আব্দুল লতিফ মাসুম

রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ৫ আগস্টের পরবর্তী পরিবর্তিত বাংলাদেশে এই নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি ভেঙে পড়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠনের অগ্নিপরীক্ষা। আমরা একই সঙ্গে প্রবল আশা এবং গভীর আশঙ্কার এক দোলাচলে দাঁড়িয়ে আছি। একদিকে দীর্ঘ দেড় দশক পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাওয়ার উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চিরাচরিত ‘সহিংসতা’ ও ‘কেন্দ্র দখলের’ প্রেতচ্ছায়া—এই দুইয়ের মাঝেই আগামীর বাংলাদেশ লুকায়িত।
অতীতের শিক্ষা ও বর্তমানের ভিন্নতা
গত দেড় দশকে জাতি ‘ভোটারবিহীন’, ‘নিশিরাত’ এবং ‘ডামি নির্বাচনের’ যে করুণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য এই নির্বাচনটি একটি মাইলফলক। স্বকীয়তা ও তাৎপর্যের বিচারে এটি অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে যাওয়ার দাবি রাখে। এবারের নির্বাচনটির রাজনৈতিক মানচিত্র বেশ কৌতূহলউদ্দীপক। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে শুরুতে মনে হয়েছিল এটি বিএনপির জন্য ‘ওয়াকওভার’ হতে যাচ্ছে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর অভাবনীয় পুনরুত্থান ও ১১ দলীয় জোটের সক্রিয়তা মাঠকে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে। গণতন্ত্রের সুস্বাস্থ্যের জন্য এই দ্বিমুখী বা ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইতিবাচক; কারণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনতা কেবল একনায়কতন্ত্রকেই পুষ্ট করে।
আস্থার সংকট ও প্রশাসনের ভূমিকা
বাংলাদেশের নির্বাচনের চিরস্থায়ী রোগ হলো ‘পারস্পরিক আস্থার সংকট’। এই সংকট নিরসনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) যে ভূমিকা রাখার কথা ছিল, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েই গেছে। নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের ভূরি ভূরি অভিযোগ উঠলেও কমিশনের ‘ধীরে চলো’ নীতি তাদের সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শতভাগ নিখুঁত নির্বাচন হয়তো আমাদের এই ভঙ্গুর রাজনৈতিক বাস্তবতায় কঠিন, তবে ন্যূনতম ৬০ শতাংশ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারাটাই হবে বর্তমান কমিশনের বড় সাফল্য।
সবচেয়ে আশঙ্কার জায়গাটি হলো মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা। প্রশাসনের একাংশের মধ্যে ‘তেল দেওয়ার’ বা ‘তোষামোদির’ এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক কর্মকর্তা ধরেই নিয়েছেন অমুক দল ক্ষমতায় আসছে, আর সেই হিসেবে তাঁরা আগাম আনুগত্য প্রকাশের খেলায় মেতেছেন। এর চেয়েও বিপজ্জনক হলো ‘ট্যাগিং কালচার’। কোনো কর্মকর্তার পেশাদার সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলেই তাঁকে ‘জামায়াত’ বা ‘বিএনপি’ তকমা দিয়ে কোণঠাসা করার যে প্রবণতা, তা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য আত্মঘাতী।
অপপ্রচার ও ভূ-রাজনীতির ধোঁয়াশা
এবারের নির্বাচনে ‘ভুয়া ন্যারেটিভ’ বা অপপ্রচারের প্লাবন দেখা যাচ্ছে। ‘দেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে’ কিংবা ‘অমুক দেশ অমুককে সমর্থন দিচ্ছে’—এমন সব ভিত্তিহীন তথ্য সাধারণ ভোটারদের বিভ্রান্ত করছে। এই গুজবগুলো কেবল নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করে না, বরং সামাজিক বিভেদকেও উসকে দেয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই অপপ্রচার রুখতে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল।
নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা
আশার কথা হলো, এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ‘উৎসবমুখর’ পরিবেশ মানে কেবল মারামারি না হওয়া নয়, বরং প্রতিটি ভোটারের কেন্দ্রে যাওয়ার নিরাপত্তা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটা।
আগামীকালের নির্বাচনে কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি উদাত্ত আহ্বান থাকবে—আপনারা ‘সর্বাত্মক নিরপেক্ষতা’ বজায় রাখুন। মনে রাখবেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে যদি জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত না হয়, তবে এই নির্বাচনের ফলাফল দীর্ঘমেয়াদে দেশ ও জাতিকে আবারও এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আগামীর বাংলাদেশ যেন এই ব্যালট বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সঠিক ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের হাতে সুরক্ষিত থাকে—এটাই এখন জনগণের প্রার্থনা।
লেখক: অধ্যাপক (অব.), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ৫ আগস্টের পরবর্তী পরিবর্তিত বাংলাদেশে এই নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং একটি ভেঙে পড়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠনের অগ্নিপরীক্ষা। আমরা একই সঙ্গে প্রবল আশা এবং গভীর আশঙ্কার এক দোলাচলে দাঁড়িয়ে আছি। একদিকে দীর্ঘ দেড় দশক পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাওয়ার উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চিরাচরিত ‘সহিংসতা’ ও ‘কেন্দ্র দখলের’ প্রেতচ্ছায়া—এই দুইয়ের মাঝেই আগামীর বাংলাদেশ লুকায়িত।
অতীতের শিক্ষা ও বর্তমানের ভিন্নতা
