তুফায়েল আহমদ

ইরান আবারও অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা এই প্রতিবাদ এখন শুধু রিয়ালের দরপতন বা অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সরাসরি রূপ নিয়েছে খামেনির ক্ষমতাচ্যুতির আন্দোলনে। ঠিক এই উত্তপ্ত মুহূর্তে ইরানের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে তেল আবিব। ইসরায়েল কি সত্যিই ইরানের শাসকদের পতনের জন্য এবার মাঠে নামছে? নাকি তারা পর্দার আড়ালে থেকে খেলার কৌশল আঁটছে? এই প্রশ্ন এখন ভূ-রাজনীতির টেবিলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরাসরি এই বিক্ষোভে তাঁর সমর্থন জানিয়েছেন। গত রোববার (১২ জানুয়ারি) মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে তিনি ইরানিদের এই সংগ্রামকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বলে আখ্যা দিয়েছেন। নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েল ও তাঁর নীতি ইরানি জনগণের এই সংগ্রামের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। তিনি মনে করেন ইরানি জনগণ এখন নিজেদের ভাগ্য গড়ার চূড়ান্ত মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে। এমনকি ফ্লোরিডায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকের সময় তিনি ইরানের চলমান এই উত্তাল পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন বলেও উল্লেখ করেন। নেতানিয়াহুর ভাষায় ইরানের এই ‘বীরোচিত’ প্রতিবাদ হয়তো দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটাতে পারে।
তবে নেতানিয়াহুর এই প্রকাশ্য সমর্থনের পেছনের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই মনে করছেন এটি কেবল নৈতিক সমর্থন নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে কৌশলগত ছক। জেরুজালেমের নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মতে ইসরায়েল এখন সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই বিক্ষোভে হস্তক্ষেপ করে তবে তা আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। আর এই যুদ্ধে ইসরায়েলকেও জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। ট্রাম্প আগেই সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী বল প্রয়োগ করে তবে আমেরিকা চুপ করে বসে থাকবে না। এই বার্তাই এখন তেল আবিবের পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
ইরানে বর্তমানে যে বিক্ষোভ চলছে তাকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ বলা হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন মতে ইসরায়েলের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনী মনে করে এখনই ইরানে হামলা চালানোর উপযুক্ত সময় নয়। যদিও ইরানের শীর্ষ নেতারা দুর্বল এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ব্যস্ত কিন্তু ইসরায়েল কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হামলা পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে দিতে পারে। এই ঝুঁকি এড়াতে তেল আবিব এখন অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ বা ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ নীতিতে এগোচ্ছে।
সাবেক ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোউইচের মতে, ইরান এখন ইসরায়েলের দিকে মনোযোগ সরানোর চেষ্টা করছে না। কারণ তাদের প্রধান লক্ষ্য দেশের ভেতরের এই আগুন নেভানো। তাই ইসরায়েল অযথা তাদের উত্তেজিত করতে চাইবে না। বরং ইসরায়েল চায় এই বিক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ুক। তাতে ইরান ভেতর থেকেই ভেঙে পড়বে।
হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের ইরান বিশেষজ্ঞ মেনাহেম মেরহাভি বলছেন, ইসরায়েলের মূল মাথাব্যথা ইরানের পরমাণু বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে। শাসকের ধরন বা শাসনব্যবস্থা কেমন হবে তা তাদের জন্য দ্বিতীয় বিবেচ্য বিষয়। যদি পরিস্থিতি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দিকে না যায় তবে ইসরায়েল সম্ভবত সরাসরি কোনো অ্যাকশনে যাবে না।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর থেকে ইরানের বিষয়েও তাদের মনোভাব নিয়ে জল্পনা-কল্পনা তুঙ্গে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বেশ কয়েকটি বিকল্প পথের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাইবার আক্রমণ ও ইন্টারনেটে ইরানের সরকারবিরোধী প্রচারণা বাড়ানোর কৌশল অন্যতম। এমনকি প্রয়োজনে সামরিক হামলার পরিকল্পনাও ট্রাম্পের টেবিলে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দুই নেতাই জানেন, এই মুহূর্তে ভুল পদক্ষেপ বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ‘বেসামরিক স্থানগুলোতে’ হামলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। এর মানে হলো পরমাণু কেন্দ্রের বাইরে অন্য কোনো কৌশলী স্থানে আঘাত হানা হতে পারে। তবে এই ধরনের কোনো হামলার ফলে ইরানের সামরিক বাহিনী ও রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) পাল্টা আঘাতের আশঙ্কাও প্রবল।
গত রোববার ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ হুমকি দিয়ে বলেছেন, আমেরিকা যদি হামলা চালায় তবে ইসরায়েল ও ওই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলো তাদের ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হবে। এই হুমকি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।
মাঠের যুদ্ধের পাশাপাশি অনলাইনেও তুমুল লড়াই চলছে। ইসরায়েলের ভেতরে অনেকেই ইরানের বর্তমান সরকারের পতনের আশায় দিন গুনছেন। সাবেক সংসদ সদস্য মোশে ফেইগলিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন ইরানের এই পতন অনিবার্য। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন এর পর সেখানে কে ক্ষমতায় আসবে তা নিয়েই এখন ভাবার সময়। ডানপন্থী ইসরায়েলিরা এই ঘটনাকে ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাঁরা ইরানের পুরোনো পতাকা ও ইসরায়েলি পতাকার ছবি শেয়ার করে দুই দেশের পুনর্মিলনের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।
তবে এর বিপরীত চিত্রও আছে। অনেক বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন যে এই ধরনের অতি-উৎসাহ ইরানের শাসকরা তাদের পক্ষে ব্যবহার করতে পারে। তারা প্রচার করতে পারে যে এই বিক্ষোভ আসলে ‘জায়নবাদী ও আমেরিকার ষড়যন্ত্র’। খামেনি ইতিমধ্যেই এই লাইনেই কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেছেন দাঙ্গাবাজরা ট্রাম্পকে খুশি করার জন্যই এই সব করছে। লেবাননে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন আমেরিকা ও ইসরায়েল ইরানকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে।
বাস্তবতা হলো ইরানের বর্তমান বিক্ষোভের পেছনে কোনো বিদেশী হাতের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হলো পেটের ক্ষুধা। মুদ্রাস্ফীতি আর অভাবের আগুনে পুড়ছে সাধারণ ইরানিরা। তেলের দাম বা পানির সংকট এখন তাদের অস্তিত্বের সংকটে পরিণত হয়েছে। তবুও ইসরায়েল বা আমেরিকার ইন্ধন থাকার বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদন বলছে, সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর এক টুইট ইরানের শাসকদের সেই সন্দেহকে আরও উসকে দিয়েছে। পম্পেও বিক্ষোভকারীদের নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি তাদের সঙ্গে থাকা ‘মোসাদ এজেন্টদেরও’ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এই ধরনের বক্তব্য নিঃসন্দেহে তেহরানের সন্দেহের আগুনে ঘি ঢেলেছে।
সব মিলিয়ে ইসরায়েল এখন এক অদ্ভুত দ্বিমুখী অবস্থায় রয়েছে। একদিকে তারা ইরানের পতন চায়। অন্যদিকে তারা এই পতনের প্রক্রিয়ায় সরাসরি হাত দিয়ে আগুনের আঁচ গায়ে লাগাতে চায় না। তারা চায় ইরানি জনগণই তাদের কাজ করে দিক। কিন্তু পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বা ট্রাম্প কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেন তবে তেল আবিবকেও যুদ্ধের ময়দানে নামতে হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো ইরান কি সত্যিই দীর্ঘদিনের ধর্মীয় শাসনের পতন দেখবে নাকি আবারও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে? উত্তরের জন্য আমাদের হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, রয়টার্স এবং দ্য গার্ডিয়ান

