নারীদের নিম্ন অংশগ্রহণ নিয়ে পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০: ৪৫
সংবাদ সম্মেলনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষণ দল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করলেও রাজনীতিতে নারীদের কম অংশগ্রহণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক আইভার্স ইজাবস।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ২০০৮ সালের পর এটি প্রথম সত্যিকারের প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন, যা আন্তর্জাতিক মানসম্মত নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের পেশাদারিত্ব ও স্বাধীনতার প্রশংসা করে বলেন, কমিশন স্বচ্ছতা ও অংশীজনদের আস্থা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ও ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রতিনিধি দলের সদস্য টমাস জেকোভস্কি বলেন, এই ভোট গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং নাগরিকদের নির্বাচনী অধিকার পুনরুদ্ধারে সহায়তা করেছে। তাঁর ভাষায়, ‘এটি একটি বিশ্বাসযোগ্য ভোট ছিল, যা নির্বাচনী অধিকার ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ পুনরুদ্ধারে সহায়তা করেছে।’ তবে প্রচারণার সময় বিচ্ছিন্ন সহিংসতা ও উত্তেজনার খবর পাওয়া গেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ইইউ মিশন নারীদের জন্য সীমিত রাজনৈতিক পরিসরকে ‘উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে কথা বলা ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ভোটার ও প্রার্থী নিবন্ধন প্রক্রিয়া মূলত অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল। তবে জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ নারী হলেও নিবন্ধিত সংসদীয় প্রার্থীদের মধ্যে ৪ শতাংশেরও কম নারী ছিলেন।

টমাস জেকোভস্কি বলেন, হুমকি, হয়রানি ও সামাজিক বাধার কারণে নারীরা প্রচারণায় প্রায় অনুপস্থিত ছিলেন। দেশের রাজনৈতিক জীবনে নারীদের শক্তিশালী অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

এদিকে একই দিনে ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে পর্যবেক্ষণে কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষকরাও একই উদ্বেগ তুলে ধরে জানান, নারী ভোটারদের উপস্থিতি বেশি হলেও প্রার্থীদের মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ নারী ছিলেন এবং খুব কম সংখ্যক নির্বাচিত হয়েছেন। হয়রানি, অনলাইন নির্যাতন, সামাজিক বাধা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব নারীদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে নিরুৎসাহিত করছে।

ইইউ পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিক্ষিপ্ত রাজনৈতিক সহিংসতা এবং অনলাইনে গুজব ছড়ানোর ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যদিও এগুলো নির্বাচনের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করেনি। ইজাবস বলেন, গুজব দেশ ও দেশের বাইরে—দুই জায়গা থেকেই ছড়ানো হয়েছে। তিনি ফ্যাক্ট-চেকারদের ভূমিকার প্রশংসা করেন।

পর্যবেক্ষকরা সুশীল সমাজ ও যুব গোষ্ঠীগুলোর ভোটার শিক্ষা ও পর্যবেক্ষণে ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন, যা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে আস্থা পুনর্গঠনে সহায়তা করেছে বলে তারা মনে করেন।

কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল জানিয়েছে, নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্দিষ্ট কোনো আক্রমণের সরাসরি প্রতিবেদন তারা পায়নি, যদিও কিছু এলাকায় সংখ্যালঘু ভোটার উপস্থিতি কম ছিল।

ইইউ ও কমনওয়েলথ উভয় মিশনই অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, সহিংসতা এড়িয়ে চলা এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছে। ধর্ম, জাতি বা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সকল নাগরিকের নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়।

পর্যবেক্ষকরা জানান, বিক্ষিপ্ত সহিংসতা, ভীতি প্রদর্শন ও হয়রানি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে। বিভিন্ন জেলায় কয়েক ডজন সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে এবং নারী প্রচারকর্মীরাও হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তবে নির্বাচনের দিনটি মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ ছিল এবং বেশিরভাগ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছভাবে হয়েছে।

আইভার্স ইজাবস বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা নিয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুতের জন্য ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে থাকবে। পর্যবেক্ষক দলগুলো শিগগিরই সুপারিশসহ বিস্তারিত চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।

সম্পর্কিত