সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্মরণে শোকাঞ্জলি
আজ প্রয়াত হয়েছেন বরেণ্য কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। লেখক-শিক্ষক সত্তার বাইরে মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন তিনি? স্মৃতিচারণ করেছেন এই সময়ের এক কথাসাহিত্যিক।
কিযী তাহ্নিন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ছিল সেদিন। জীবনের সব স্বপ্ন জোনাকির মতো মুঠো করে এসেছি পরীক্ষা দিতে। এক লহমায় যেন পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। জীবন সমান আশা আর জগতের সব ক্লান্তি নিয়ে হল থেকে বেরিয়ে দেখি, স্বয়ং তিনি দাঁড়িয়ে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বীজ ছোটবেলা থেকে আমার মগজে বুনে দিয়েছেন যিনি—দেখলাম, দাঁড়িয়ে আছেন তিনিই—সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ছাত্রছাত্রীদের কাছে ‘এসএমআই’, আর আমার কাছে ‘মনজু চাচা’।
সেদিন কেমন করে খুঁজে পেলেন তিনি আমার হল নম্বর! জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, ‘কিযী, এত ভিড়ে হারিয়ে যাবে, চলো তোমাকে মায়ের কাছে দিয়ে আসি।’
কলাভবনের গেটের বাইরে আমার মা দাঁড়িয়ে আছেন। সেই গেট পর্যন্ত পৌঁছানো কি সোজা ব্যাপার! কী ভিড়! সব ভিড় পার হয়ে আমাকে তিনি পৌঁছে দিয়ে গেলেন মায়ের কাছে। তাঁর একান্ত সেই হাসি, হেসেই মাকে বললেন, ‘জেবু (আমার মায়ের ডাকনাম), এই যে মেয়েকে তোমার কাছে পৌঁছে দিয়ে গেলাম।’
এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফল যেদিন প্রকাশ পেল, কী যে খুশি তাঁর! আমাদের বললেন, ‘এত ভালো রেজাল্ট, ও তো ইংলিশেই পড়বে, আমার কাছে।’
ফল প্রকাশের পরদিন বাসায় এলেন। আমি কাঁচুমাঁচু হয়ে বললাম, ‘আমি যে ইকোনোমিক্স পড়তে চাই, ইংলিশ না।’ অপার মায়া আর হাসি তখন তাঁর চোখজুড়ে, ‘ইকোনোমিক্সই পড়বে। দারুণ হবে। আর ইংলিশ তোমার এমনিই জানা হয়ে যাবে।’
ইংরেজি পড়িনি ঠিকই, কিন্তু ইংরেজি বিভাগের আশেপাশে ঘুরেঘুরে বেড়িয়েছি, তাঁকে খুঁজেছি। ইংরেজি বিভাগের বন্ধুদের কাছ থেকে গল্প শুনতাম, মনজুর স্যারের গল্প; এমন শিক্ষক নাকি একজনই হয়। ভারী দুঃখ হতো সেই সময় এই ভেবে যে অর্থনীতি আর ইংরেজি একসঙ্গে পড়ার কোনো ব্যবস্থা নেই কেন! আমি বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে লুকিয়ে কত দিন তাঁর ক্লাস শুনেছি!
