবে না তা নয়, ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে।

তথ্য পাওয়ার বিদ্যমান আইনি অধিকার ছায়া মন্ত্রিসভার কাজের জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন সাইফুল আলম। বলেন, এক্সেস টু দ্য ইনফরমেশন আমাদের তথ্য আইনে আছে। সেই তথ্য আইনের বিষয়গুলো মন্ত্রণালয় পর্যায়ে কতটুকু প্রযোজ্য, দ্যাট’স আ ডিফরেন্ট কোয়েশ্চেন। আর আমি নিজে তো পিএ হিসেবে গিয়ে ওখানে এনগেজড হব না যে, ভাই আমার ওই মিনিস্টারের দায়িত্ব আছে, আমাকে তথ্য দেন। এটি বাস্তবসম্মত নয়। দেয়ার শুড বি এ ব্যাক অফিস স্টাফ, অফিসার্স অর দ্য এক্সপার্ট পিপলস।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সংসদকে কার্যকর করতে হলে বিরোধী দলকে ফ্যাসিলিটেড করার দায়িত্ব সরকারের। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে ধারণাটি নতুন, জামায়াতই গঠন করছে

সংবাদ সম্মেলনে সাইফুল আলমের পাশে ছিলেন অ্যাডভোকেট শিশির মনির। পরে যোগাযোগ করে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনে আইনি জটিলতা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি স্ট্রিমকে বলেন, বিভিন্ন দেশে বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের আইনি কাঠামো রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ধারণাটি নতুন। জামায়াত চায় বাংলাদেশেও আইনি কাঠামো তৈরি হোক।

শিশির মনির বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় আইনেই বলা আছে– বিরোধী দল ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করবে এবং সরকার তাদের কী কী সুযোগ-সুবিধা দেবে, তাও রয়েছে। নিউজিল্যান্ডে আছে। এটা তো বেসিক্যালি ইংল্যান্ড থেকে শুরু হয়েছে, ওয়েস্টমিনিস্টার টাইপ। সেখানে শুরুতে ছিল না, এখন আইনি কাঠামো আছে।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে তো একেবারেই নতুন ধারণা এবং আমরা গঠন করছি। যদিও ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে এই ধারণা কার্যকর না থাকলেও দুই-তিনটা প্রদেশে রয়েছে।

শিশির মনিরের মতে, মিনিস্ট্রিতে এক্সেস না থাকলে ছায়া মন্ত্রীরা সরকারের অনেক বিষয়ে অন্ধকারে থাকবেন এবং সংসদে গিয়ে তাদের সেসব প্রথমবার শুনতে হবে। আইনি কাঠামো থাকা দেশে মন্ত্রীরা যেসব কর্মকাণ্ড করেন, তার অনুলিপি ছায়া মন্ত্রীকে বাধ্যতামূলকভাবে দেওয়া হয়। এজন্য সব বিষয়ে তারা আগে থেকে অবগত থাকেন এবং বিকল্প পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা দিতে পারেন।

তিনি বলেন, সরকার একটা পলিসি করছে, তার কপি আগেই দিতে বাধ্য। একটি আইন করছে, তার কপি আগেই দিতে বাধ্য। কিন্তু আমাদের দেশে যেহেতু এ রকম ধারণাই নাই, বাধ্যবাধকতাও নাই। এজন্যই আমরা আইনি কাঠামোর কথা বলছি।

এক প্রশ্নের উত্তরে শিশির মনির বলেন, আমরা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের মাঝপথে রয়েছি। আশা করছি, আপনাদের খুব দ্রুত এই ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে পারব। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মের বিপরীতে এসব বিষয়ে জানাশোনা যাদের রয়েছে, তাদের সমন্বয়ে আমাদের ছায়া মন্ত্রিসভা হবে। নতুন ধারণা বলে কাজটি করতে একটু সময় বেশি লাগছে। এই ছায়া মন্ত্রিসভাকে সহায়তা দিতে গবেষক, তাদের সহকারী এবং বিশেষজ্ঞদের আমরা অন্তর্ভুক্ত করব।

উদাহরণ টেনে শিশির মনির বলেন, এখন বড় সংকট জ্বালানি তেলের। বিশ্বে আগেও বহু জায়গায় এই সংকট হয়েছে। আমরা খনিজ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে যাঁকে ছায়া মন্ত্রী করব, তিনি সংকট মোকাবিলায় কী কী বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সেসব উপস্থাপন করবেন।

তিনি আরও বলেন, আমরা প্রথমে সরকারের সঙ্গে একটি গুড টার্মস ডেভেলপ করার চেষ্টা করব। দ্বিতীয়, তথ্য অধিকার আইনের অধীনে আমরা আমাদের অধিকার বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করব। আর তৃতীয়, চেষ্টা থাকবে আমরা যেন ছায়া মন্ত্রিসভা ধারণাটিকে পরিচিত করাতে পারি এবং সেজন্য নীতি সহায়তা লাগলে তা দিতে পারি। তবে এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানান শিশির মনির।

সম্পর্কিত