ফেব্রুয়ারির নির্বাচন: প্রস্তুতি, সংশয় ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র কয়েক মাস। নির্বাচন কমিশন একটি রোডম্যাপ ধরে এগোচ্ছে এবং আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু সময় ঘনিয়ে এলেও নির্বাচন ঘিরে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় কাটছে না। প্রশ্ন উঠছে, এই পরিস্থিতিতে একটি স্বচ্ছ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা কীভাবে সম্ভব?

স্ট্রিম গ্রাফিক

আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ হাতে আছে মাত্র চার মাস। এই সময়টুকু নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য খুব বেশি নয়—এ কথা বলাই যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ধরনের আলাপ-আলোচনা, প্রস্তুতি কিংবা কর্মতৎপরতা দেখার কথা ছিল, তা দৃশ্যমান নয়। আইনগত বা প্রশাসনিক কিছু প্রস্তুতি হয়তো এগিয়েছে—যেমন কোথায় ভোট হবে, কতটি কেন্দ্র থাকবে, কোন নির্বাচনী এলাকায় ভোট গ্রহণ হবে ইত্যাদি। এসব তো অফিসিয়াল কাজ, তাই তা সম্পন্ন হয়েছে বলেই ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে যে প্রস্তুতিগুলো থাকা উচিত ছিল—যেমন কোন দল নির্বাচনে অংশ নেবে, কারা তাদের প্রার্থী, প্রতীকের বণ্টন, ইত্যাদি বিষয়ে এখনো স্পষ্ট চিত্র নেই।

অনেক দল এখনো নির্বাচন কমিশন বা সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে আলোচনা শুরুই করতে পারেনি। ফলে এখনো নিশ্চিত নয়, তারা নির্বাচনে অংশ নেবে কি নেবে না। অথচ এগুলোও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতির অংশ। তাই মনে হচ্ছে, মাত্র চার মাস বাকি থাকলেও পুরো প্রক্রিয়াটি এখনো গতি পায়নি। এক-দেড় মাস পরেই নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার কথা—তফসিলের আগেই যে পর্যায়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার কথা, সেটিও এখনো হয়নি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

স্বচ্ছ নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন

অনেকে বলছেন, এই মুহূর্তে দেশে স্বচ্ছ নির্বাচনের পরিবেশ নেই। তবে বিষয়টি এক কথায় নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। কারণ, নির্বাচনের পরিবেশ অনেকাংশে নির্ভর করে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের ভূমিকার ওপর। তারপরও বলা যায়, বর্তমান সময়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কিছুটা ভাঙন দেখা দিয়েছে। পুলিশসহ অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার কার্যক্রমে একধরনের নিষ্ক্রিয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই থানায় গিয়ে মামলা দিতে পারছেন না ভুক্তভোগীরা; বিচার প্রক্রিয়াও ধীর। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলার অবস্থা এখনো নির্বাচনের উপযোগী নয়।

অনেক দল এখনো নির্বাচন কমিশন বা সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে আলোচনা শুরুই করতে পারেনি। ফলে এখনো নিশ্চিত নয়, তারা নির্বাচনে অংশ নেবে কি নেবে না। অথচ এগুলোও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতির অংশ। তাই মনে হচ্ছে, মাত্র চার মাস বাকি থাকলেও পুরো প্রক্রিয়াটি এখনো গতি পায়নি। এক-দেড় মাস পরেই নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার কথা—তফসিলের আগেই যে পর্যায়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার কথা, সেটিও এখনো হয়নি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

বিগত সময়ে আমরা যেসব নির্বাচনকালীন বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেখেছি, সেখানে পরিস্থিতি এতটা শিথিল ছিল না। তখন প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়া হতো একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ও শৃঙ্খলার মধ্যে। সব রাজনৈতিক দলের জন্য ছিল একটি ‘লেভেল প্লেইং ফিল্ড’। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছিল তৎপর, শৃঙ্খলাবদ্ধ। কিন্তু এবার তেমন কোনো কঠোর তৎপরতা চোখে পড়ছে না।

