ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ১২ জনের মৃত্যু ‘অনাহারে ও রোগাক্রান্ত হয়ে’

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা

প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬, ১৩: ৫৩
ভুক্তভোগীদের বাড়িতে চলছে মাতম। স্ট্রিম ছবি

লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরের গ্রিস উপকূলে ‘অনাহার ও রোগাক্রান্ত’ হয়ে অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে সুনামগঞ্জের ১২ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। অন্যরা সিলেট জেলার বাসিন্দা বলে খবর পাওয়া গেলেও তাঁদের পরিচয় বা বিস্তারিত কোনো তথ্য এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আজ রোববার (২৯ মার্চ) সকাল থেকে জগন্নাথপুর ও দিরাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে অভিবাসনেচ্ছু এসব ভুক্তভোগীদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ভুক্তভোগীদের স্বজনরা বলছেন, ‘দালালচক্রের প্রলোভনে’ ইউরোপে অভিবাসনের উদ্দেশে অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে যাচ্ছিলেন এই যুবকরা।

এদিকে ভূমধ্যসাগরে ১৮ জন মারা যাওয়ার তথ্য গণমাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক। তিনি জানিয়েছেন, ঘটনার পর সরকারের কাছে ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য আসে। এছাড়া বেশ কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করে গ্রিসের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরও জানিয়েছেন, বাংলাদেশ মিশন ইতিমধ্যে গ্রিসের কোস্টগার্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সহযোগিতা এবং নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার উপায় খোঁজা হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ছয়জন, জগন্নাথপুর উপজেলার পাঁচজন ও দোয়ারাবাজার উপজেলার একজন রয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের স্বজনরা বলছেন, তাঁরা সেখানে থাকা অন্য বাংলাদেশিদের কাছে তাঁদের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হয়েছেন। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দীর্ঘসময় সমুদ্রে ভেসে থেকে রোগাক্রান্ত এই তরুণদের মৃত্যু হয়েছে বলেও তাঁরা জানতে পেরেছেন।

মৃতদের মধ্যে দিরাই উপজেলার ছয়জন হলেন, উপজেলার জগদল ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু সর্দারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩০), একই এলাকার আব্দুল গনীর ছেলে মো. সাজিদুর রহমান (২৮) ও মৃত কারি ইসলাম উদ্দীনের ছেলে মো. সাহান (২৫); রাজানগর ইউনিয়ন জাহানপুর গ্রামের মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮), বাউরী গ্রামের সালেক মিয়ার ছেলে সোহানুর রহমান এবং মা‌টিয়াপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে তারেক মিয়া।

আর জগন্নাথপুর উপজেলার ছয়জনের মধ্যে টিয়ারগাঁও এলাকার শায়েখ আহমদ জয়, ইছগাঁও গ্রামের মো. আলী, পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান, চিলাউরা গ্রামের দুলন মিয়ার ছেলে মো. নাইম মিয়া ও চিলাউরা গ্রামের নাটু মিয়ার ছেলে ইজাজুল।

স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে চারপাশ। স্ট্রিম ছবি
স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে চারপাশ। স্ট্রিম ছবি

এছাড়া দোয়ারাবাজার উপজেলার ক‌বিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে ফা‌হিম আহমদ মুন্নাও মারা গেছেন বলে তাঁর স্বজনরা জানিয়েছেন।

সকাল থেকে এসব এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, প্রিয়জনের মৃত্যুর খবরে নিহতের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে চারপাশ। তাঁরা স্বজনদের লাশ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি দালাল চক্রের চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের একজন সুনামগ‌ঞ্জের জগন্নাথপু‌র চিলাউড়া গ্রামের দুলন মিয়ার ছেলে নাইম ইসলাম। তিনি গত ডিসেম্বর মাসে ইউরোপ যাওয়ার আশায় লি‌বিয়ায় যান। এজন্য তাঁর বাবা দুলন মিয়া জ‌মি বি‌ক্রি করে ও সুদে টাকা আনে। সেই টাকা দেন একই উপজেলার ইছগাঁও গ্রামের এক দালালের কাছে।

দুলন মিয়া স্ট্রিমকে জানান, গত ২১ মার্চ পর্যন্ত ছেলে নাইমের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তাঁর। নাইম তাঁকে জানিয়েছেন, তিন মাস ধরেই বি‌ভিন্ন স্থা‌নে নেওয়া হয়েছিল তাঁদের। সবশেষ গত ২০ মার্চ নাইমসহ ৪৫ জনকে এক‌টি ছোট বোটে তু‌লে দেয় দালাল চক্র। এরপর থেকে নাইমের সঙ্গে আর কোনও কথা হয়‌নি। গতকাল শ‌নিবার বিকেলে তাঁর খবর পান, নাইম আর বেঁচে নেই।

তি‌নি আরও বলেন, দালালের সঙ্গে অসংখ্যবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও সে কল রি‌সিভ করে‌নি। দালালকে ১৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।

ছেলের মুখ শেষবার দেখার আকুতি জানিয়ে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি।

জগন্নাথপুরের চিলাউড়া হল‌দিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সা‌হিদুল ইসলাম বকুল বলেন, ‘আমি সরকারের কাছে দা‌বি জানাই, যারা প্রলোভন দে‌খিয়ে আমার এলাকার তাজা প্রাণগুলো কে‌ড়ে নিয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’

এদিকে নিহতদের বা‌ড়ি বা‌ড়ি গিয়ে প্রশাসন তথ্য সংগ্রহ করছে বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া। তিনি গণমাধ্যমে বলেন, যেহেতু তাঁরা বৈধ পথে যাননি, তাই সরকারিভাবে আগে থেকে কোনো তথ্য ছিল না। তবে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করে তথ্য সংগ্রহ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে; যাতে করে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

সম্পর্কিত