ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ

বাংলাদেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রবণতা দৃশ্যমান হচ্ছে, তা এই উদ্বেগকে এক গভীর ও জটিল সংকটে রূপ দিচ্ছে। শিশুদের ছবি ব্যবহার করে তাদের নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ, কুরুচিপূর্ণ ও বিকৃত আলোচনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি ক্রমশ সংগঠিত, বিস্তৃত এবং বিপজ্জনক এক ডিজিটাল বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।
ঢাকা স্ট্রিম-এর সাম্প্রতিক অনুসন্ধান এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। হাজার হাজার সদস্যের ফেসবুক গ্রুপে অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাশিশুদের ছবি পোস্ট করে তাদের নিয়ে প্রকাশ্যেই মন্তব্য করা হচ্ছে, প্রশ্ন তোলা হচ্ছে তাদের ‘যোগ্যতা’ নিয়ে, এমনকি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আলোচনা চলছে নির্দ্বিধায়।
এই গ্রুপগুলোর বড় অংশই গত দুই বছরের মধ্যে তৈরি হয়েছে—যা প্রমাণ করে, সমস্যাটি কেবল বিদ্যমান নয়, দ্রুত বিস্তারও লাভ করছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব গ্রুপে অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ এই আচরণকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিচ্ছে, এমনকি উৎসাহও দিচ্ছে।
এই বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—অনলাইনে যে বিকৃত চর্চা চলছে, তা কি কেবল ভার্চুয়াল জগতে সীমাবদ্ধ, নাকি এর সরাসরি প্রতিফলন ঘটছে বাস্তব জীবনে?
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের যে ঘটনাগুলো সামনে এসেছে, সেগুলো এই প্রশ্নকে আরও তীব্র করে তোলে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সাত বছরের এক শিশুর ওপর নির্মম হামলা কিংবা ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে বিভিন্ন জেলায় শিশুদের ওপর সংঘটিত সহিংসতার ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের ঘটনা প্রায় ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শত শত শিশু এর শিকার হয়েছে। ইউনিসেফও বাংলাদেশে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার উদ্বেগজনক বৃদ্ধির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অনলাইন গ্রুপগুলো কেবল একটি প্ল্যাটফর্ম নয়; বরং এটি এক ধরনের মানসিক ও সামাজিক “ইকোসিস্টেম”, যেখানে বিকৃত চিন্তা শুধু প্রকাশ পায় না, বরং স্বীকৃতি ও উৎসাহও পায়।
ঢাকা স্ট্রিম-এর প্রতিবেদনে ইউএস-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক রুবিনা হোসেন যথার্থই বলেছেন, মানুষের মধ্যে থাকা অন্ধকার প্রবণতাগুলো যখন সমমনা গোষ্ঠীর মধ্যে জায়গা পায়, তখন তা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন উল্লেখ করেছেন, এই ধরনের প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ পেডোফিলিক প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে তা বাস্তব জীবনের অপরাধে রূপ নিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। প্ল্যাটফর্মগুলো নিজেদের কেবল ‘মাধ্যম’ হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে তারা এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে অ্যালগরিদম, গ্রুপ রিকমেন্ডেশন এবং কমিউনিটি গঠনের মাধ্যমে এই ধরনের কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
একটি গ্রুপ বন্ধ করা হলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আরেকটি নতুন গ্রুপ তৈরি হয়ে যায়। এতে স্পষ্ট হয়, কেবল প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত ও নীতিগত পরিবর্তন।
এই ধরনের বিকৃত চিন্তা যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা ধীরে ধীরে সমাজে শিশুদের প্রতি সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলবে। অনলাইন ও অফলাইনের সীমারেখা ক্রমশ মুছে যাবে। আরও বেশি শিশু নির্যাতনের শিকার হবে, অপরাধের হার বাড়বে, এবং একটি পুরো প্রজন্ম মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে উঠবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক কাঠামোর ভেতরে আস্থার সংকট তৈরি হবে।
এর চেয়েও গভীর একটি দিক রয়েছে। একটি সমাজ যখন তার সবচেয়ে অসহায় সদস্যদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই সমাজের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই নৈতিক অবক্ষয় দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা, সহিংসতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।
