মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু স্বাস্থ্য উদ্ভাবন রয়েছে, যেগুলো শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতিই ঘটায়নি, বরং কোটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়ে পৃথিবীর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দিয়েছে। কখনো একটি টিকার আবিষ্কার মহামারি থামিয়েছে, তো কখনো একটি সহজ চিকিৎসা পদ্ধতি লাখো মানুষের মৃত্যুর ঝুঁকি কমিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি উদ্ভাবন হলো ভ্যাকসিন এবং স্যালাইন বা ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপি (ওআরএস)। এই দুটি উদ্ভাবন স্বাস্থ্যখাতকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে যে আজও এগুলো মানবকল্যাণের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।
এছাড়াও অ্যান্টিবায়োটিক, টিকাদান কর্মসূচি এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন এসবের ফলে কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে। একসময় হাম, পোলিও, ডায়রিয়া কিংবা কলেরার মতো রোগে লাখ লাখ মানুষ মারা যেত। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার স্বাস্থ্যখাতকে আমূল বদলে দিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা ও গবেষকদের গবেষণা এই পরিবর্তনের প্রমাণ তুলে ধরেছে।
পেনিসিলিন আবিষ্কারক আলেকজান্ডার ফ্লেমিং। ছবি: ব্রিটানিকা
পেনিসিলিন
পেনিসিলিনের আবিষ্কার আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বিশাল মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। এটি মানুষের জীবন বাঁচানোর ধারণাকেই বদলে দিয়েছে।
১৯২৮ সালে স্কটিশ বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্লেমিং লন্ডনের সেন্ট ম্যারি হাসপাতালের ল্যাবে এক ধরনের ‘ছাঁচ’ থেকে এই অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা প্রথম লক্ষ্য করেন। তিনি দেখেন, পেনিসিলিয়াম নামের ছাঁচ ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে পারে। এই আবিষ্কারই পরবর্তীতে ‘পেনিসিলিন’ নামে পরিচিত হয়।
শুরুতে এটি শুধু একটি ল্যাব পর্যবেক্ষণ ছিল, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি গণহারে উৎপাদন শুরু হলে চিকিৎসাক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটে। পেনিসিলিন আবিষ্কারের আগে নিউমোনিয়া, সিফিলিস, গ্যাংগ্রিন, এমনকি ছোটখাটো সংক্রমণও প্রাণঘাতী হতে পারত। পেনিসিলিন আসার পর ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ চিকিৎসাযোগ্য হয়ে ওঠে। মৃত্যুহার নাটকীয়ভাবে কমে যায় এবং হাসপাতালের চিকিৎসা পদ্ধতি আমূল বদলে যায়।
ভ্যাকসিন আবিষ্কারকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
ভ্যাকসিন
ভ্যাকসিন আবিষ্কারকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি বলা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা গেছে, টিকাদান কর্মসূচির ফলে শিশু মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে হাম, পোলিও ও ডিপথেরিয়ার মতো মারাত্মক রোগ নিয়ন্ত্রণে ভ্যাকসিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
১৭৯৬ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার প্রথম গুটিবসন্তের জন্য টিকা আবিষ্কার করেন। তখন গুটিবসন্ত ছিল সবচেয়ে মারাত্মক রোগ। প্রতি বছর লাখো মানুষ এই রোগে মারা যেত। ধীরে ধীরে টিকার ব্যবহার সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৯০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়, গুটিবসন্ত বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে। এটি মানবসভ্যতার জন্য এক ঐতিহাসিক অর্জন।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, রোটাভাইরাস টিকার মাধ্যমে ২০০৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ লাখ ৩৯0 হাজার শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। ইন্টারন্যাশনার জার্নাল অব ইনফেক্টিয়াস ডিজিজে প্রকাশিত এক গবেষণায় গবেষক অ্যান্ড্রু ক্লার্ক ও তার সহকর্মীরা বলেন, ভ্যাকসিন ব্যবহারের মাধ্যমে শিশুদের ডায়রিয়াজনিত মৃত্যুর একটি বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
পোলিও নির্মূল কর্মসূচিও ভ্যাকসিনের সফলতার আরেকটি বড় উদাহরণ। ১৯৮৮ সালে বিশ্বজুড়ে পোলিও আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে তিন লাখ। কিন্তু ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচির ফলে আজ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ পোলিওমুক্ত। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
সাম্প্রতিক সময়েও ভ্যাকসিন মানবজাতিকে বড় সংকট থেকে রক্ষা করেছে। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া কোভিড-১৯ মহামারির সময় দ্রুত টিকা উদ্ভাবন এবং বিশ্বব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি লাখো মানুষের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেছে। ফলে ভ্যাকসিনকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদ্ধতি হিসেবে ধরা হয়।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে শিশু জন্মের পর পরই হাম, পোলিও, টিটেনাস, ডিপথেরিয়া, হেপাটাইটিস বির মতো প্রাণঘাতী রোগের টিকা দেওয়া হয়, যাতে ভবিষ্যতের মারাত্মক রোগ থেকে শিশু সুরক্ষা পায়।
ভ্যাকসিন শুধু ব্যক্তিকে নয়, বরং পুরো সমাজকে সুরক্ষা দেয়। যখন একটি দেশের অধিকাংশ মানুষ টিকা নেয়, তখন সংক্রমণের বিস্তার কমে যায়, যাকে বলা হয় হার্ড ইমিউনিটি।
স্বাস্থ্যখাতের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর একটি হলো ওরাল স্যালাইন। ছবি: সংগৃহীত
ওরাল স্যালাইন
স্বাস্থ্যখাতের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর একটি হলো ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপি বা ওরাল স্যালাইন (ওআরএস)। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ডায়রিয়া ও কলেরা রোগে পানিশূন্যতার কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হতো।
