তেহরানের বিপর্যয়: চীনের দুঃস্বপ্নের শুরু

লেখা:
লেখা:
ইউলুন নিয়ে

প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬, ১২: ৫৫
স্ট্রিম কোলাজ

ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে ঘটে গেল এক প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প। এক নজিরবিহীন মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ সামরিক অভিযানে নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ে চালানো এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের বড় একটি অংশ প্রাণ হারান। আজ ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান কার্যত একটি নেতৃত্বহীন রাষ্ট্র।

আলী খামেনির ছেলে মুজতবা খামেনিকে নতুন নেতা নির্বাচিত করা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের প্রশাসনিক কাঁঠামোকে টিকিয়ে তার পক্ষে রাখা কঠিন হবে। যদিও ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কিছু নেতা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চেষ্টা করবেন, কিন্তু আমেরিকার বিরুদ্ধে ইরানের যে কৌশলগত প্রতিরোধ ছিল, তা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

চীনের জন্য এটি একটি মহাবিপর্যয়। বেইজিংয়ের পুরো মধ্যপ্রাচ্য নীতি যেন এক মুহূর্তে ধসে পড়ল। তেহরানের এই বিশৃঙ্খলার ধাক্কা চীনের জ্বালানি নিরাপত্তাকে চুরমার করে দিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানির বাজার ধসিয়ে দিয়েছে এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) মতো বিশাল প্রকল্পকে থামিয়ে দিয়েছে।

এর চেয়েও ভয়ের বিষয় হলো, চীন এখন দুটি ভয়ঙ্কর বাস্তবতার মুখোমুখি: এক, আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যের ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে তার সমস্ত সামরিক শক্তি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের বিরুদ্ধে মোতায়েন করবে। দুই, ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা বিশ্বের দক্ষিণের দেশগুলোতে চীনের প্রভাব দ্রুত কমে আসবে।

জ্বালানি নিরাপত্তায় ধস

ইরানের ওপর এই হামলা চীনের জন্য একটি তৃমাত্রিক আঘাতের শেষ ধাপ। বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক হিসেবে চীন গোপনে কম দামে তেল কেনার জন্য ইরান, ভেনেজুয়েলা এবং রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু কিছু দিন আগেই মার্কিন অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ায় সেখান থেকে তেলের জোগান বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে, ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল রপ্তানির ক্ষমতাও কমে গেছে। আর এখন ইরানের বিশৃঙ্খলার কারণে সেখান থেকেও তেল সরবরাহ বন্ধ। ফলে চীনের সস্তা তেলের উৎসগুলো একে একে শুকিয়ে গেল।

কিন্তু বেইজিংয়ের জন্য আসল যন্ত্রণা শুধু তেলের দাম বৃদ্ধি নয়। ইরানের পতনের ফলে তাদের একটি অত্যন্ত লাভজনক ও গোপন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। চীন ইরানের সাথে মার্কিন ডলার এড়িয়ে এবং বিশাল বার্টার সিস্টেম বা পণ্য বিনিময় প্রথার মাধ্যমে বাণিজ্য করত। এক গোপন ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান থেকে আসা তেলের টাকা সরাসরি চীনের অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হতো। এছাড়া, চীন তাদের গাড়ি ও অন্যান্য শিল্পপণ্য ইরানের খনিজ সম্পদের বিনিময়ে দিত। চীনের ছোট ও স্বাধীন তেল শোধনাগারগুলোও মার্কিন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে ইউয়ানের মাধ্যমে লেনদেন করত।

ইরানের সরকারব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এই পুরো বিনিময় প্রথাটি ধ্বংস হওয়ার মুখে। এখন চীনকে বিশ্ববাজার থেকে চড়া দামে তেল কিনতে হবে এবং এর জন্য মার্কিন ডলার ব্যবহার করতে হবে। এর ফলে চীনের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের রক্তক্ষরণ ঘটবে। সবচেয়ে বড় আঘাত হলো, ইউয়ানকে ডলারের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে স্বপ্ন চীন দেখছিল, ইরান-রাশিয়া-ভেনেজুয়েলার এই জোট ভেঙে যাওয়ায় সেই স্বপ্নও চুরমার হয়ে গেল।

প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানিতে বিপর্যয়

ইরানের পতন চীনের ক্রমবর্ধমান অস্ত্র ব্যবসার হৃদপিণ্ডে আঘাত করেছে। চীন শুধু লাভের জন্যই অস্ত্র বিক্রি করত না, বরং এর মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নিজেদের প্রযুক্তিগত মান ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করত। তেহরানের এই পতনের ফলে চীনের কয়েকশ কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তি বাতিল হয়ে গেল, যার মধ্যে ছিল জে-১০সি যুদ্ধবিমান এবং সুপারসনিক অ্যান্টি-শিপ মিসাইলের মতো উন্নত সরঞ্জাম।

তবে আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় ক্ষতি হলো চীনের সুনামের। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে যে, পশ্চিমা আক্রমণের সামনে চীনের তৈরি সামরিক সরঞ্জাম কার্যকর নয়। কদিন আগেই ভেনেজুয়েলায় চীনের সরবরাহ করা জওয়াই-২৭ রাডার মাদুরোকে মার্কিন অভিযান থেকে বাঁচাতে পারেনি। এখন ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও (যেখানে চীনের তৈরি এইচকিউ-৯বি সিস্টেম ছিল বলে শোনা যায়) খামেনিকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হলো।