অন্যায় যখন সীমা অতিক্রম করে, তখন তার একটি প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এটি ইতিহাসের বহু উদাহরণেই প্রতিফলিত। কোনো সমাজ যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই সমাজ নানা সংকটের মুখোমুখি হয়। তা হতে পারে মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ভূমিকম্প বা বন্যা, কিংবা গভীর সামাজিক অস্থিরতা।
এগুলোকে কেবল কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু প্রতীকী অর্থে এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি অসুস্থ সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজের জন্য সংকট তৈরি করে। যখন ন্যায়বিচার দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন বিশৃঙ্খলা তার জায়গা নেয়, এবং সেই বিশৃঙ্খলার মূল্য দিতে হয় পুরো সমাজকেই।
তবে এই সংকট কেবল বাংলাদেশের নয়; এটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। যুক্তরাজ্যে ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশন, যুক্তরাষ্ট্রে ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়েটেড চিলড্রেন ও সেক্স অফেন্ডার রেজিস্ট্রি, এবং অস্ট্রেলিয়ার ই-সেফটি কমিশনার—এসব উদ্যোগ দেখিয়েছে যে শক্তিশালী আইন, প্রযুক্তিগত নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করলে এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে বাংলাদেশ অনেক কিছু শিখতে পারে। প্রথমত, আইনি কাঠামোকে আধুনিক ও স্পষ্ট করতে হবে, যাতে অনলাইনেই এই ধরনের বিকৃত চর্চা শুরু হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা যায়। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে—বিশেষ করে স্থানীয় প্রেক্ষাপটে দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা এই ধরনের নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও ভেঙে দিতে পারে। একই সঙ্গে, সমাজের ভেতরে সচেতনতা বাড়ানো এবং শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সমস্যাকে কেবল আইন বা প্রযুক্তির সীমার মধ্যে রাখা যাবে না। এটি একটি গভীর সামাজিক ও নৈতিক সংকট। যখন একটি সমাজে শিশুদের নিয়ে বিকৃত আলোচনা প্রকাশ্যে স্বীকৃতি পেতে শুরু করে, তখন তা সেই সমাজের মূল্যবোধের গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্র, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ—তিন পক্ষকেই একযোগে দায়িত্ব নিতে হবে।
শিশুদের নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক অধিকার। এই অধিকার রক্ষায় আমরা ব্যর্থ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একটি প্রজন্ম নয়; বিপন্ন হয়ে পড়বে আমাদের সমগ্র সমাজ ও ভবিষ্যতের ভিত্তি। এখন প্রশ্নটি আর সমস্যার অস্তিত্ব নিয়ে নয়; প্রশ্নটি হলো—আমরা কত দ্রুত এবং কতটা দৃঢ়ভাবে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি।
ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; আহ্বায়ক, ওয়েলবিয়িং-ফার্স্ট ইনিশিয়েটিভ, বাংলাদেশ।

বাংলাদেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রবণতা দৃশ্যমান হচ্ছে, তা এই উদ্বেগকে এক গভীর ও জটিল সংকটে রূপ দিচ্ছে। শিশুদের ছবি ব্যবহার করে তাদের নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ, কুরুচিপূর্ণ ও বিকৃত আলোচনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি ক্রমশ সংগঠিত, বিস্তৃত এবং বিপজ্জনক এক ডিজিটাল বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।
ঢাকা স্ট্রিম-এর সাম্প্রতিক অনুসন্ধান এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। হাজার হাজার সদস্যের ফেসবুক গ্রুপে অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাশিশুদের ছবি পোস্ট করে তাদের নিয়ে প্রকাশ্যেই মন্তব্য করা হচ্ছে, প্রশ্ন তোলা হচ্ছে তাদের ‘যোগ্যতা’ নিয়ে, এমনকি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আলোচনা চলছে নির্দ্বিধায়।
এই গ্রুপগুলোর বড় অংশই গত দুই বছরের মধ্যে তৈরি হয়েছে—যা প্রমাণ করে, সমস্যাটি কেবল বিদ্যমান নয়, দ্রুত বিস্তারও লাভ করছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব গ্রুপে অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ এই আচরণকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিচ্ছে, এমনকি উৎসাহও দিচ্ছে।
এই বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—অনলাইনে যে বিকৃত চর্চা চলছে, তা কি কেবল ভার্চুয়াল জগতে সীমাবদ্ধ, নাকি এর সরাসরি প্রতিফলন ঘটছে বাস্তব জীবনে?