গবেষণায় দেখা যায়, গ্লুকোজ ও লবণের সঠিক অনুপাতে তৈরি এই দ্রবণ শরীরের পানিশূন্যতা দ্রুত পূরণ করতে পারে। এই আবিষ্কার চিকিৎসাব্যবস্থাকে সহজ করে দেয়। কারণ আগে পানিশূন্যতা দূর করতে শিরায় স্যালাইন দিতে হতো, যা সব জায়গায় সম্ভব ছিল না।
এই উদ্ভাবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত কয়েকজন বিজ্ঞানীর নাম ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ভারতীয় শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ দিলীপ মহালানাবিশ, যিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে মহামারির সময় ওরাল স্যালাইনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে চালু করেন। সেই সময় সীমিত চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করে অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়।
পরবর্তী সময়ে এই পদ্ধতিকে ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি দেয়। তারা এটিকে ডায়রিয়া প্রতিরোধে এক যুগান্তকারী ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে ঘোষণা করে।
বিশ্বখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী দ্য ল্যানসেট ওরাল স্যালাইনকে বিংশ শতকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা আবিষ্কারগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে। কারণ এটি অত্যন্ত সহজ ও সস্তা চিকিৎসা পদ্ধতি হয়েও কোটি কোটি মানুষের প্রাণ রক্ষা করেছে।
২০০০ সালে প্রকাশিত জার্নাল বুলেটিন অব ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগ্যানাইজেনে গবেষক সি জি ভিক্টোরার বলেন, ১৯৮০ সালে ডায়রিয়ায় বিশ্বে শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এবং বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন শিশু মারা যেত। কিন্তু ওরাল স্যালাইন ও ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ফলে এই মৃত্যুহার দ্রুত কমতে শুরু করে।
অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, ওরাল স্যালাইন ব্যবহারের পর বহু দেশে ডায়রিয়াজনিত শিশুমৃত্যু ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
স্যালাইন গবেষণায় বাংলাদেশি গবেষকদের ভূমিকা
ওরাল স্যালাইনের উন্নয়ন ও জনপ্রিয়করণে বাংলাদেশের গবেষকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ঢাকার আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর,বি) গবেষণা ও পরীক্ষার মাধ্যমে স্যালাইনের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়।
১৯৬৮ সালে বাংলাদেশে কলেরা রোগীদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, সঠিকভাবে তৈরি করা ওরাল স্যালাইন পানিশূন্যতা দ্রুত কমাতে পারে এবং মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়।
এই গবেষণার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্যালাইন ব্যবহারের কর্মসূচি চালু করে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ডায়রিয়ার চিকিৎসায় এটি প্রথম সারির চিকিৎসা পদ্ধতি।
জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি ও টিকাদান
শুধু আবিষ্কারই নয়, জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিও স্বাস্থ্যখাতকে বদলে দিয়েছে। যেমন, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি, নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, টিকাদান কর্মসূচি, স্যানিটেশন এবং স্যালাইন ব্যবহারের সমন্বিত প্রয়োগ শিশু মৃত্যুহার কমাতে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই তিনটি উদ্যোগ টিকাদান, ওরাল স্যালাইন, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বিশ্বজুড়ে শিশুস্বাস্থ্যের উন্নতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে।
আধুনিক ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তি চিকিৎসাব্যবস্থা বদলে দিয়েছে। ছবি: উইকিপিডিয়া
আধুনিক চিকিৎসায় প্রযুক্তির ব্যবহার
স্বাস্থ্যখাতে বিপ্লব ঘটিয়েছে আরও কিছু প্রযুক্তি ও আবিষ্কার। এর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিবায়োটিক, আধুনিক ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তি, উন্নত সার্জারি এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা। অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের ফলে নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা ও বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে ভ্যাকসিন ও স্যালাইনের মতো সহজ প্রযুক্তি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য করেছে।
ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যখাতের বড় পরিবর্তন আসবে নতুন ভ্যাকসিন, জেনেটিক চিকিৎসা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার মাধ্যমে।
তবে ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন অনেক সময় আসে খুব সহজ কোনো সমাধান থেকে। যেমন, একটি ছোট্ট স্যালাইনের প্যাকেট বা একটি টিকা কোটি মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।
ভ্যাকসিন ও ওরাল স্যালাইন শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের আবিষ্কার নয়, মানবসভ্যতার বড় অর্জন। এগুলো প্রমাণ করেছে, বিজ্ঞান, গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করলে বড় বড় স্বাস্থ্য সমস্যাও সমাধান করা সম্ভব।
আজকের পৃথিবীতে শিশু মৃত্যুহার কমার পেছনে যে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে, তার মধ্যে ভ্যাকসিন ও স্যালাইন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা বলছে, এসব উদ্ভাবন না হলে আজও লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিরোধযোগ্য রোগে মারা যেত।