এই প্রযুক্তিগত ব্যর্থতার পাশাপাশি চীনের নিজেদের সামরিক বাহিনীতেও চলছে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, যা তাদের দুর্বলতাকে আরও প্রকাশ করে দিয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে ক্রেতারা এখন চীনের অস্ত্রের গুণমান নিয়ে সন্দিহান হবেন। এই দ্বিমুখী সংকটে বিশ্বের অন্যতম অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে চীনের উত্থানের স্বপ্ন শেষ হয়ে যেতে পারে।

বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অপমৃত্যু

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) ছিল শি জিনপিংয়ের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এই প্রকল্পে ইরান ছিল চীনকে মধ্য এশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়ার সাথে যুক্ত করার একমাত্র স্থল সেতু। ২০২১ সালে চীনের সাথে ইরানের ২৫ বছর মেয়াদি ৪০০ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু ইরানের পতনের ফলে বিআরআই-এর এই গুরুত্বপূর্ণ ধমনিটি ছিন্ন হয়ে যাবে।

এর ফলে চীনের হাজার হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ এখন ঝুঁকির মুখে। টেলিকম থেকে শুরু করে পরিবহন নেটওয়ার্ক পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্পে চীনের যে বিপুল বিনিয়োগ ছিল, তা এখন অচল সম্পদে পরিণত হওয়ার পথে।

ভূ-রাজনৈতিকভাবে এর প্রভাব আরও মারাত্মক। বিআরআই-এর মাধ্যমে চীন ইউরেশিয়াজুড়ে একটি চীন-কেন্দ্রিক ক্ষমতার বলয় তৈরি করতে চেয়েছিল। এর দুটি প্রধান পথ ছিল—উত্তরে রাশিয়া এবং কেন্দ্রে ইরান। রাশিয়া যুদ্ধে জড়িয়ে দুর্বল আর ইরান বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত হওয়ায় পশ্চিম দিকে চীনের অগ্রযাত্রা কার্যত বন্ধ হয়ে গেল।

কৌশলগত সুযোগের জানালা বন্ধ

বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার নিরিখে, ইরানের পতন আমেরিকার জন্য একটি বড় স্বস্তি এবং চীনের জন্য এক দুঃস্বপ্ন। গত ২০ বছর ধরে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে এতটাই জড়িয়ে ছিল যে, চীন সেই সুযোগে নিজেদের সামরিক বাহিনীকে আধুনিক করার এবং তাইওয়ানের ওপর চাপ বাড়ানোর যথেষ্ট সময় পেয়েছে। এখন ইরানকে নিয়ে আমেরিকার মাথাব্যথা কমলে তারা তাদের বিমানবাহী রণতরীসহ সমস্ত সামরিক শক্তি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের বিরুদ্ধে নিয়োগ করতে পারবে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনের জন্য তাইওয়ান দখলের যে কৌশলগত সুযোগের জানালা (যাকে ‘ডেভিডসন উইন্ডো’ বলা হয়) খোলা ছিল, তা হয়তো চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। আমেরিকার পূর্ণশক্তি যখন এশিয়ায় ফিরে আসবে, তখন চীনের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিতে জর্জরিত সেনাবাহিনী হয়তো আর পেরে উঠবে না।

বৈশ্বিক প্রভাবে ধস এবং ‘কাগুজে বাঘ’ ভাবমূর্তি

ইরানের ঘটনায় চীনের সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি হলো, তা হলো—বিকল্প নিরাপত্তা শক্তি হিসেবে চীনের ভাবমূর্তির অবসান। চীন নিজেকে পশ্চিমা শক্তির বিকল্প হিসেবে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর কাছে তুলে ধরেছিল। কিন্তু যখন তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্ররা (ভেনেজুয়েলা ও ইরান) অস্তিত্বের সংকটে পড়ল, তখন চীন শুধু মৌখিক বিবৃতি দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি।

এই নিষ্ক্রিয়তা উন্নয়নশীল বিশ্বে একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, “চীন কেন ইরানকে সাহায্য করছে না?” বিশ্বজুড়ে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে যে, চীন আসলে একটি ‘কাগুজে বাঘ’। তারা অর্থনৈতিক সুবিধা নিতে ও ঋণের ফাঁদে ফেলতে পারদর্শী, কিন্তু মিত্রদের রক্ষা করার জন্য সত্যিকারের শক্তি প্রয়োগ করতে অনিচ্ছুক বা অক্ষম। যে দেশগুলো এতদিন রাজনৈতিক ও সামরিক সুরক্ষার জন্য বেইজিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল, তারা এখন নিজেদের অবস্থান পূনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হবে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে চীনের প্রভাব কমতে শুরু করবে এবং একটি অ-পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থা গড়ার স্বপ্নও হয়তো শেষ হয়ে যাবে।

ইউলুন নিয়ে: একজন চীনা লেখক ও গবেষক। তিনি ইস্ট চায়না নরমাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ছিলেন।

(মতামত কলামটি দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে ভাবানুবাদকৃত। ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম)

সম্পর্কিত