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের যে ঘটনাগুলো সামনে এসেছে, সেগুলো এই প্রশ্নকে আরও তীব্র করে তোলে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সাত বছরের এক শিশুর ওপর নির্মম হামলা কিংবা ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে বিভিন্ন জেলায় শিশুদের ওপর সংঘটিত সহিংসতার ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের ঘটনা প্রায় ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শত শত শিশু এর শিকার হয়েছে। ইউনিসেফও বাংলাদেশে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার উদ্বেগজনক বৃদ্ধির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অনলাইন গ্রুপগুলো কেবল একটি প্ল্যাটফর্ম নয়; বরং এটি এক ধরনের মানসিক ও সামাজিক “ইকোসিস্টেম”, যেখানে বিকৃত চিন্তা শুধু প্রকাশ পায় না, বরং স্বীকৃতি ও উৎসাহও পায়।
ঢাকা স্ট্রিম-এর প্রতিবেদনে ইউএস-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক রুবিনা হোসেন যথার্থই বলেছেন, মানুষের মধ্যে থাকা অন্ধকার প্রবণতাগুলো যখন সমমনা গোষ্ঠীর মধ্যে জায়গা পায়, তখন তা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন উল্লেখ করেছেন, এই ধরনের প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ পেডোফিলিক প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে তা বাস্তব জীবনের অপরাধে রূপ নিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। প্ল্যাটফর্মগুলো নিজেদের কেবল ‘মাধ্যম’ হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে তারা এমন এক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে অ্যালগরিদম, গ্রুপ রিকমেন্ডেশন এবং কমিউনিটি গঠনের মাধ্যমে এই ধরনের কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
একটি গ্রুপ বন্ধ করা হলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আরেকটি নতুন গ্রুপ তৈরি হয়ে যায়। এতে স্পষ্ট হয়, কেবল প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত ও নীতিগত পরিবর্তন।
এই ধরনের বিকৃত চিন্তা যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা ধীরে ধীরে সমাজে শিশুদের প্রতি সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলবে। অনলাইন ও অফলাইনের সীমারেখা ক্রমশ মুছে যাবে। আরও বেশি শিশু নির্যাতনের শিকার হবে, অপরাধের হার বাড়বে, এবং একটি পুরো প্রজন্ম মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে উঠবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক কাঠামোর ভেতরে আস্থার সংকট তৈরি হবে।
এর চেয়েও গভীর একটি দিক রয়েছে। একটি সমাজ যখন তার সবচেয়ে অসহায় সদস্যদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই সমাজের নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই নৈতিক অবক্ষয় দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতা, সহিংসতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।
অন্যায় যখন সীমা অতিক্রম করে, তখন তার একটি প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এটি ইতিহাসের বহু উদাহরণেই প্রতিফলিত। কোনো সমাজ যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই সমাজ নানা সংকটের মুখোমুখি হয়। তা হতে পারে মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ভূমিকম্প বা বন্যা, কিংবা গভীর সামাজিক অস্থিরতা।
এগুলোকে কেবল কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু প্রতীকী অর্থে এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি অসুস্থ সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজের জন্য সংকট তৈরি করে। যখন ন্যায়বিচার দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন বিশৃঙ্খলা তার জায়গা নেয়, এবং সেই বিশৃঙ্খলার মূল্য দিতে হয় পুরো সমাজকেই।
