leadT1ad

ইশ…আমরা আরও একটি দেশ ধ্বংস করে ফেললাম

লেখা:
লেখা:
ডেভিড হার্স্ট

প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ২১: ১২
স্ট্রিম গ্রাফিক

ইরানের আকাশে ০৮ মার্চ থেকে কেবল কালো ধোঁয়া উড়ছে। তেলের শোধনাগারগুলো জ্বলছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে গড়িয়েছে। ঠিক এমন সময় শোনা যাচ্ছে, খোদ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা মহলের ভেতরেই এই যুদ্ধ নিয়ে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ শুরু হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে হামলার ঠিক আগে কী ঘটেছিল, তার অনেক অজানা তথ্য এখন সামনে আসছে।

ভুয়া গোয়েন্দা তথ্যের ফাঁদ

এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর পেছনে কোনো বাস্তব ভিত্তি ছিল না। পুরো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এমন গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে, যা পরে সম্পূর্ণ ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। এই ভুয়া ডসিয়ার বা নথির জন্মদাতা ছিলেন মোসাদের পরিচালক ডেভিড বার্নিয়া।

Ad 300x250

বার্নিয়া ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বুঝিয়েছিলেন, ইরানে মোসাদের নেটওয়ার্ক এতটাই শক্তিশালী যে আকাশপথে হামলা শুরু হলেই তারা ম্যাজিক দেখাতে পারবে। তারা ইরানের ভেতরের বিরোধী শক্তিগুলোকে উসকে দিয়ে সরকার পতন ঘটাতে পারবে। বার্নিয়ার এই আত্মবিশ্বাস প্রমাণ করে গত জানুয়ারিতে তেহরানে কী ঘটেছিল। তখন মুদ্রা ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ হঠাৎ সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয়। হাজার হাজার মানুষকে গুলি করে মারা হয়। এর পেছনে মোসাদের যে ষড়যন্ত্র ছিল, তা এখন আর গোপন নেই।

নেতানিয়াহু এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ওপর ভর করেই ট্রাম্পের কাছে যান। তিনি ট্রাম্পকে বোঝান, ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা এতটাই দুর্বল যে তাদের সরাতে কেবল শেষ ধাক্কা দরকার। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বার্নিয়ার এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। অতিবিশ্বাসী ট্রাম্প সহজেই সেই ফাঁদে পা দেন।

অসম যুদ্ধের হিসাব-নিকাশ

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। তাঁর ছেলে মোজতবা মারাত্মক আহত হন। ৪০ জনেরও বেশি শীর্ষ ইরানি জেনারেল প্রাণ হারান। কিন্তু হামলার এক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিয়েছে। প্রথম আঘাতের পরই ইরান পাল্টা হামলা শুরু করে এবং এরপর তারা এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি।

ইরান তাদের কথা রেখেছে। তারা ইসরায়েল ও মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তেলের ট্যাংকার এবং তেল ও গ্যাস শোধনাগারগুলো তাদের নিশানায় পরিণত হয়েছে। তারা হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ বাণিজ্য অচল হয়ে পড়েছে।

যুদ্ধের চার সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। ইরান এখনো অবিরাম ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রথম দিনের চেয়ে তাদের শক্তি বা সক্ষমতা কোনো অংশেই কম মনে হচ্ছে না। বিমান হামলায় ইরানের নৌবাহিনী, রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ড সেন্টার এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু তারা হাল ছাড়েনি।

ইরান ঠিক যেভাবে বলেছিল, তাদের জবাব ছিল সম্পূর্ণ ‘অসম’ বা অ্যাসিমেট্রিক। তারা খুব সফলভাবে এই যুদ্ধের সীমানা ছড়িয়ে দিয়েছে। এখন আর কারও পক্ষে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই।

ইতিহাসের ভয়াবহ পুনরাবৃত্তি

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু এমন যুদ্ধের জালে আটকে গেছেন, যেখান থেকে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০-এর দশকের শুরুতে জর্জ ডব্লিউ বুশ আফগানিস্তান ও ইরাকে যে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিলেন, তাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত ৪৭ লাখ মানুষ মারা যায়। ইরান যুদ্ধের পরিণতি এর চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। বিশেষ করে যদি স্থলপথে আগ্রাসন শুরু হয়, তবে মৃত্যুর মিছিল কোথায় গিয়ে থামবে, তা কেউ জানে না।

