ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ

ক্রিকেট, ফুটবল, রিলে রেস কিংবা যে কোনো দলভিত্তিক খেলায় জয়ের পূর্বশর্ত হলো কার্যকর টিমওয়ার্ক—এ কথা আমরা সবাই বুঝি এবং স্বীকার করি। আমরা এটাও জানি, সঠিক জায়গায় সঠিক খেলোয়াড়কে না রাখলে দল তার সেরা পারফরম্যান্স উপহার দিতে পারে না। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রেও যে একইভাবে দক্ষ, সমন্বিত ও লক্ষ্যনিষ্ঠ টিম গড়ে তোলা অপরিহার্য—এ উপলব্ধি আমাদের মধ্যে ততটা দৃঢ় নয়। জানলেও আমরা অনেক সময় তা গুরুত্ব দিই না।
বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে আমরা প্রায়ই আলোচনা করি—দুর্বল বাস্তবায়ন, সেবায় বিলম্ব, সিদ্ধান্তে অস্থিরতা, জবাবদিহির ঘাটতি ইত্যাদি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করি। কিন্তু সমস্যার একটি গভীর ও মৌলিক উৎস নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম কথা হয়, আর তা হলো, রাজনৈতিক বিবেচনা বা তদবিরভিত্তিক নিয়োগের ফলে কার্যকর টিম গড়ে না ওঠা। এই ধারা এখনও বহাল রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে বহু প্রতিষ্ঠান কাঙ্ক্ষিত দক্ষতায় কাজ করতে পারবে না—এ আশঙ্কা দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে।
যেকোনো দপ্তরের কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে একটি দক্ষ ও সমন্বিত টিম অপরিহার্য। দপ্তরপ্রধান সেই দলের অধিনায়ক; বিভাগ বা উইং প্রধানরা দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব দেন; আর অন্যান্য কর্মকর্তারা দলীয় সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি। কাজের ধরন অনুযায়ী যথাযথ টিম কম্পোজিশন, পারস্পরিক আস্থা, পেশাদার সম্পর্ক এবং লক্ষ্যভিত্তিক সমন্বয়—এসবই একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার ভিত্তি।
কিন্তু যখন ঊর্ধ্বতন পদে নিয়োগের প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠে রাজনৈতিক আনুগত্য বা তদবির, তখন পেশাদারিত্ব পেছনে পড়ে যায়। টিমওয়ার্কের জায়গায় শুরু হয় অবস্থান রক্ষার প্রতিযোগিতা। সহযোগিতার জায়গায় জন্ম নেয় সন্দেহ; সমন্বয়ের জায়গায় দেখা দেয় রেষারেষি; আর দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য হারিয়ে যায় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তারের হিসাব-নিকাশে। আর তদবিরের মাধ্যমে পদায়ন হলে তদবিরকারীদের স্বার্থ রক্ষার এক ধরনের অঘোষিত বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়। ফলে সমন্বিত ও কার্যকর টিমওয়ার্ক গড়ে ওঠা তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে সহকর্মীরাই পরস্পরের চরম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ান।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উপাচার্য, উপ-উপাচার্য কিংবা কোষাধ্যক্ষ নিয়োগকে ঘিরে বিতর্ক যেন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সরকারি দলের অনুসারী হয়েও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী বা পন্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং পৃথক তদবিরের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত। নিয়োগের পর তাঁরা আবার নিজস্ব অনুসারী গোষ্ঠী গড়ে তুলে আলাদা বলয় সৃষ্টি করেন। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি সমন্বিত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ার পরিবর্তে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রত্যেকে নিজ নিজ পরিসরে প্রভাব বিস্তারে মনোনিবেশ করেন, এবং বিভাজন ক্রমেই গভীরতর হয়। পরিণতিতে, বহু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে একাডেমিক অগ্রাধিকার নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষাই মুখ্য বিবেচ্য হয়ে ওঠে। ফলে একটি সুসংগঠিত, সমন্বিত ও কার্যকর প্রশাসনিক টিম গড়ে ওঠে না; বরং প্রতিষ্ঠান পরিচালনা দুর্বল ও দ্বন্দ্বপ্রবণ হয়ে পড়ে।
এর প্রভাব সরাসরি পড়ে গবেষণা কার্যক্রম, একাডেমিক ক্যালেন্ডার, শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার মানের ওপর। নীতিনির্ধারণে স্থিরতা থাকে না; গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না; শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক অচলাবস্থার ভুক্তভোগী হয়। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হওয়ার কথা, সেখানে শক্তিশালী দলগত নেতৃত্বের অভাবে প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়—বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা কিংবা সেবা-প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কোনো সংস্থার মহাপরিচালক বা চেয়ারম্যান যদি প্রধানত রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তবে তাঁর অধীনে কর্মরত পেশাদার কর্মকর্তাদের সঙ্গে আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে না।
