leadT1ad

কেরানীগঞ্জে ধারাবাহিক অগ্নিকাণ্ড ও মানুষের নিরাপত্তা

জাহিরুল ইসলাম
জাহিরুল ইসলাম

প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৩: ৪৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে কেরানীগঞ্জের আগানগর ইউনিয়নের আমবাগিচা এলাকায় ভয়াবহ দুটি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। অনেকের হয়তো মনে আছে, গত বছরের নভেম্বরে আগুন লেগেছিল বাবুবাজার ব্রিজ সংলগ্ন একটি ভবনে— যেখানে ছিল জিন্সের প্যান্ট তৈরির কারখানা। আজ আগুন লাগলো একই ভবন থেকে স্বল্প দূরত্বে অবস্থিত একটি গ্যাস লাইটার কারখানায়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিটের প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনও জানা না গেলেও ক্ষতির পরিমাণ যে বড় হবে, তা সহজে অনুমেয়।

Ad 300x250

বলা বাহুল্য, কারখানায় অগ্নিকাণ্ড কেরানীগঞ্জে এখন ‘অস্বাভাবিক’ নয়। কেউ যদি গুগলে ‘কেরানীগঞ্জের কারখানায় আগুন’ লিখে সার্চ করেন, তাহলে তিনি বিস্মিত হবেন। তার কাছে স্পষ্ট হবে, কত ঘন ঘন অগ্নিকাণ্ড ঘটে এখানে। সব ঘটনা সংবাদমাধ্যমে আসে না। বড় ধরনের দুর্ঘটনাগুলো খবর হলেও ছোটখাটো আগুন লাগার ঘটনা অনেক সময়ই আড়ালে থেকে যায়। তবে এটা ঠিক, সেগুলোরও কোনো কোনোটিতে ঘটে প্রাণহানি; ক্ষতি হয় বিনিয়োগ করা অর্থের।

বুড়িগঙ্গার এপারে আগানগর ও জিনজিরা এলাকাকে অনেকেই কিন্তু অভিহিত করেন ‘দ্বিতীয় চায়না’ হিসেবে। কারণ রেডিমেড গার্মেন্টস থেকে শুরু করে দেশের বাজারে লভ্য প্রয়োজনীয় অনেক পণ্যসামগ্রী উৎপাদিত হয় এখানে। সেগুলো নিয়মিতভাবে সরবরাহ করা হয় সারা দেশে। পরিসংখ্যান বলছে, শুধু আগানগর ও জিনজিরা ইউনিয়নে রয়েছে প্রায় তিন হাজারের মতো গার্মেন্টস কারখানা। এগুলোয় কাজ করেন তিন থেকে পাঁচ লাখ মানুষ। আর এসব কারখানা ঘিরে গড়ে উঠেছে আরও প্রায় পাঁচ হাজার ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এখানে উৎপাদিত পণ্য তারা সরবরাহ করেন সারা দেশে। পরিসংখ্যান মতে, দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া রেডিমেড গার্মেন্টসের প্রায় সিংহভাগেরই সরবরাহ হয় এখান থেকে। ফলে এ অঞ্চল ঘিরে আবর্তিত হয় বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন ও জীবিকা।

সমস্যা হলো, এটি একটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। সরেজমিন পরিদর্শন করলে এখানে সরু গলি, অপ্রশস্ত রাস্তা চোখে পড়বে। এই এলাকায় এমনও গলি রয়েছে, যেখানে রিকশাও প্রবেশ করতে পারে না ঠিকমতো। প্রশ্ন ওঠে, তাহলে এখানে অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করবে কীভাবে? গতকালের ঘটনায়ও দেখেছি, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে মূল রাস্তা থেকে। বাস্তবতা হলো, এমন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আগুন লাগলে তা আশপাশের ভবনে ছড়িয়ে পড়াই স্বাভাবিক। ফলে একটি কারখানার লাগা আগুন মুহূর্তেই আশেপাশের আবাসিক ভবন, কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ফেলে ঝুঁকির মুখে। আগামীকালই যে এমনিভাবে আরেকটি ঝুঁকির উদ্ভব হবে না, তা কেউ বলতে পারি না। এ অবস্থায় অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিস যাতে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে, সেটি বিশেষ করে নিশ্চিত করা দরকার।