এই দেশ এখন হারিয়েছে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে। আর আমরা যাঁরা তাঁকে ভালোবেসেছি, তাঁরা হারিয়েছি মহাকালের এক অন্যন্য প্রগতিশীল সাহসী বুদ্ধিজীবীকে, হারিয়েছি আলোকময় এক ব্যক্তিত্বকে।
তাঁকে হারিয়ে এখন সমাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাহাকার করছে সবাই। অনেকেই লিখছেন, ‘পৃথিবী একবার পায় তারে’।
হ্যাঁ, পৃথিবী পেয়েছিল তাঁকে, তিনিও পেয়েছিলেন এই পৃথিবীকে। এমন করে একান্ত পৃথিবী কি সবাই খুঁজে নিতে পারে? পারে না।
যা লিখলাম, যা ভাবছি, যা লিখতে চাই, তা আমার বড় নিজস্ব কথা। কারণ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে নিয়ে আমার যে শোক, তা আমার একান্তই পারিবারিক, ব্যক্তিগত।
বাইরে পড়াশোনা শেষে একসময় আমি ফিরে এলাম দেশে। তখনো বরাবরই তাঁকে পাশে পেয়েছি। শুধু সাহিত্যসাধনা আর লেখালিখির চেষ্টাটা করেছি বড্ড লুকিয়ে। আমার প্রথম পাণ্ডুলিপি প্রকাশের আগে তিনি যখন জানলেন, বললেন, ‘তোমাদের বাড়ি গেলে দেখতাম, তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা করছ। তুমি লেখো, তা কেউ আমাকে বলেনি কেন! তুমি সত্যিই লিখছ!’
তিনি এমন করে বলেন, আর আমি তাঁর থেকে মুখ লুকিয়ে লিখে যাই। লেখক বন্ধুরা মাঝেমধ্যে জানায়, তিনি নাকি আমার লেখা পড়েন এবং তা নিয়ে নিজের অনুভূতিও অন্যদের জানান। কিন্তু আমার সরাসরি সেসব আর জানা হয় না। তিনিও বলেন না আমাকে।
এ সময় আমিও কী এক লজ্জায় তাঁকে পাশ কাটিয়ে যাই।
বাবা-মাকে নিজের প্রথম বই উৎসর্গ করার পর মনে হলো, আমার আর কে আছেন, যাঁকে এ জীবনে খুঁজে না পেলে সবকিছু হয়তো পাল্টে যেত?
খুঁজে পেলাম, পরের বই উৎসর্গ করতে গিয়ে লিখলাম:
‘যাঁর পরিমিতিবোধ জানান দেয় তাঁর দীপ্তিমান ব্যক্তিত্বের, পরম শ্রদ্ধেয় কথাসাহিত্যিক এবং শিক্ষক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম; তিনি আমার তথাকথিত শিক্ষক ছিলেন না, কিন্তু এই জীবনে তিনি আমায় যা শিখিয়ে গেলেন, তা তো আর কেউ কখনো শেখায়নি।’
এই যে গেল বছর ‘সমকাল’ পত্রিকার ইফতার আয়োজনে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে কেউ আমার লেখা নিয়ে বলছিল দুটো ভালোমন্দ কথা, মন দিয়ে শুনলেন তিনি। শেষে আমাকে বললেন, ‘কিযী, সব প্রশংসা গ্রহণ করবে। কিন্তু পা দুটো মাটিতে রেখো।’
আপনাকে আমার বলা হলো না যে আমি আপনার দীপ্তি মুঠো ভরে পথ হাঁটি—এটা সেই রাস্তা, যে পথটুকু নিজের পায়ে পাড়ি দিতে হয়। আপনার সেই আলোর পথ ছেড়ে কি কেউ অন্য পথ খুঁজে নিতে পারে! কিন্তু মনজু চাচা, এই যে আপনি সব আলো নিয়ে চলে গেলেন, আপনার মতো এমন করে সবটুকু আলো মেখে কে আর হাসবে! এমন করে আর কে হাঁটবে পথ!