ফলে নীতিমালা বাস্তবায়নে গতি কমে, ফাইল নিষ্পত্তিতে বিলম্ব বাড়ে, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা অনেক সময় সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে যান। প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং নেতৃত্বে প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়।
দলগত নেতৃত্বের পরিবর্তে যখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার বলয় তৈরি হয়, তখন প্রতিষ্ঠান পরিণত হয় ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর সমষ্টিতে। সেখানে কাজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় অবস্থান ধরে রাখা। সহকর্মীকে সহযোগিতা করার পরিবর্তে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ে।
এ ধরনের পরিবেশে উদ্ভাবন, দক্ষতা উন্নয়ন কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা—কোনোটিই টেকসই হয় না। কারণ টিম স্পিরিটের অনুপস্থিতিতে কোনো প্রতিষ্ঠান তার পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করতে পারে না। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই প্রবণতা এখনও অব্যাহত। আমরা এখনো মেধা, যোগ্যতা ও পেশাদার অভিজ্ঞতাকে নিয়োগের প্রধান মানদণ্ডে পরিণত করতে পারিনি।
ফলে প্রশ্ন জাগে, আগামীতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, নীতি-প্রণয়নকারী সংস্থা কিংবা সেবা-প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর থাকবে? নেতৃত্ব বাছাইয়ের প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ ও পেশাভিত্তিক না হয়, তবে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ক্রমেই ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। ইতোমধ্যে এর লক্ষণ দৃশ্যমান—এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বহু প্রতিষ্ঠান তাদের প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হবে।
সমাধান রাজনৈতিক বাস্তবতা অস্বীকার করে নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই সম্ভব। ঊর্ধ্বতন পদে নিয়োগে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে ব্যক্তিগত প্রভাব নয়, যোগ্যতা ও সামর্থ্য হবে মূল বিবেচ্য। অভিজ্ঞতা, পেশাদারি দক্ষতা এবং প্রমাণিত নেতৃত্বগুণকে নিয়োগের প্রধান মানদণ্ডে পরিণত করা জরুরি। পাশাপাশি নির্দিষ্ট মেয়াদভিত্তিক কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দলভিত্তিক নেতৃত্বের চর্চা এবং পেশাদার নৈতিকতা জোরদার না করলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে প্রশাসনিক ও একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে পেশাদারিত্বকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একটি দেশ কেবল অবকাঠামো দিয়ে এগোয় না; এগোয় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান দিয়ে। আর শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে দক্ষ, আস্থাভিত্তিক ও লক্ষ্যনিষ্ঠ টিমের মাধ্যমে। যদি আমরা সত্যিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা রেখে যেতে চাই, তবে প্রাতিষ্ঠানিক টিমওয়ার্ক গড়ে তোলার চর্চার কোনো বিকল্প নেই। ব্যক্তিকেন্দ্রিক পদলাভ নয়, সমন্বিত দলগত সক্ষমতাই হতে হবে অগ্রাধিকারের বিষয়।
এখনই সময়—পদকে নয়, টিমওয়ার্ককে গুরুত্ব দেওয়ার। সুস্পষ্ট দায়িত্ববণ্টন, পারস্পরিক আস্থা ও যৌথ জবাবদিহির ভিত্তিতে টিম গঠন ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আর এ জন্য তদবিরনির্ভর নিয়োগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে।
লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক; আহবায়ক, ওয়েল-বিয়িং-ফার্স্ট ইনিশিয়েটিভ (ওয়েফি), বাংলাদেশ

ক্রিকেট, ফুটবল, রিলে রেস কিংবা যে কোনো দলভিত্তিক খেলায় জয়ের পূর্বশর্ত হলো কার্যকর টিমওয়ার্ক—এ কথা আমরা সবাই বুঝি এবং স্বীকার করি। আমরা এটাও জানি, সঠিক জায়গায় সঠিক খেলোয়াড়কে না রাখলে দল তার সেরা পারফরম্যান্স উপহার দিতে পারে না। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রেও যে একইভাবে দক্ষ, সমন্বিত ও লক্ষ্যনিষ্ঠ টিম গড়ে তোলা অপরিহার্য—এ উপলব্ধি আমাদের মধ্যে ততটা দৃঢ় নয়। জানলেও আমরা অনেক সময় তা গুরুত্ব দিই না।
বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে আমরা প্রায়ই আলোচনা করি—দুর্বল বাস্তবায়ন, সেবায় বিলম্ব, সিদ্ধান্তে অস্থিরতা, জবাবদিহির ঘাটতি ইত্যাদি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করি। কিন্তু সমস্যার একটি গভীর ও মৌলিক উৎস নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম কথা হয়, আর তা হলো, রাজনৈতিক বিবেচনা বা তদবিরভিত্তিক নিয়োগের ফলে কার্যকর টিম গড়ে না ওঠা। এই ধারা এখনও বহাল রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে বহু প্রতিষ্ঠান কাঙ্ক্ষিত দক্ষতায় কাজ করতে পারবে না—এ আশঙ্কা দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে।
যেকোনো দপ্তরের কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে একটি দক্ষ ও সমন্বিত টিম অপরিহার্য। দপ্তরপ্রধান সেই দলের অধিনায়ক; বিভাগ বা উইং প্রধানরা দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব দেন; আর অন্যান্য কর্মকর্তারা দলীয় সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি। কাজের ধরন অনুযায়ী যথাযথ টিম কম্পোজিশন, পারস্পরিক আস্থা, পেশাদার সম্পর্ক এবং লক্ষ্যভিত্তিক সমন্বয়—এসবই একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার ভিত্তি।
কিন্তু যখন ঊর্ধ্বতন পদে নিয়োগের প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠে রাজনৈতিক আনুগত্য বা তদবির, তখন পেশাদারিত্ব পেছনে পড়ে যায়। টিমওয়ার্কের জায়গায় শুরু হয় অবস্থান রক্ষার প্রতিযোগিতা। সহযোগিতার জায়গায় জন্ম নেয় সন্দেহ; সমন্বয়ের জায়গায় দেখা দেয় রেষারেষি; আর দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য হারিয়ে যায় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তারের হিসাব-নিকাশে। আর তদবিরের মাধ্যমে পদায়ন হলে তদবিরকারীদের স্বার্থ রক্ষার এক ধরনের অঘোষিত বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়। ফলে সমন্বিত ও কার্যকর টিমওয়ার্ক গড়ে ওঠা তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে সহকর্মীরাই পরস্পরের চরম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ান।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উপাচার্য, উপ-উপাচার্য কিংবা কোষাধ্যক্ষ নিয়োগকে ঘিরে বিতর্ক যেন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সরকারি দলের অনুসারী হয়েও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী বা পন্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং পৃথক তদবিরের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত। নিয়োগের পর তাঁরা আবার নিজস্ব অনুসারী গোষ্ঠী গড়ে তুলে আলাদা বলয় সৃষ্টি করেন। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি সমন্বিত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ার পরিবর্তে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রত্যেকে নিজ নিজ পরিসরে প্রভাব বিস্তারে মনোনিবেশ করেন, এবং বিভাজন ক্রমেই গভীরতর হয়। পরিণতিতে, বহু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে একাডেমিক অগ্রাধিকার নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষাই মুখ্য বিবেচ্য হয়ে ওঠে। ফলে একটি সুসংগঠিত, সমন্বিত ও কার্যকর প্রশাসনিক টিম গড়ে ওঠে না; বরং প্রতিষ্ঠান পরিচালনা দুর্বল ও দ্বন্দ্বপ্রবণ হয়ে পড়ে।
এর প্রভাব সরাসরি পড়ে গবেষণা কার্যক্রম, একাডেমিক ক্যালেন্ডার, শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার মানের ওপর। নীতিনির্ধারণে স্থিরতা থাকে না; গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না; শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক অচলাবস্থার ভুক্তভোগী হয়। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হওয়ার কথা, সেখানে শক্তিশালী দলগত নেতৃত্বের অভাবে প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়—বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা কিংবা সেবা-প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কোনো সংস্থার মহাপরিচালক বা চেয়ারম্যান যদি প্রধানত রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তবে তাঁর অধীনে কর্মরত পেশাদার কর্মকর্তাদের সঙ্গে আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে না।
ফলে নীতিমালা বাস্তবায়নে গতি কমে, ফাইল নিষ্পত্তিতে বিলম্ব বাড়ে, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা অনেক সময় সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে যান। প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং নেতৃত্বে প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়।