তবে এই সংকট কেবল বাংলাদেশের নয়; এটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। যুক্তরাজ্যে ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশন, যুক্তরাষ্ট্রে ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়েটেড চিলড্রেন ও সেক্স অফেন্ডার রেজিস্ট্রি, এবং অস্ট্রেলিয়ার ই-সেফটি কমিশনার—এসব উদ্যোগ দেখিয়েছে যে শক্তিশালী আইন, প্রযুক্তিগত নজরদারি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করলে এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে বাংলাদেশ অনেক কিছু শিখতে পারে। প্রথমত, আইনি কাঠামোকে আধুনিক ও স্পষ্ট করতে হবে, যাতে অনলাইনেই এই ধরনের বিকৃত চর্চা শুরু হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা যায়। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে—বিশেষ করে স্থানীয় প্রেক্ষাপটে দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা এই ধরনের নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও ভেঙে দিতে পারে। একই সঙ্গে, সমাজের ভেতরে সচেতনতা বাড়ানো এবং শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সমস্যাকে কেবল আইন বা প্রযুক্তির সীমার মধ্যে রাখা যাবে না। এটি একটি গভীর সামাজিক ও নৈতিক সংকট। যখন একটি সমাজে শিশুদের নিয়ে বিকৃত আলোচনা প্রকাশ্যে স্বীকৃতি পেতে শুরু করে, তখন তা সেই সমাজের মূল্যবোধের গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্র, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ—তিন পক্ষকেই একযোগে দায়িত্ব নিতে হবে।
শিশুদের নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি মৌলিক অধিকার। এই অধিকার রক্ষায় আমরা ব্যর্থ হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একটি প্রজন্ম নয়; বিপন্ন হয়ে পড়বে আমাদের সমগ্র সমাজ ও ভবিষ্যতের ভিত্তি। এখন প্রশ্নটি আর সমস্যার অস্তিত্ব নিয়ে নয়; প্রশ্নটি হলো—আমরা কত দ্রুত এবং কতটা দৃঢ়ভাবে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি।
ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; আহ্বায়ক, ওয়েলবিয়িং-ফার্স্ট ইনিশিয়েটিভ, বাংলাদেশ।

বিশ্ব রাজনীতি কখনো কখনো ব্যক্তির হাতে বন্দি হয়ে পড়ে। তখন নীতি হারায়; প্রাধান্য পায় মেজাজ। প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়; ব্যক্তিত্ব ফুলে ওঠে। এই বাস্তবতা নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও নগ্নভাবে সামনে এসেছে।
৬ ঘণ্টা আগে
একুশ শতকের তৃতীয় দশকে বিশ্বরাজনীতি এক অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের অস্ত্রের ভান্ডার ও অর্থনীতিকে বিসর্জন দিচ্ছে। একদিকে কামানের গর্জন আর ক্ষেপণাস্ত্রের ঝিলিক যখন পরাশক্তিগুলোকে যুদ্ধের চোরাবালিতে নিমজ্জিত করছে, ঠিক তখনই হয়তো বেইজিংয়
১৪ ঘণ্টা আগে
আমরা এখন পারস্য উপসাগরের নীল জলে। কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশ মিলিটারি কনটিনজেন্টের একদল সামরিক কর্মকর্তা ফেরিতে করে কুয়েত থেকে ২০ কিলোমিটার দূরবর্তী ফাইলাকা দ্বীপে ভ্রমণে চলেছি। ২০১০-এর জানুয়ারি। আমাদের পূর্ব দিকে ইরান। সেই দেশ থেকে উড়ে এসে একদল সাদা সীগাল আমাদের স্বাগত জানায়।
১ দিন আগে
‘সত্যেন’ নামের আক্ষরিক অর্থ—সত্যের প্রতি নিষ্ঠাবান ব্যক্তি; যিনি সত্যকে ধারণ করেন কিংবা যাঁর কাছে সত্যই পরম আরাধ্য। আমাদের সত্যেন সেন তাঁর নামের এই আক্ষরিক অর্থের এক জীবন্ত ও মূর্ত উদাহরণ।
২ দিন আগে