রাজশাহী-৩

ভোটের হিসাব পাল্টে দিতে পারেন চেয়ারম্যান-মেম্বাররা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাজশাহী

প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৫: ৫০
নির্বাচনী গণসংযোগ চালাচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর আবুল কালাম আজাদ এবং বিএনপির শফিকুল হক মিলন। স্ট্রিম ছবি

আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সমীকরণ বেশ চমকপ্রদ হয়ে উঠেছে। ব্যালটে দীর্ঘদিনের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীক না থাকায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বিএনপি। তবে এই সহজ হিসেবে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক ও বর্তমান চেয়ারম্যান এবং মেম্বাররা। তাদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক এবং আওয়ামী লীগ ঘরানার ভোটারদের মেরুকরণ ভোটের ফলাফল পাল্টে দিতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় বিশ্লেষকরা।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের চারপাশ এবং নওগাঁর মান্দা সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২৩ হাজার ১৯৯ জন। নির্বাচনে ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মূল লড়াই হচ্ছে বিএনপির শফিকুল হক মিলন এবং জামায়াতে ইসলামীর আবুল কালাম আজাদের মধ্যে। এছাড়া প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে আলোচনায় এসেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও মোহনপুর উপজেলা কৃষকলীগের নেত্রী হাবিবা বেগম।

পবা ও মোহনপুরের ১৪টি ইউনিয়নের প্রায় সব চেয়ারম্যানই আওয়ামী লীগ ঘরানার এবং বর্তমানে তাদের অধিকাংশই পলাতক। তবে ভোটের মাঠে তাদের একটি সুসংগঠিত ‘ভোট ব্যাংক’ রয়েছে। জামায়াতের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ টানা ২৮ বছর পবার হড়গ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন। পর পর পাঁচবার তিনি এ পদে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ চেয়ারম্যান সমিতির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতিও ছিলেন। দীর্ঘ সময় জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের কারণে দুই উপজেলার সব চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সখ্য রয়েছে। এমনকি আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিনের সঙ্গেও তাঁর সুসম্পর্ক ছিল।

তবে আওয়ামী লীগের পলাতক নেতারা এখনও ভোটের কলকাঠি নাড়তে পারেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় একজন সাংবাদিক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি এলাকায় চেয়ারম্যানদের নিজস্ব কিছু ভোট রয়েছে। এই ভোটগুলো জামায়াতের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদের পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কারণ, তিনি জামায়াত করলেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই চলতেন। এ জন্য আওয়ামী লীগের আমলেও তিনি নির্বিঘ্নে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন। বিশেষ করে পবার চেয়ারম্যানদের মধ্যে তখন খুব একতা ছিল। তারা দল-মত বিবেচনা করতেন না।’

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের পলাতক চেয়ারম্যানরা ভাবতে পারেন তাদের দীর্ঘদিনের সহকর্মী আবুল কালাম আজাদ সংসদ সদস্য হলে তারা এলাকায় ফিরতে পারবেন। সেই চিন্তা থেকে ভোটের মাঠে তারা জামায়াতের পক্ষ নিতে পারেন। তারা মেম্বারদেরও দাঁড়িপাল্লার পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দিতে পারেন। এ রকম হলে ভোটের হিসাব পাল্টে যেতে পারে।

পবার একমাত্র সশরীরে থাকা পারিলা ইউপি চেয়ারম্যান সাঈদ আলী মুর্শেদ বলেন, ‘সব চেয়ারম্যান যখন ছিল, তখন আমরা দল দেখিনি। মিলন চাচাও আমার, কালাম চাচাও আমার। যার ইচ্ছা তাকে ভোট দেবে।’

জামায়াত মনোনীত প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘পুরাতন চেয়ারম্যান যারা আছে, তারা আমার জন্য কাজ করছে। তারা চায় আমি নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ নিয়ে কাজ করি। সুযোগ পেলে তারা ইনশাআল্লাহ আমার জন্য ভূমিকা রাখবে।’

অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল হক মিলন জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, ‘ধানের শীষের পক্ষে জোয়ার তৈরি হয়েছে। পবা-মোহনপুরের সবখানেই রাস্তাঘাটের বেহাল দশা। মানুষ পরিবর্তন চায়। জামায়াত প্রার্থী দীর্ঘদিন চেয়ারম্যান থাকলেও নিজের এলাকার উন্নয়ন করতে পারেননি, তাকে দিয়ে দুই উপজেলার উন্নয়ন সম্ভব নয়।’

স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবা বেগম ৪৩ হাজার ভোট পেয়ে উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। সাবেক আওয়ামী এমপি আয়েন উদ্দিনের সঙ্গে বিরোধ থাকলেও আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের একটি অংশ তাঁর দিকে ঝুঁকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, পবা-মোহনপুরের চা-স্টলগুলোতে ততই বাড়ছে উত্তাপ। শেষ পর্যন্ত ধানের শীষের ঢেউয়ে সব হিসাব ভেসে যাবে, নাকি ‘চেয়ারম্যান সিন্ডিকেট’ দাঁড়িপাল্লাকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেবে—তা দেখার অপেক্ষায় এখন রাজশাহীবাসী।

সম্পর্কিত