লেখক: কথাসাহিত্যিক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ছিল সেদিন। জীবনের সব স্বপ্ন জোনাকির মতো মুঠো করে এসেছি পরীক্ষা দিতে। এক লহমায় যেন পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। জীবন সমান আশা আর জগতের সব ক্লান্তি নিয়ে হল থেকে বেরিয়ে দেখি, স্বয়ং তিনি দাঁড়িয়ে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বীজ ছোটবেলা থেকে আমার মগজে বুনে দিয়েছেন যিনি—দেখলাম, দাঁড়িয়ে আছেন তিনিই—সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ছাত্রছাত্রীদের কাছে ‘এসএমআই’, আর আমার কাছে ‘মনজু চাচা’।
সেদিন কেমন করে খুঁজে পেলেন তিনি আমার হল নম্বর! জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, ‘কিযী, এত ভিড়ে হারিয়ে যাবে, চলো তোমাকে মায়ের কাছে দিয়ে আসি।’
কলাভবনের গেটের বাইরে আমার মা দাঁড়িয়ে আছেন। সেই গেট পর্যন্ত পৌঁছানো কি সোজা ব্যাপার! কী ভিড়! সব ভিড় পার হয়ে আমাকে তিনি পৌঁছে দিয়ে গেলেন মায়ের কাছে। তাঁর একান্ত সেই হাসি, হেসেই মাকে বললেন, ‘জেবু (আমার মায়ের ডাকনাম), এই যে মেয়েকে তোমার কাছে পৌঁছে দিয়ে গেলাম।’
এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফল যেদিন প্রকাশ পেল, কী যে খুশি তাঁর! আমাদের বললেন, ‘এত ভালো রেজাল্ট, ও তো ইংলিশেই পড়বে, আমার কাছে।’
ফল প্রকাশের পরদিন বাসায় এলেন। আমি কাঁচুমাঁচু হয়ে বললাম, ‘আমি যে ইকোনোমিক্স পড়তে চাই, ইংলিশ না।’ অপার মায়া আর হাসি তখন তাঁর চোখজুড়ে, ‘ইকোনোমিক্সই পড়বে। দারুণ হবে। আর ইংলিশ তোমার এমনিই জানা হয়ে যাবে।’
ইংরেজি পড়িনি ঠিকই, কিন্তু ইংরেজি বিভাগের আশেপাশে ঘুরেঘুরে বেড়িয়েছি, তাঁকে খুঁজেছি। ইংরেজি বিভাগের বন্ধুদের কাছ থেকে গল্প শুনতাম, মনজুর স্যারের গল্প; এমন শিক্ষক নাকি একজনই হয়। ভারী দুঃখ হতো সেই সময় এই ভেবে যে অর্থনীতি আর ইংরেজি একসঙ্গে পড়ার কোনো ব্যবস্থা নেই কেন! আমি বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে লুকিয়ে কত দিন তাঁর ক্লাস শুনেছি!
এই দেশ এখন হারিয়েছে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে। আর আমরা যাঁরা তাঁকে ভালোবেসেছি, তাঁরা হারিয়েছি মহাকালের এক অন্যন্য প্রগতিশীল সাহসী বুদ্ধিজীবীকে, হারিয়েছি আলোকময় এক ব্যক্তিত্বকে।
তাঁকে হারিয়ে এখন সমাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাহাকার করছে সবাই। অনেকেই লিখছেন, ‘পৃথিবী একবার পায় তারে’।
হ্যাঁ, পৃথিবী পেয়েছিল তাঁকে, তিনিও পেয়েছিলেন এই পৃথিবীকে। এমন করে একান্ত পৃথিবী কি সবাই খুঁজে নিতে পারে? পারে না।
যা লিখলাম, যা ভাবছি, যা লিখতে চাই, তা আমার বড় নিজস্ব কথা। কারণ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে নিয়ে আমার যে শোক, তা আমার একান্তই পারিবারিক, ব্যক্তিগত।
বাইরে পড়াশোনা শেষে একসময় আমি ফিরে এলাম দেশে। তখনো বরাবরই তাঁকে পাশে পেয়েছি। শুধু সাহিত্যসাধনা আর লেখালিখির চেষ্টাটা করেছি বড্ড লুকিয়ে। আমার প্রথম পাণ্ডুলিপি প্রকাশের আগে তিনি যখন জানলেন, বললেন, ‘তোমাদের বাড়ি গেলে দেখতাম, তুমি মন দিয়ে পড়াশোনা করছ। তুমি লেখো, তা কেউ আমাকে বলেনি কেন! তুমি সত্যিই লিখছ!’