গতকাল যে কারখানায় আগুন লেগেছে— স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেল, এর আগেও সেখানে আগুন লেগেছিল একাধিকবার। প্রশাসন ও এলাকাবাসী নাকি চেষ্টা করেও কারখানাটি সরাতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে, কোন অদৃশ্য শক্তির ইশারা রয়েছে এর পেছনে? আশা করব, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এবার তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। গ্যাস লাইটার কারখানায় দাহ্য পদার্থ থাকে এবং আবাসিক এলাকায় এমন কারখানা থাকার মধ্যে বড় ঝুঁকি রয়েছে। এটি বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবু এতদিন কারখানাটি সেখানে রয়ে গেল কীভাবে, এ প্রশ্ন থেকেই যায়। কারখানাটি এতদিন ওখানে টিকে থাকার পেছনে প্রশাসনের কারও মদত রয়েছে কিনা, খতিয়ে দেখা দরকার সেটিও। জানা গেছে, আগুন লাগার পর মালিক পক্ষকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। আগের অগ্নিকাণ্ডগুলোয় মালিক পক্ষের কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা নেই। এবারও কি সেই ধারা অব্যাহত থাকবে? যদি থাকে, তাহলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়ানো কঠিন হবে।

এ নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত, অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছে পাঁচজন। কতজন দগ্ধ কিংবা হতাহত হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে এখনও জানা যায়নি। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পরে হয়তো এ ব্যাপারে ব্রিফ করা হবে। আশা করব, এ ঘটনায় আর কোনো প্রাণহানির খবর আসবে না। একটি প্রাণ চলে গেলে সেটি তো কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা যায় না। এতে যারা অগ্নিদগ্ধ কিংবা আহত হয়েছেন, তাদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

কেরানীগঞ্জের আগানগর ও জিনজিরা এলাকা দেশের অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এ কারণেও এলাকাটির সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। নীতিনির্ধারকদের কাছে অনুরোধ— এই এলাকায় দিন বিশেষ দৃষ্টি। ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনে সেগুলো নিরাপদ জায়গায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নিন।

আমরা দেখেছি, কিছুদিন আগে পদ্মায় বাস দুর্ঘটনার পর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এবার কী হবে, জানি না। তবে মনে রাখা দরকার, এমন ঘটনায় প্রাণহানির ক্ষেত্রে অর্থ সহায়তা কখনোই প্রকৃত সমাধান নয়। বরং এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এবং প্রাণহানি যাতে না ঘটে, সেই পদক্ষেপ নিতে হবে। মনে রাখা দরকার, কেরানীগঞ্জ এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে পরিচালিত হচ্ছে হাজারও কারখানা। হাজারও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং কয়েক লাখ শ্রমিক প্রতিনিয়ত কাজ করছে ঝুঁকির মধ্যে। এটা তো ঠিক, একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা গেলে শুধু একটি জীবনই যায় না; ধ্বংস হয়ে যায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিবারের ভবিষ্যৎ। এমন দুর্ঘটনায় আর কোনো পরিবারের ভবিষ্যৎ যাতে অন্ধকারাচ্ছন্ন না হয়, সেই নিশ্চয়তা আমরা চাইব রাষ্ট্রের কাছে।

কেরানীগঞ্জের আগানগর ও জিনজিরা এলাকা দেশের অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এ কারণেও এলাকাটির সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। নীতিনির্ধারকদের কাছে অনুরোধ— এই এলাকায় দিন বিশেষ দৃষ্টি। ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনে সেগুলো নিরাপদ জায়গায় স্থানান্তরের উদ্যোগ নিন। কারখানায় যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, কারখানা পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য প্রশস্ত রাস্তা, জরুরি নির্গমন পথ নিশ্চিত করতে জোরদার করুন তদারকি।

মনে রাখা দরকার, একটি কারখানা মালিকের বিনিয়োগ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আশপাশের ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগও সুরক্ষার দাবি রাখে। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের জীবন অমূল্য। তাই সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে জীবনের নিরাপত্তা। এখনই সময় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার— যাতে আগানগর, জিনজিরা, সর্বোপরি কেরানীগঞ্জের এই শিল্পাঞ্চল নিরাপদ হয়। শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ বাসিন্দা— সবার জীবন যেন সুরক্ষিত থাকে।

এ ধরনের দুর্ঘটনা ও করুণ মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে থাকলে এবং এর দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করা না হলে মানুষের মনে যেমন অনাস্থা তৈরি হবে, তেমনি ব্যবসার পরিবেশ সম্পর্কেও সংশ্লিষ্ট সবার কাছে ভুল বার্তা যাবে। দেশের ভাবমূর্তির জন্যও এসব ঘটনা নেতিবাচক। যেনতেনভাবে ব্যবসায়িক ও উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে দিলে দেশের অন্য স্থানেও সেটা অনুসরণের প্রবণতা গড়ে উঠতে পারে। অভিজ্ঞতা সেটাই বলে। শুরু থেকে সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করার সংস্কৃতি গড়ে তোলার আসলেই কোনো বিকল্প নেই।

  • জাহিরুল ইসলাম: ব্যাংকার
Ad 300x250Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত
leadT1ad

সম্পর্কিত

leadT1ad
leadT1ad