ইরান আবারও অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা এই প্রতিবাদ এখন শুধু রিয়ালের দরপতন বা অর্থনৈতিক কষ্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সরাসরি রূপ নিয়েছে খামেনির ক্ষমতাচ্যুতির আন্দোলনে। ঠিক এই উত্তপ্ত মুহূর্তে ইরানের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে তেল আবিব। ইসরায়েল কি সত্যিই ইরানের শাসকদের পতনের জন্য এবার মাঠে নামছে? নাকি তারা পর্দার আড়ালে থেকে খেলার কৌশল আঁটছে? এই প্রশ্ন এখন ভূ-রাজনীতির টেবিলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরাসরি এই বিক্ষোভে তাঁর সমর্থন জানিয়েছেন। গত রোববার (১২ জানুয়ারি) মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে তিনি ইরানিদের এই সংগ্রামকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বলে আখ্যা দিয়েছেন। নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েল ও তাঁর নীতি ইরানি জনগণের এই সংগ্রামের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে। তিনি মনে করেন ইরানি জনগণ এখন নিজেদের ভাগ্য গড়ার চূড়ান্ত মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে। এমনকি ফ্লোরিডায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকের সময় তিনি ইরানের চলমান এই উত্তাল পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন বলেও উল্লেখ করেন। নেতানিয়াহুর ভাষায় ইরানের এই ‘বীরোচিত’ প্রতিবাদ হয়তো দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটাতে পারে।
তবে নেতানিয়াহুর এই প্রকাশ্য সমর্থনের পেছনের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অনেকেই মনে করছেন এটি কেবল নৈতিক সমর্থন নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে আছে কৌশলগত ছক। জেরুজালেমের নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মতে ইসরায়েল এখন সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই বিক্ষোভে হস্তক্ষেপ করে তবে তা আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। আর এই যুদ্ধে ইসরায়েলকেও জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। ট্রাম্প আগেই সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী বল প্রয়োগ করে তবে আমেরিকা চুপ করে বসে থাকবে না। এই বার্তাই এখন তেল আবিবের পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
ইরানে বর্তমানে যে বিক্ষোভ চলছে তাকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ বলা হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন মতে ইসরায়েলের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বাহিনী মনে করে এখনই ইরানে হামলা চালানোর উপযুক্ত সময় নয়। যদিও ইরানের শীর্ষ নেতারা দুর্বল এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ব্যস্ত কিন্তু ইসরায়েল কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হামলা পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে দিতে পারে। এই ঝুঁকি এড়াতে তেল আবিব এখন অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ বা ‘ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ’ নীতিতে এগোচ্ছে।
সাবেক ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোউইচের মতে, ইরান এখন ইসরায়েলের দিকে মনোযোগ সরানোর চেষ্টা করছে না। কারণ তাদের প্রধান লক্ষ্য দেশের ভেতরের এই আগুন নেভানো। তাই ইসরায়েল অযথা তাদের উত্তেজিত করতে চাইবে না। বরং ইসরায়েল চায় এই বিক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ুক। তাতে ইরান ভেতর থেকেই ভেঙে পড়বে।
হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের ইরান বিশেষজ্ঞ মেনাহেম মেরহাভি বলছেন, ইসরায়েলের মূল মাথাব্যথা ইরানের পরমাণু বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে। শাসকের ধরন বা শাসনব্যবস্থা কেমন হবে তা তাদের জন্য দ্বিতীয় বিবেচ্য বিষয়। যদি পরিস্থিতি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দিকে না যায় তবে ইসরায়েল সম্ভবত সরাসরি কোনো অ্যাকশনে যাবে না।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর থেকে ইরানের বিষয়েও তাদের মনোভাব নিয়ে জল্পনা-কল্পনা তুঙ্গে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বেশ কয়েকটি বিকল্প পথের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাইবার আক্রমণ ও ইন্টারনেটে ইরানের সরকারবিরোধী প্রচারণা বাড়ানোর কৌশল অন্যতম। এমনকি প্রয়োজনে সামরিক হামলার পরিকল্পনাও ট্রাম্পের টেবিলে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দুই নেতাই জানেন, এই মুহূর্তে ভুল পদক্ষেপ বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ‘বেসামরিক স্থানগুলোতে’ হামলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। এর মানে হলো পরমাণু কেন্দ্রের বাইরে অন্য কোনো কৌশলী স্থানে আঘাত হানা হতে পারে। তবে এই ধরনের কোনো হামলার ফলে ইরানের সামরিক বাহিনী ও রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) পাল্টা আঘাতের আশঙ্কাও প্রবল।
