রেল দুর্ঘটনায় ‘বলির পাঁঠা’ নিচের সারির কর্মীরা

স্ট্রিম গ্রাফিক

রেল দুর্ঘটনার পর তদন্ত হয়। শাস্তিও পান অনেকে। তবে অভিযোগ উঠেছে, শাস্তির আওতায় আসেন কেবলই নিচের সারির কর্মীরা। ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যান কর্মকর্তারা। ফলে রেল নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় আসে না কোনো পরিবর্তন।

গত ২১ মার্চ ঈদুল ফিতরের রাতে কুমিল্লায় ক্রসিংয়ে বাস উঠে পড়লে ট্রেনের ধাক্কায় ১২ যাত্রী নিহত হয়। এরপর আবারও রেল নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এসেছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, জেলা প্রশাসক, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশসহ যাদের দুর্ঘটনায় গাফিলতি রয়েছে, তারাই তদন্ত করলে নিরপেক্ষতা থাকবে না। ফলে বেশির ভাগ দুর্ঘটনায় গরিবের ওপর সব দায় চাপিয়ে দোষীরা সুন্দর জীবন কাটিয়ে দিতে পারেন।

গত আট বছরে রেলপথের পূর্বাঞ্চলে (ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট-ময়মনসিংহ বিভাগ) আটটি দুর্ঘটনায় ৬৮ জনের প্রাণহানি ও আহত হয়েছেন অন্তত ২১৮ জন। প্রতিবারই রেলওয়ে তদন্ত কমিটি করে। এসব তদন্তে বেশির ভাগ সময় দুর্ঘটনার জন্য লোকোমাস্টার (চালক), সহকারী লোকোমাস্টার, গার্ড ও গেটম্যানদের দায়িত্বে অবহেলাকে দায়ী করা হয়।

২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর ভৈরব রেলস্টেশনের আউটার পয়েন্টে ঢাকাগামী আন্তঃনগর ‘এগারসিন্দুর এক্সপ্রেস’– এর সঙ্গে একটি পণ্যবাহী ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত হন ১৯ জন। আহত হন অন্তত ৫০ জন। ওই ঘটনায় চালক, সহকারী চালক ও গার্ড সংকেত ভালোভাবে লক্ষ্য না করায় দুর্ঘটনা বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

২০২৩ সালের ১৬ এপ্রিল কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে ‘সোনার বাংলা এক্সপ্রেস’ পেছন থেকে পণ্যবাহী একটি ট্রেনকে ধাক্কা দেয়। কেউ মারা না গেলেও আহত হন অন্তত ৫০ জন। তদন্তে চালকের সংকেত অমান্য করার বিষয় উঠে আসে।

২০২২ সালের ২৯ জুলাই দুপুরে চট্টগ্রামের মিরসরাই বড়তাকিয়া রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকায় পর্যটকবাহী একটি মাইক্রোবাস লাইনে উঠে পড়লে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ‘মহানগর প্রভাতী এক্সপ্রেস’–এর ধাক্কায় ঘটনাস্থলে মারা যান ১৩ জন। এ ঘটনায় মাইক্রোবাসের চালক ও গেটম্যানকে দায়ী করে প্রতিবেদন দেয় দুটি কমিটি।

২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় মন্দবাগ স্টেশনে সংঘর্ষ হয় চট্টগ্রামগামী ‘উদয়ন এক্সপ্রেস’ ও ঢাকাগামী ‘তূর্ণা নিশিথা’র। এতে ১৬ যাত্রী প্রাণ হারান। তদন্ত প্রতিবেদনে তূর্ণা নিশিথার চালক ও গার্ডকে দায়ী করা হয়।

২০১৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর ভোরে বারইয়ারহাট রেলক্রসিংয়ে বাস উঠে পড়লে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী’ বিজয় এক্সপ্রেস’ সেটিকে ধাক্কা দিয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে নিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় দুই বাসযাত্রীর। আহত হন আরও ২০ জন। ট্রেন আসার সময় কোনো প্রতিবন্ধকদণ্ড ফেলা হয়নি—গেটম্যানের অবহেলায় এ দুর্ঘটনা বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে।

