‘ঋণের দায়ে আত্মহত্যা’ করা মিনারুল মৃত্যুর পরও কেন প্রদর্শনবাদিতার অংশ হয়ে ওঠেন

রাজশাহীর পবা উপজেলায় সম্প্রতি একটি ঘটনা ঘটেছে। ঋণের দায়ে স্ত্রী-সন্তানসহ মিনারুল ইসলাম নামে এক যুবকের আত্মহত্যার পর তাঁর বাবা রুস্তম আলী ছেলের চল্লিশায় ১২ শ লোককে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াইছেন। আর খাওয়ানোর জন্য এ খরচ তিনি জোগাড় করেছেন ঋণ করে। কেন এই প্রদর্শনবাদিতার অংশ হলেন তিনি? এর পেছনে কারণ কী?

স্ট্রিম গ্রাফিক

‘ও মা গো মা অন্য কিছুর গল্প বলো

এক যে ছিল রাজা রানী অনেক হলো

বলো না কেন ঐ ও পাড়ার দাশুরই ছেলে

জ্বরেতে ভুগে, না খেতে পেয়ে মারা গেল…’

ছোটবেলায় অন্তরা চৌধুরীর কণ্ঠে এই ছড়াগান শুনে মনে হতো, আসলেই তো না খেতে পেয়ে মানুষ কীভাবে মরে যায়! বড় হতে হতে উপলব্ধি করেছি, রেস্তোরাঁয় একবেলা খাবার খেয়ে অনায়াসে কেউ পাঁচ হাজার টাকা বিল দেবে, আর কেউ সপ্তাহে দুই হাজার সাত শ টাকা ঋণের কিস্তি মেটাতে না পেরে নিজের হাতে প্রথমে স্ত্রীকে মেরে ফেলবে। এরপর কিশোর ছেলে আর দুই বছরের মেয়েকে মারবে। তারপর নিজেই মরে যাবে। তবে মরার আগে একটা জিনিস তিনি করতে পেরেছেন, নিজের বয়ানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন নিজের হাতে।

নিজ বাড়ি থেকে মিনারুল ইসলাম, তাঁর স্ত্রী মনিরা খাতুন (৩০), ছেলে মাহিম (১৪) ও মেয়ে মিথিলার (৩) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মাহিন খড়খড়ি উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। আর মিনারুল কৃষিকাজ করতেন।

গণমাধ্যমে প্রকাশ, গত ১৫ আগস্ট রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের বামুনশিকড় গ্রামের ৩৫ বছর বয়সী মিনারুল ইসলামের লাশ ঝুলছিল তাঁর ঘরের সিলিং ফ্যানে। পাশে বিছানায় পড়ে ছিল ছেলে মাহিন। আর ছোট্ট মিথিলাকে পাওয়া যায় পাশের ঘরে। মিথিলা মাছ খেতে ভালোবাসত।

পুলিশ জানায়, লাশ উদ্ধার করার সময় তারা দুই পৃষ্ঠার চিরকুট পেয়েছেন। যেখানে মিনারুল লিখে গেছেন, কেন এই ভয়াবহ সিদ্ধান্ত তাঁকে নিতে হলো। বৈষম্যমুলক এই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় মিনারুলের মতো নিম্নবর্গের মানুষের বয়ান নির্মাণের ভার সবসময়ই নিয়ে নেয় অন্য কেউ। নিম্নবর্গের এজেন্সির বেসাতি হতে থাকে আর ক্ষমতাসীন আধিপত্যের লাগাম আরও টেনে ধরতে থাকে। কিন্তু এখানে মিনারুল তা হতে দেননি। তিনি লিখেছেন, ‘আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে। এত কষ্ট আর মেনে নিতে পারছি না। তাই আমাদের বেঁচে থাকার চেয়ে মরে গেলাম, সেই ভালো হলো। কারও কাছে কিছু চাইতে হবে না।’

রাজশাহীর পবা উপজেলার বামনশিকড় গ্রামে চল্লিশার আয়োজন করা হয়। ছবি: সংগৃহীত
রাজশাহীর পবা উপজেলার বামনশিকড় গ্রামে চল্লিশার আয়োজন করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু মরে গিয়েও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার প্রদর্শনবাদিতার চক্র ভাঙতে পারেননি মিনারুল। কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা মিনারুল জুয়া খেলে ঋণগ্রস্ত হয়েছিলেন। বাবা জমি বিক্রি করে তাঁর ঋণের দেড় লাখ টাকা শোধ করলেও বাকি ছিল ২ লাখ। কিস্তি চালাতে না পেরে তাঁর বাবা রুস্তম আলীকে তিনি অনুরোধ করেছিলেন আরও কিছু জমি বিক্রি করে ঋণের পুরোটা পরিশোধ করে দিতে। কিন্তু বাবা রাজি হননি। তবে ছেলের ঋণের পুরোটা পরিশোধ করতে না পারলেও ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনির চল্লিশার আয়োজনে তিনি কমতি রাখেননি কোনো। রীতিমতো প্যান্ডেল টাঙিয়ে ১২ শ লোকের খাওয়ার আয়োজন করেছেন। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, গ্রামবাসীকে দাওয়াত করেছেন। এজন্য প্রায় লাখ টাকা খরচ করেছেন ঋণ করে। গণমাধ্যমে আসার পর ভাইরাল হয়েছে সংবাদটি।

গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, মিনারুলের বাবা রুস্তম আলী ছেলের চল্লিশার আয়োজনে যে টাকা ঋণ করেছেন, তা তিনি পরিশোধ করবেন জমি বিক্রি করে। ঋণ করে কেন ছেলের চল্লিশায় এত বড় আয়োজন করলেন, এ প্রশ্নের জবাবে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘সমাজের মানুষকে নিয়ে এটা করতে হয়। বাপ-দাদার আমল থেকেই এটা দেখে আসছি। আমিও মনের আবেগে করলাম। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী করে সমাজের মানুষকে নিয়ে এটা করতে হয়।’

ফরাসি মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক গায় ডিবোর্ড বলছেন, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় প্রকৃত সামাজিক জীবনের জায়গা নিচ্ছে উপস্থাপন। আর এর নাম তিনি দিয়েছে ‘দ্য সোসাইটি অব স্পেকটেকল’ বা ‘চকমকে দৃশ্যের সমাজ’। যেখানে সামাজিক জীবন থাকা থেকে পাওয়া আর পাওয়া থেকে আবির্ভূত হওয়ায় পর্যবসিত হয়েছে। যেখানে পণ্যের সঙ্গে সম্পর্ক মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের জায়গা দখল করেছে। এ প্রসঙ্গে ডিবোর্ডের কথা হলো, ‘চকমকে দৃশ্যের সঙ্গে পরোক্ষ মিল খোঁজা প্রকৃত কর্মতৎপরতাকে প্রতিস্থাপন করছে।’ আর তাই হয়তো মিনারুলের বাবা রুস্তম আলীর কাছে জীবিত ছেলেকে অর্থ সাহায্যের মাধ্যমে জীবনের পথে আরেকটু এগিয়ে দেওয়ার চেয়ে মৃত ছেলের জন্য সামাজিক আয়োজনে অর্থব্যয় বেশি কার্যকরী মনে হচ্ছে।

কিন্তু কেন আমাদের এমন মনে হয়? এ ধরনের প্রদর্শনবাদিতা আমরা কেন করি? মিনারুলের বাবা রুস্তম আলী ঋণ করেও কেন এই প্রদর্শনবাদিতায় অংশ নিলেন?

আমরা আসলে এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যখন প্রদর্শনকাবাদীই আমাদর জীবনযাত্রার গতিপথ নির্ধারণ করে দিচ্ছে। ঠিক যেমনটা এখন আমরা দেখছি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। একটি সুন্দর মুহূর্তকে সত্যিকার অর্থে উপভোগ করার চেয়ে ওই মুহূর্তের ছবি তুলে পোস্ট না করলে আমাদের এখন যেন হয়ই না। তাই শুধু ‘ছবি হওয়া’র দিকেই আমাদের এখন বেশি ঝোঁক। বারবার আমরা এখন ওদিকেই জোর দেই। প্রিয় মানুষের সঙ্গ উপভোগ করার চেয়ে তার সঙ্গে তোলা ছবিতে লাইক, কমেন্ট, শেয়ারের ঘনঘটা কতটা, সেদিকেই বেশি মনোযোগ আমাদের। যা কিছু ব্যক্তিগত, প্রতিনিয়ত তার বিনির্মাণ ঘটছে পণ্যায়নের হিসেবের সঙ্গে মিল রেখে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যস্থতা করছে নানা দৃশ্য—হোক সে স্থির বা গতিশীল। ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, বেশ আগে কবিতায় এটি লিখেছিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। তাঁর কথা আজ যেন ভয়ংকরভাবে সত্য হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞাপন হয়ে উঠেছি আমরা সবাই–ই। আর গায় ডিবোর্ডের ভাষায়, এভাবেই মানুষের ওপর সম্পন্ন হচ্ছে পণ্যের উপনিবেশিকীকরণ।

বেচারা মিরারুল তাই ঋণের দায় মাথায় নিয়ে আত্মহত্যা করেও বাঁচতে পারছেন না, মরে গিয়েও তিনি প্রদর্শনবাদিতার অংশ হয়ে উঠছেন। বাবা রুস্তম আলীকে ঋণ করে ছেলের চল্লিশার ‘উৎসব’ করতে হচ্ছে। আর এভাবেই মিনারুলরা মরে গিয়েও বৈষম্যের ভারী জোয়ালের নিচে আরও একটু পিষ্ট হচ্ছেন।

লেখক: শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস; সাংবাদিক

সম্পর্কিত