গত রোববার ইরানের সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ হুমকি দিয়ে বলেছেন, আমেরিকা যদি হামলা চালায় তবে ইসরায়েল ও ওই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলো তাদের ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হবে। এই হুমকি পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে।
মাঠের যুদ্ধের পাশাপাশি অনলাইনেও তুমুল লড়াই চলছে। ইসরায়েলের ভেতরে অনেকেই ইরানের বর্তমান সরকারের পতনের আশায় দিন গুনছেন। সাবেক সংসদ সদস্য মোশে ফেইগলিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন ইরানের এই পতন অনিবার্য। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন এর পর সেখানে কে ক্ষমতায় আসবে তা নিয়েই এখন ভাবার সময়। ডানপন্থী ইসরায়েলিরা এই ঘটনাকে ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাঁরা ইরানের পুরোনো পতাকা ও ইসরায়েলি পতাকার ছবি শেয়ার করে দুই দেশের পুনর্মিলনের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।
তবে এর বিপরীত চিত্রও আছে। অনেক বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন যে এই ধরনের অতি-উৎসাহ ইরানের শাসকরা তাদের পক্ষে ব্যবহার করতে পারে। তারা প্রচার করতে পারে যে এই বিক্ষোভ আসলে ‘জায়নবাদী ও আমেরিকার ষড়যন্ত্র’। খামেনি ইতিমধ্যেই এই লাইনেই কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেছেন দাঙ্গাবাজরা ট্রাম্পকে খুশি করার জন্যই এই সব করছে। লেবাননে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন আমেরিকা ও ইসরায়েল ইরানকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে।
বাস্তবতা হলো ইরানের বর্তমান বিক্ষোভের পেছনে কোনো বিদেশী হাতের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হলো পেটের ক্ষুধা। মুদ্রাস্ফীতি আর অভাবের আগুনে পুড়ছে সাধারণ ইরানিরা। তেলের দাম বা পানির সংকট এখন তাদের অস্তিত্বের সংকটে পরিণত হয়েছে। তবুও ইসরায়েল বা আমেরিকার ইন্ধন থাকার বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদন বলছে, সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর এক টুইট ইরানের শাসকদের সেই সন্দেহকে আরও উসকে দিয়েছে। পম্পেও বিক্ষোভকারীদের নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি তাদের সঙ্গে থাকা ‘মোসাদ এজেন্টদেরও’ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এই ধরনের বক্তব্য নিঃসন্দেহে তেহরানের সন্দেহের আগুনে ঘি ঢেলেছে।
সব মিলিয়ে ইসরায়েল এখন এক অদ্ভুত দ্বিমুখী অবস্থায় রয়েছে। একদিকে তারা ইরানের পতন চায়। অন্যদিকে তারা এই পতনের প্রক্রিয়ায় সরাসরি হাত দিয়ে আগুনের আঁচ গায়ে লাগাতে চায় না। তারা চায় ইরানি জনগণই তাদের কাজ করে দিক। কিন্তু পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বা ট্রাম্প কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নেন তবে তেল আবিবকেও যুদ্ধের ময়দানে নামতে হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো ইরান কি সত্যিই দীর্ঘদিনের ধর্মীয় শাসনের পতন দেখবে নাকি আবারও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে? উত্তরের জন্য আমাদের হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, রয়টার্স এবং দ্য গার্ডিয়ান

গণতন্ত্রকে বিবেচনা করা হয় জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিফলন হিসেবে। জনগণের ম্যান্ডেট বা জনসমর্থনই হলো গণতান্ত্রিক ক্ষমতার মূল উৎস। কিন্তু একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে এই দৃশ্যমান ক্ষমতার সমান্তরালে এক অদৃশ্য শক্তির সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যাকে বলা হয় ‘ডিপ স্টেট’ বা ‘রাষ্ট্রের অভ্যন্ত
১৬ ঘণ্টা আগে
১৯৯২ সালে জাইদি শিয়া মতাদর্শের পুনর্জাগরণ এবং সৌদি আরবের ওয়াহাবি প্রভাব মোকাবিলার জন্য হুসেইন বদরেদ্দীন আল-হুথি 'বিলিভিং ইয়ুথ' নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
১ দিন আগে
ট্রান্সআটলান্টিক বা আটলান্টিক পাড়ের দাস ব্যবসাকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এবং ক্ষতিপূরণের আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে।
১ দিন আগে
মাইক্রোফোন হাতে তাঁরা একসময় মঞ্চ কাঁপিয়েছেন। শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে তুলে ধরেছেন সমাজের নানা অসঙ্গতি। তাঁদের গানের তালে মেতেছে তরুণ প্রজন্ম। সেই র্যাপাররা সামলাচ্ছেন রাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব।
২ দিন আগে