তিনি এমন করে বলেন, আর আমি তাঁর থেকে মুখ লুকিয়ে লিখে যাই। লেখক বন্ধুরা মাঝেমধ্যে জানায়, তিনি নাকি আমার লেখা পড়েন এবং তা নিয়ে নিজের অনুভূতিও অন্যদের জানান। কিন্তু আমার সরাসরি সেসব আর জানা হয় না। তিনিও বলেন না আমাকে।
এ সময় আমিও কী এক লজ্জায় তাঁকে পাশ কাটিয়ে যাই।
বাবা-মাকে নিজের প্রথম বই উৎসর্গ করার পর মনে হলো, আমার আর কে আছেন, যাঁকে এ জীবনে খুঁজে না পেলে সবকিছু হয়তো পাল্টে যেত?
খুঁজে পেলাম, পরের বই উৎসর্গ করতে গিয়ে লিখলাম:
‘যাঁর পরিমিতিবোধ জানান দেয় তাঁর দীপ্তিমান ব্যক্তিত্বের, পরম শ্রদ্ধেয় কথাসাহিত্যিক এবং শিক্ষক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম; তিনি আমার তথাকথিত শিক্ষক ছিলেন না, কিন্তু এই জীবনে তিনি আমায় যা শিখিয়ে গেলেন, তা তো আর কেউ কখনো শেখায়নি।’
এই যে গেল বছর ‘সমকাল’ পত্রিকার ইফতার আয়োজনে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে কেউ আমার লেখা নিয়ে বলছিল দুটো ভালোমন্দ কথা, মন দিয়ে শুনলেন তিনি। শেষে আমাকে বললেন, ‘কিযী, সব প্রশংসা গ্রহণ করবে। কিন্তু পা দুটো মাটিতে রেখো।’
আপনাকে আমার বলা হলো না যে আমি আপনার দীপ্তি মুঠো ভরে পথ হাঁটি—এটা সেই রাস্তা, যে পথটুকু নিজের পায়ে পাড়ি দিতে হয়। আপনার সেই আলোর পথ ছেড়ে কি কেউ অন্য পথ খুঁজে নিতে পারে! কিন্তু মনজু চাচা, এই যে আপনি সব আলো নিয়ে চলে গেলেন, আপনার মতো এমন করে সবটুকু আলো মেখে কে আর হাসবে! এমন করে আর কে হাঁটবে পথ!
লেখক: কথাসাহিত্যিক।

স্বাক্ষরটি বেশ বড়, স্পষ্ট আর নজরকাড়া। বহু বছর ধরেই তাঁর এই স্বাক্ষরটি মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে আসছে। ট্রাম্প নিজেও নিজের স্বাক্ষর নিয়ে বেশ গর্বিত। ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সামরিক নেতাদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আমার স্বাক্ষর খুব ভালোবাসি, সত্যি বলছি। সবাই আমার স্বাক্ষর পছন্দ করে।
১৯ ঘণ্টা আগে
কিছুদিন আগেই মাইগ্রেনের ব্যথায় মৃত্যুবরণ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার ইউএনও। মাইগ্রেন আর সাধারণ মাথাব্যথা যে এক জিনিস নয়, এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হয়েছেন ঠিকই কিন্তু এই ব্যথা কেন হয় বা কীভাবে এই ব্যথাকে জীবন থেকে পুরোপুরি বিদায় করা যায়, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি।
২০ ঘণ্টা আগে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবট মানুষের একাকীত্ব কমাতে বেশ সাহায্য করে। বিশেষ করে যাদের আশেপাশে কথা বলার মতো কেউ নেই, তাদের জন্য এটি খুব উপকারী।
৩ দিন আগে
আমাদের আশেপাশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা করতে কিংবা আড্ডা দিতে খুব পছন্দ করেন। এই মানুষদের আমরা ‘সামাজিক মানুষ’ বলে জানি। তাদের নিয়ে সাধারণত কারও কোনো দুশ্চিন্তা বা অভিযোগ থাকে না। কিন্তু যারা একটু চুপচাপ বা একা থাকতে ভালোবাসেন, তাদের নিয়ে আমাদের অনেকেরই অভিযোগের শেষ নেই।
৩ দিন আগে