তদন্ত কমিটিতে নেই রেল বিশেষজ্ঞ

কুমিল্লার দুর্ঘটনায় তিনটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। এর মধ্যে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আঞ্চলিক ও বিভাগীয়—দুটি এবং জেলা প্রশাসন একটি কমিটি করেছে। তবে এসব কমিটিতে কোনো রেল বিশেষজ্ঞ রাখা হয়নি।

রেলওয়ের আঞ্চলিক তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (পূর্ব) সফিকুর রহমানকে। চার সদস্যও রেলের কর্মকর্তা। আর পাঁচ সদস্যের বিভাগীয় তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (চট্টগ্রাম) আনিসুর রহমানকে। জেলা প্রশাসনের কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট; সদস্যরা হলেন– এডি বিআরটিএ, হাইওয়ে থানার ওসি, স্টেশন মাস্টার (কুমিল্লা) এবং এডি ফায়ার সার্ভিস।

কমিটিতে রেল বিশেষজ্ঞ নেই কেন— প্রশ্নে রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন বলেন, ‘আমি তদন্ত কমিটি করলে বাইরে থেকে কাউকে রাখতে পারি না। এটি মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো জায়গা থেকে করলে, তারা পারবে। আমি রেলের কর্মকর্তা। এটি আমাদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।’

কুমিল্লার দুর্ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, ‘ইতোমধ্যে অভিযুক্ত গেটম্যানদের আমরা বরখাস্ত করেছি। তাদের আইনের আওতায় আনার কথা বলেছি। এ ছাড়া অন্য কোথাও কোনো গাফিলতি আছে কি না, তা জানতে এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলেছি।’

শাস্তি পান নিচের সারির কর্মীরা

রেল দুর্ঘটনার দায় এড়াতে কেবল নিচের সারির কর্মীদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কুমিল্লার দুর্ঘটনার পর দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে দায়িত্বরত গেটম্যান মেহেদী হাসান ও হেলাল উদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, রেলওয়ের দুর্ঘটনাগুলোর একেকটির একেকটি কারণ থাকে। কুমিল্লার বিশ্বরোডে যে লেভেল ক্রসিং রয়েছে, সেখানে দায়িত্বরত গেটম্যানকে স্টেশন থেকে যোগাযোগ করে জানানো হয় যে, একটি ট্রেন পাস করবে, যাতে তারা গেট ব্যারিয়ার নামিয়ে দেন এবং রেললাইনে সড়কযান উঠতে না পারে। কুমিল্লার ঘটনায় আগের দুই স্টেশনে দায়িত্বরত গেটম্যানদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা যায়নি। পরে যখন তাদের পাওয়া গেছে, ততক্ষণে যানবাহন সেখানে ঢুকে পড়েছিল।

তিনি বলেন, ‘এটি তদন্তাধীন, তারপরও প্রাথমিকভাবে আমরা এটিকে গেটম্যানের ভুল বলে মনে করছি।’ গেটম্যানদের সুপারভাইজারদের কেন ধরা হচ্ছে না—প্রশ্নে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সেই সুপারভাইজারকেও আমরা সাময়িক বরখাস্ত করেছি। আমরা বিভাগীয় ও জোনাল তদন্ত কমিটি করেছি। এখানে যাদের গাফিলতি আছে, তারা পার পাবে না।’

বাববার দুর্ঘটনা কেন

রেল দুর্ঘটনা এড়াতে বিশেষজ্ঞরা মহাসড়কের সঙ্গে রেলের লেভেল ক্রসিং না করার পরামর্শ দেন। পুরো মহাসড়ক ওপর দিয়ে যাবে অথবা রেল ওপর দিয়ে চলে যাবে। কিন্তু কুমিল্লার দুর্ঘটনাস্থল পদুয়ার বাজারে ওভারপাস হলেও অর্ধেক রাস্তা নিচে রয়ে গেছে।

অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, টাকা ঢেলে নামকাওয়াস্তে রেল ওভারপাস করা হচ্ছে। পদুয়ার বাজারে এটি একটি আংশিক ওভারপাস, অনেকটা রাজধানীর খিলগাঁওয়ের মতো। রাস্তা নিচেই রয়ে গেছে। মহাখালীতেও একই অবস্থা।