গত দেড় দশকে জাতি ‘ভোটারবিহীন’, ‘নিশিরাত’ এবং ‘ডামি নির্বাচনের’ যে করুণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য এই নির্বাচনটি একটি মাইলফলক। স্বকীয়তা ও তাৎপর্যের বিচারে এটি অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে যাওয়ার দাবি রাখে। এবারের নির্বাচনটির রাজনৈতিক মানচিত্র বেশ কৌতূহলউদ্দীপক। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে শুরুতে মনে হয়েছিল এটি বিএনপির জন্য ‘ওয়াকওভার’ হতে যাচ্ছে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর অভাবনীয় পুনরুত্থান ও ১১ দলীয় জোটের সক্রিয়তা মাঠকে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে। গণতন্ত্রের সুস্বাস্থ্যের জন্য এই দ্বিমুখী বা ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইতিবাচক; কারণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনতা কেবল একনায়কতন্ত্রকেই পুষ্ট করে।
আস্থার সংকট ও প্রশাসনের ভূমিকা
বাংলাদেশের নির্বাচনের চিরস্থায়ী রোগ হলো ‘পারস্পরিক আস্থার সংকট’। এই সংকট নিরসনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) যে ভূমিকা রাখার কথা ছিল, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েই গেছে। নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের ভূরি ভূরি অভিযোগ উঠলেও কমিশনের ‘ধীরে চলো’ নীতি তাদের সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। শতভাগ নিখুঁত নির্বাচন হয়তো আমাদের এই ভঙ্গুর রাজনৈতিক বাস্তবতায় কঠিন, তবে ন্যূনতম ৬০ শতাংশ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারাটাই হবে বর্তমান কমিশনের বড় সাফল্য।
সবচেয়ে আশঙ্কার জায়গাটি হলো মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা। প্রশাসনের একাংশের মধ্যে ‘তেল দেওয়ার’ বা ‘তোষামোদির’ এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক কর্মকর্তা ধরেই নিয়েছেন অমুক দল ক্ষমতায় আসছে, আর সেই হিসেবে তাঁরা আগাম আনুগত্য প্রকাশের খেলায় মেতেছেন। এর চেয়েও বিপজ্জনক হলো ‘ট্যাগিং কালচার’। কোনো কর্মকর্তার পেশাদার সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলেই তাঁকে ‘জামায়াত’ বা ‘বিএনপি’ তকমা দিয়ে কোণঠাসা করার যে প্রবণতা, তা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রযন্ত্রের জন্য আত্মঘাতী।
অপপ্রচার ও ভূ-রাজনীতির ধোঁয়াশা
এবারের নির্বাচনে ‘ভুয়া ন্যারেটিভ’ বা অপপ্রচারের প্লাবন দেখা যাচ্ছে। ‘দেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে’ কিংবা ‘অমুক দেশ অমুককে সমর্থন দিচ্ছে’—এমন সব ভিত্তিহীন তথ্য সাধারণ ভোটারদের বিভ্রান্ত করছে। এই গুজবগুলো কেবল নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করে না, বরং সামাজিক বিভেদকেও উসকে দেয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই অপপ্রচার রুখতে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল।
নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা
আশার কথা হলো, এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ‘উৎসবমুখর’ পরিবেশ মানে কেবল মারামারি না হওয়া নয়, বরং প্রতিটি ভোটারের কেন্দ্রে যাওয়ার নিরাপত্তা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটা।
আগামীকালের নির্বাচনে কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি উদাত্ত আহ্বান থাকবে—আপনারা ‘সর্বাত্মক নিরপেক্ষতা’ বজায় রাখুন। মনে রাখবেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে যদি জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত না হয়, তবে এই নির্বাচনের ফলাফল দীর্ঘমেয়াদে দেশ ও জাতিকে আবারও এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আগামীর বাংলাদেশ যেন এই ব্যালট বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সঠিক ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের হাতে সুরক্ষিত থাকে—এটাই এখন জনগণের প্রার্থনা।
লেখক: অধ্যাপক (অব.), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বিশ্ব রাজনীতি কখনো কখনো ব্যক্তির হাতে বন্দি হয়ে পড়ে। তখন নীতি হারায়; প্রাধান্য পায় মেজাজ। প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়; ব্যক্তিত্ব ফুলে ওঠে। এই বাস্তবতা নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও নগ্নভাবে সামনে এসেছে।
১০ ঘণ্টা আগে
একুশ শতকের তৃতীয় দশকে বিশ্বরাজনীতি এক অভূতপূর্ব সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে ইউক্রেন থেকে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের অস্ত্রের ভান্ডার ও অর্থনীতিকে বিসর্জন দিচ্ছে। একদিকে কামানের গর্জন আর ক্ষেপণাস্ত্রের ঝিলিক যখন পরাশক্তিগুলোকে যুদ্ধের চোরাবালিতে নিমজ্জিত করছে, ঠিক তখনই হয়তো বেইজিংয়
১৮ ঘণ্টা আগে
আমরা এখন পারস্য উপসাগরের নীল জলে। কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশ মিলিটারি কনটিনজেন্টের একদল সামরিক কর্মকর্তা ফেরিতে করে কুয়েত থেকে ২০ কিলোমিটার দূরবর্তী ফাইলাকা দ্বীপে ভ্রমণে চলেছি। ২০১০-এর জানুয়ারি। আমাদের পূর্ব দিকে ইরান। সেই দেশ থেকে উড়ে এসে একদল সাদা সীগাল আমাদের স্বাগত জানায়।
১ দিন আগে
‘সত্যেন’ নামের আক্ষরিক অর্থ—সত্যের প্রতি নিষ্ঠাবান ব্যক্তি; যিনি সত্যকে ধারণ করেন কিংবা যাঁর কাছে সত্যই পরম আরাধ্য। আমাদের সত্যেন সেন তাঁর নামের এই আক্ষরিক অর্থের এক জীবন্ত ও মূর্ত উদাহরণ।
২ দিন আগে