২০০৩ সালে বুশ ও টনি ব্লেয়ারের ইরাক আগ্রাসনের সঙ্গে আজকের ইরান যুদ্ধের এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। এই মিল খোঁজার জন্য আমি কথা বলেছিলাম মোহাম্মদ এলবারাদির সঙ্গে। তিনি টানা তিন মেয়াদে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান ছিলেন। সিআইএ এবং এমআই৬ যখন সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ভুয়া গল্প সাজাচ্ছিল, তখন তিনি এবং জাতিসংঘের প্রধান অস্ত্র পরিদর্শক হ্যান্স ব্লিক্স ইরাকের মাটিতেই ছিলেন।

এলবারাদি বলেন, ‘হ্যান্স ব্লিক্স এবং আমি প্রতারণার সাক্ষী হয়েছিলাম। আমরা ইরাকের মাঠে ঘুরেছি। সেখানে কোনো পারমাণবিক, রাসায়নিক বা জৈবিক অস্ত্রের অস্তিত্ব ছিল না। অথচ বুশ প্রশাসন নিরাপত্তা পরিষদে তাদের মিথ্যা ব্রিফিং চালিয়েই যাচ্ছিল।’

এলবারাদি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘তারা একটি দেশ ধ্বংস করে দিল। ওষুধ ও খাবারের অভাবে লাখ লাখ নিরীহ মানুষ মারা গেল। আর শেষে তারা বলল, “উফস, এখানে তো কিছুই নেই!” ট্রাম্পের কথার মধ্যেও সেই একই সুর শুনতে পাই। ট্রাম্প যখন বলেন ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে মাত্র দুই সপ্তাহ দূরে আছে, তখন আমি হতাশ হয়ে পড়ি। কারণ আমি জানি এর মানে কী। এর মানে হলো লাখ লাখ নিরীহ মানুষের মৃত্যু।’

আন্তর্জাতিক আইনের মৃত্যু

গত জুনের যুদ্ধের পর আইএইএ-র বর্তমান প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বলেছিলেন, ইরান কয়েক মাসের মধ্যেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তিনি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েছেন।

এলবারাদির মতে, বর্তমান বিশ্বে নিরপেক্ষ হওয়া খুব কঠিন। সবাই নিজের সুবিধামতো প্রমাণগুলোকে ব্যাখ্যা করতে চায়। তিনি বলেন, ‘গ্রোসি স্পষ্ট জানিয়েছেন সেখানে কোনো সুগঠিত অস্ত্র কর্মসূচি নেই। আইএইএ তার নিরপেক্ষতা হারায়নি। বরং নিরাপত্তা পরিষদই আজ সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে।’

একজন আন্তর্জাতিক আইনজীবী হিসেবে এলবারাদি ইরানের আলী লারিজানিকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। চলতি মাসেই ইসরায়েলি হামলায় লারিজানি নিহত হন। এলবারাদির মতে, লারিজানি ছিলেন একজন ভালো মানুষ এবং দারুণ মধ্যস্থতাকারী। কিন্তু আজকের দিনে গাজা বা ইরানের মতো জায়গাগুলোতে মধ্যস্থতাকারী, সাংবাদিক বা দার্শনিকদের হত্যা করা যেন যুদ্ধের এক স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে।

এলবারাদি বলেন, বুশ প্রশাসন অন্তত আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই দিয়ে তাদের আক্রমণের যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করত। কিন্তু ট্রাম্পের কাছে আন্তর্জাতিক আইনের কোনো দাম নেই। জাতিসংঘ তাঁর কাছে কেবল আড্ডার জায়গা। যুক্তরাষ্ট্র এখন আর শুধু কোনো জাতিকে ধ্বংসের চেষ্টা করছে না, তারা পুরো একটি অঞ্চলকে ধ্বংস করে নতুন করে সাজাতে চাইছে।