রেললাইনকে কখনোই সড়কের সঙ্গে জট বাঁধানো যাবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রেল একটি দ্রুতগতির পরিবহন। হার্ডব্রেক দেওয়া যায় না। শত বছর আগেই জাপান দেখিয়েছে—রেল স্বতন্ত্র তালে চলবে, কখনো সড়কের সঙ্গে জট বাঁধবে না। কিন্তু আমরা দেখেছি, লাখো কোটি টাকা খরচ করে এমন উন্নয়ন করা হয়েছে, যেখানে রেল-সড়ক জট থেকেই যাচ্ছে।’

অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, এখন প্রযুক্তির যুগ। একটি ট্রেন আসছে—স্টেশনের আশপাশে যত লেভেল ক্রসিং আছে, মোবাইল ট্র্যাকিং করলেই বোঝা যায় গেটম্যানরা সাইটে আছে কি না। যদি তা না হয়, তাহলে সুপারভাইজারের দায়িত্ব কোথায়? তার ওপরের অপারেশনাল ম্যানেজারের দায়িত্ব কোথায়? কিন্তু তদন্ত কমিটিতে সব সময় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা থাকেন—গেটম্যানদের রাখা হয় না। ফলে তারাই বলির পাঁঠা হন, ধরা-ছোয়ার বাইরে থাকেন কর্মকর্তারা।

ট্রেন দুর্ঘটনার দায় স্থানীয় সরকার ও সড়ক বিভাগেরও উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, বাংলাদেশে অনেক রেলগেট আছে, যেখানে গেটম্যান নেই। এই দায়-দায়িত্ব শুধু রেলের নয়; স্থানীয় সরকার এবং সড়ক পরিবহন বিভাগেরও। তারা অনেক জায়গায় অনুমোদন ছাড়াই রেলগেট করেছে।

উদাহরণ হতে পারে পদ্মা রেল সেতু

রেল দুর্ঘটনা এড়াতে অধ্যাপক শামসুল হক উদাহরণ টানেন জাপানের। তাঁর ভাষ্যে, দেশটির এক শহরেই তিন কোটি মানুষের বসবাস। তাদের রেলে কোনো গেটম্যান রাখতে হয় না। রেলকে তারা সড়কের ওপর নিয়ে গেছে। রাজধানী টোকিওর মধ্য দিয়ে একটি ট্রেন ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটার গতিতে চলে। অথচ সেখানে কোনো লেভেল ক্রসিং নেই। কারণ ট্রেন চলে ওপর দিয়ে।

অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, পদ্মা সেতু থেকে নারায়ণগঞ্জের পাগলা পর্যন্ত এলিভেটেড রেল সেকশনে কোনো দিন দুর্ঘটনা হবে না। সেখানে ট্রেন ১০০ কিলোমিটারের নিচে চলে না। কিন্তু নিচে যানবাহন ৩০ কিলোমিটার গতিও পায় না। সস্তা উন্নয়ন করলে দীর্ঘমেয়াদে খরচ বেশি হয়। ওপরে ট্রেন চালালে একটি ট্রেন তিনটির কাজ করতে পারে—কম লোকোমোটিভ লাগে, খরচও কম হয়।

রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘ওভারপাস ও আন্ডারপাস নির্মাণ করতে হবে এবং সিগন্যালিং ইন্টারলকিং (কম্পিউটারভিত্তিক) ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

তিনি জানান, নতুন রেললাইনগুলো—পদ্মা রেল লিংক, দোহাজারী-কক্সবাজার—এসব প্রকল্পে আন্ডারপাস রাখা হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লেভেল ক্রসিংগুলোকে আন্ডারপাসে রূপান্তর করা হচ্ছে, কোথাও কোথাও ওভারপাস করা হচ্ছে।

স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের যেখানে সম্ভব, সেখানে ওভারপাস ও আন্ডারপাস নির্মাণ, বিশেষ করে ঢাকা ও আশপাশের বড় এলাকায় সমীক্ষা চালিয়ে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন। ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সম্পর্কিত