দলগত নেতৃত্বের পরিবর্তে যখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার বলয় তৈরি হয়, তখন প্রতিষ্ঠান পরিণত হয় ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর সমষ্টিতে। সেখানে কাজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় অবস্থান ধরে রাখা। সহকর্মীকে সহযোগিতা করার পরিবর্তে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ে।
এ ধরনের পরিবেশে উদ্ভাবন, দক্ষতা উন্নয়ন কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা—কোনোটিই টেকসই হয় না। কারণ টিম স্পিরিটের অনুপস্থিতিতে কোনো প্রতিষ্ঠান তার পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করতে পারে না। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই প্রবণতা এখনও অব্যাহত। আমরা এখনো মেধা, যোগ্যতা ও পেশাদার অভিজ্ঞতাকে নিয়োগের প্রধান মানদণ্ডে পরিণত করতে পারিনি।
ফলে প্রশ্ন জাগে, আগামীতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, নীতি-প্রণয়নকারী সংস্থা কিংবা সেবা-প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর থাকবে? নেতৃত্ব বাছাইয়ের প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ ও পেশাভিত্তিক না হয়, তবে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ক্রমেই ক্ষয়প্রাপ্ত হবে। ইতোমধ্যে এর লক্ষণ দৃশ্যমান—এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বহু প্রতিষ্ঠান তাদের প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হবে।
সমাধান রাজনৈতিক বাস্তবতা অস্বীকার করে নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই সম্ভব। ঊর্ধ্বতন পদে নিয়োগে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে ব্যক্তিগত প্রভাব নয়, যোগ্যতা ও সামর্থ্য হবে মূল বিবেচ্য। অভিজ্ঞতা, পেশাদারি দক্ষতা এবং প্রমাণিত নেতৃত্বগুণকে নিয়োগের প্রধান মানদণ্ডে পরিণত করা জরুরি। পাশাপাশি নির্দিষ্ট মেয়াদভিত্তিক কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দলভিত্তিক নেতৃত্বের চর্চা এবং পেশাদার নৈতিকতা জোরদার না করলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে প্রশাসনিক ও একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে পেশাদারিত্বকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একটি দেশ কেবল অবকাঠামো দিয়ে এগোয় না; এগোয় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান দিয়ে। আর শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে দক্ষ, আস্থাভিত্তিক ও লক্ষ্যনিষ্ঠ টিমের মাধ্যমে। যদি আমরা সত্যিই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা রেখে যেতে চাই, তবে প্রাতিষ্ঠানিক টিমওয়ার্ক গড়ে তোলার চর্চার কোনো বিকল্প নেই। ব্যক্তিকেন্দ্রিক পদলাভ নয়, সমন্বিত দলগত সক্ষমতাই হতে হবে অগ্রাধিকারের বিষয়।
এখনই সময়—পদকে নয়, টিমওয়ার্ককে গুরুত্ব দেওয়ার। সুস্পষ্ট দায়িত্ববণ্টন, পারস্পরিক আস্থা ও যৌথ জবাবদিহির ভিত্তিতে টিম গঠন ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আর এ জন্য তদবিরনির্ভর নিয়োগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে।
লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক; আহবায়ক, ওয়েল-বিয়িং-ফার্স্ট ইনিশিয়েটিভ (ওয়েফি), বাংলাদেশ

বিশ্ব রাজনীতি কখনো কখনো ব্যক্তির হাতে বন্দি হয়ে পড়ে। তখন নীতি হারায়; প্রাধান্য পায় মেজাজ। প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়; ব্যক্তিত্ব ফুলে ওঠে। এই বাস্তবতা নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও নগ্নভাবে সামনে এসেছে।
১০ ঘণ্টা আগে
একুশ শতকের তৃতীয় দশকে বিশ্বরাজনীতি এক অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের অস্ত্রের ভান্ডার ও অর্থনীতিকে বিসর্জন দিচ্ছে। একদিকে কামানের গর্জন আর ক্ষেপণাস্ত্রের ঝিলিক যখন পরাশক্তিগুলোকে যুদ্ধের চোরাবালিতে নিমজ্জিত করছে, ঠিক তখনই হয়তো বেইজিংয়
১৮ ঘণ্টা আগে
আমরা এখন পারস্য উপসাগরের নীল জলে। কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশ মিলিটারি কনটিনজেন্টের একদল সামরিক কর্মকর্তা ফেরিতে করে কুয়েত থেকে ২০ কিলোমিটার দূরবর্তী ফাইলাকা দ্বীপে ভ্রমণে চলেছি। ২০১০-এর জানুয়ারি। আমাদের পূর্ব দিকে ইরান। সেই দেশ থেকে উড়ে এসে একদল সাদা সীগাল আমাদের স্বাগত জানায়।
১ দিন আগে
‘সত্যেন’ নামের আক্ষরিক অর্থ—সত্যের প্রতি নিষ্ঠাবান ব্যক্তি; যিনি সত্যকে ধারণ করেন কিংবা যাঁর কাছে সত্যই পরম আরাধ্য। আমাদের সত্যেন সেন তাঁর নামের এই আক্ষরিক অর্থের এক জীবন্ত ও মূর্ত উদাহরণ।
২ দিন আগে