এই কারণেই কিছুটা সংশয় থেকেই যায়। নির্বাচনের সময় পরিস্থিতি আরও অরাজক হয়ে উঠবে কি না, সেটি এখনো অনিশ্চিত। তবে এখনো সময় আছে। সরকার যদি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে, তা দেশের জন্য অবশ্যই শুভ লক্ষণ হবে।

ভোটারদের আগ্রহ ও স্বতঃস্ফূর্ততা

প্রায় ১৬-১৭ বছর পর মানুষ হয়তো আবার নিজের ইচ্ছায় ভোটকেন্দ্রে যাবেন, নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন। কিন্তু মানুষের মধ্যে নির্বাচনী উৎসাহ কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। অতীতে একতরফা নির্বাচন হওয়ায় জনগণের আগ্রহ কমে গিয়েছিল। বড় কোনো দল নির্বাচনে না থাকলে জনগণ ধরে নেয়, ফলাফল আগে থেকেই জানা। ফলে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের আগ্রহ হারিয়ে যায়।

এবারও যদি কিছু বড় দল, যেমন আওয়ামীলীগ, জাতীয় পার্টি বা অন্য কোনো প্রভাবশালী দল নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে, তাহলে অন্তত ২০ শতাংশ ভোটারও যদি মাঠে না আসে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনী উত্তেজনা ও উৎসাহ কমে যাবে। নির্বাচনের ফলাফল তখন অনেকের কাছেই ‘প্রেডিক্টটেবল’ হয়ে উঠবে—যেমনটা গত ১২ বছর ধরেও দেখা গেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতির চিত্র

আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি খুবই বৈচিত্র্যময়। জামায়াতে ইসলামী ইতিমধ্যে ৩০০ আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও এলাকায় তাদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। মহল্লায়-মহল্লায় তাদের প্রচারণা শুরু হয়ে গেছে।

অন্যদিকে, বিএনপি এখনো তেমন প্রস্তুতি নিতে পারেনি। মাঠপর্যায়ে তাদের কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয়তাও চোখে পড়ে না বললেই চলে। ফলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার যে চিত্র দেখা দরকার ছিল, সেটি এখনো অনুপস্থিত।

বিদ্যমান আইন দিয়েই যদি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা যায় এবং কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন কাজ করতে পারে, তাহলে স্বচ্ছ নির্বাচন সম্ভব। কিন্তু সরকার বা অন্য কোনো পক্ষ যদি প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে কখনোই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। তখন তা কেবল মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বদলানোর সমান হবে।

স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন দুটি বিষয়

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব? এর উত্তর দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে নিহিত।

প্রথমত, নির্বাচন কমিশনের দৃঢ়তা ও স্বাধীনতা। নির্বাচন কমিশনের শক্ত ভূমিকা থাকতে হবে। বলা হয়ে থাকে, ভাঙা দাঁত দিয়ে শক্ত জিনিস কামড়ানো যায় না। তাই নির্বাচন কমিশনকে হতে হবে বলিষ্ঠ, সাহসী ও নিরপেক্ষ।

দ্বিতীয়ত, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। তারা যেন কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন না করে, বরং প্রকৃত অর্থে ‘জনগণের সেবক’ হিসেবে কাজ করে।

জেলা প্রশাসক (ডিসি) যখন রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পান, তখন তিনি যেন কোনো দলের প্রতি পক্ষপাত না দেখান, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ ধরনের কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করতে হবে, যারা সত্যিকারের নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে সক্ষম।

বিদ্যমান আইন দিয়েই যদি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা যায় এবং কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন কাজ করতে পারে, তাহলে স্বচ্ছ নির্বাচন সম্ভব। কিন্তু সরকার বা অন্য কোনো পক্ষ যদি প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে কখনোই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। তখন তা কেবল মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বদলানোর সমান হবে।

দেশবাসীর প্রত্যাশা একটাই—একটি অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। এখন দেখার বিষয়, সরকার ও নির্বাচন কমিশন সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত এবং কতটা সক্ষমতা দেখাতে পারে। সময় অল্প, কিন্তু এখনো সুযোগ আছে।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত