জেন-জিরা বাহাত্তরের সংবিধান চায় না: সংসদে হান্নান মাসউদ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

সংসদে বক্তব্য দিচ্ছেন আব্দুল হান্নান মাসউদ। ছবি: সংগৃহীত

নতুন প্রজন্মের (জেন-জি) প্রতিনিধিরা ১৯৭২ সালের সংবিধান চায় না এবং তাঁরা ওই সংবিধান রক্ষার জন্য রক্ত দেননি বলে মন্তব্য করেছেন নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ। তিনি বলেন, ‘এই জেনারেশন রক্ত দিয়েছে একটি নতুন, বৈষম্যহীন এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষায়। তাঁদের স্বপ্নকে ধারণ করেই আগামীর রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।’

রবিবার (২৯ মার্চ) জাতীয় সংসদে মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এ কথা বলেন তিনি।

তরুণ এই আইনপ্রণেতা বর্তমান প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং তাঁর ওপর হওয়া ধারাবাহিক হামলার বর্ণনা দিয়ে সরকারি ও বিরোধী পক্ষকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন।

সংবিধান সংস্কার ও গণভোট প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলে আব্দুল হান্নান মাসউদ বলেন, ‘যে গণভোটের পক্ষে আমাদের প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা দেশজুড়ে প্রচারণা চালিয়েছেন, সেটি নিয়ে এখন কেন আবার দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন হচ্ছে? আমরা চাই জনগণের সেই রায় দ্রুত কার্যকর হোক। মনে রাখতে হবে, ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ১৯৯৪ সালের মাগুরার কলঙ্কিত নির্বাচন এ দেশের মানুষ ভোলেনি।’

অতীতের নির্বাচনী কারচুপির উদাহরণ টেনে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘কারা মাগুরার নির্বাচন আয়োজন করেছিল, তা সবার জানা। আজ যাঁরা সংসদে বসে নতুন নতুন ব্যবস্থার কথা বলছেন, তাঁরা যে ক্ষমতায় থেকে আবারও মাগুরার মতো নির্বাচন করবেন না—তার নিশ্চয়তা কে দেবে? আমরা আর কোনো প্রহসনের নির্বাচন দেখতে চাই না।’

বক্তব্যের একপর্যায়ে নিজের নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণার সময় একাধিকবার হামলার শিকার হওয়ার বর্ণনা দেন হান্নান মাসউদ। তিনি অভিযোগ করেন, ‘সবচেয়ে কম বয়সী প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা করতে গিয়ে আমি তিন-তিনবার বড় ধরনের হামলার শিকার হয়েছি। এমনকি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও এলাকায় গেলে আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কোপাতে আসা হয়েছে। এসব ঘটনার ভিডিও চিত্র ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।’

তিনি আরও গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেন, চট্টগ্রাম থেকে একজন প্রভাবশালী সাংগঠনিক নেতাকে পাঠানো হয়েছে তাঁর লোকজনের ওপর হামলা করতে এবং নির্বাচনী এলাকা অস্থিতিশীল করতে। ভোটের দিন সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে ক্যাডার বাহিনী অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়েছে বলে তিনি সংসদকে অবহিত করেন এবং এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।

সংসদে মন্ত্রীদের দায়িত্ব বণ্টন ও সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে হান্নান মাসউদ বলেন, ‘দেশে বর্তমানে যে ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, তার দায় কে নেবে? আমার মনে হয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এখন আইনের ব্যাখ্যা না দিয়ে আইনমন্ত্রীর উচিত আইনের ব্যাখ্যা দেওয়া। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন সারা দেশে সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরিতে এবং তাঁদের বিচারের আওতায় আনতে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উচিত সেই সব বিএনপি নেতাকর্মীদের হত্যার বিচার নিশ্চিত করা, যাঁরা বিগত বছরগুলোতে ফ্যাসিবাদের শিকার হয়েছেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে মন্ত্রীদের ভূমিকা অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।’

নিজের নির্বাচনী এলাকার একটি লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে হান্নান মাসউদ আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার এলাকার একজন নারী অভিযোগ করেছেন যে “শাপলা কলি” প্রতীকে ভোট দেওয়ার কারণে তাঁকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে। অথচ ঘটনার পর সার্কেল এসপি মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে বলে দিলেন যে—এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। আজ ৪২ দিন পার হয়ে গেলেও এখনো ডিএনএ রিপোর্ট আসেনি।’

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মামলা নিতেও তিন দিন দেরি করা হয়েছে। সিভিল সার্জন অফিস একটি তদন্ত কমিটি করে দিলেও সেই কমিটির রিপোর্টে কী আছে, তা ভুক্তভোগী নারীকে জানানো হয়নি। রাষ্ট্রের কাছে আমার প্রশ্ন, এই কি আমাদের নতুন বাংলাদেশ? যেখানে একজন নারী নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার কারণে এমন পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন এবং বিচার পেতে তাঁকে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়!’

শেষে তিনি বলেন, এই সংসদকে কেবল আইন পাসের যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং জুলাই বিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়নের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। অন্যথায় দেশের ছাত্র-জনতা পুনরায় রাজপথে নামতে বাধ্য হবে।

সম্পর্কিত