এলবারাদি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি পশ্চিমে পড়াশোনা করেছি। আমি বিশ্বাস করতাম পশ্চিমা গণতন্ত্রই সঠিক পথ। কিন্তু আজ যখন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) গাজায় গণহত্যার প্রমাণ পায় এবং ইসরায়েলি নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে, তখনো জার্মানির মতো পশ্চিমা দেশগুলো ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে যায়। পশ্চিমারা তাদের নৈতিক অবস্থান হারিয়েছে—এই সত্য এখন প্রমাণিত। গ্লোবাল সাউথ এখন বুঝতে পারছে, পশ্চিমা জোট তাদের বোকা বানিয়েছে। এখন তাদের নিজেদের সুরক্ষার পথ নিজেদেরই খুঁজতে হবে। পশ্চিমারা একসময় যে আন্তর্জাতিক আইন বা আদালত প্রতিষ্ঠা করেছিল, আজ তারাই সেগুলোকে ধ্বংস করতে চাইছে।’

এলবারাদির মতে, এই আক্রমণ কেবল বিচারব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকেও বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। তারা বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে লড়ছে। গাজা, ইরান বা ইউক্রেনের দিকে তাকালে আজ নিরাপত্তা পরিষদকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

এলবারাদি বলেন, ‘আপনি যখন নিয়মের তোয়াক্কা করেন না এবং মানুষকে হরেদরে সন্ত্রাসী আখ্যা দেন, তখন মানুষের মনে অবিচারের ক্ষোভ জাগে। তখন আপনি তাদের কাছে কী প্রত্যাশা করেন? তারা কি আপনার সঙ্গে বসে ওয়াইন খাবে?’

তবে তিনি বিশ্বাস করেন আরব বিশ্বে আবার বিপ্লব আসবে। আরব বসন্ত মরে যায়নি। মানুষ সমতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা চায়। ইতিহাস হয়তো ধীরে চলে, কিন্তু যখন মানুষের ভূমি কেড়ে নেওয়া হয় এবং গুলি চালানো হয়, তখন বিদ্রোহ অবধারিত।

ইউরোপের অন্ধত্ব এবং ভবিষ্যতের শঙ্কা

ইরাক যুদ্ধের পর বারাক ওবামা বলেছিলেন, ‘আমাদের শিখতে হবে কখন গুলি করতে হবে।’ এলবারাদি বলেন, এই উপলব্ধি অনেক দেরিতে এসেছে।

আজ এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আছেন, যিনি যুদ্ধে যাওয়ার আগে আলোচনার ভানটুকুও করেন না। তাঁর শাসনামলে আন্তর্জাতিক আইনের মৃত্যু হয়েছে। আলোচনা মানে এখন কেবল যুদ্ধের জন্য আরও অস্ত্র ও সেনা জড়ো করার সুযোগ।

এক দিন আমাদের এই পরিস্থিতির জন্য আফসোস করতে হবে। আমেরিকান সাম্রাজ্য যখন ভেঙে পড়বে, তখন ইউরোপের নিজেদের রক্ষার জন্য এই আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজন পড়বে। কারণ তাদের নিজস্ব কোনো সামরিক শক্তি নেই। গাজা, লেবানন এবং ইরান ইস্যুতে নিজেদের অপ্রাসঙ্গিক করার মাশুল ইউরোপকে দিতেই হবে।

ভবিষ্যতে শত্রুরা যখন আমাদেরই তৈরি করা যুদ্ধের নিয়ম প্রয়োগ করবে, তখন আমরা কার কাছে যাব? যখন তারা আমাদের সাংবাদিক, মধ্যস্থতাকারী এবং হাসপাতালগুলোতে বোমা ফেলবে, তখন আমাদের রক্ষার কেউ থাকবে না।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু এখন দুই দিক থেকেই আগুন জ্বালাচ্ছেন। যখন তাঁদের এই শাসনের অবসান ঘটবে, তখন এই আগুনে সবার হাতই পুড়বে।

লেখক: মিডল ইস্ট আই-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং এডিটর-ইন-চিফ।

Ad 300x250Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত
leadT1ad

সম্পর্কিত

leadT1ad
leadT1ad