তেলের দাম ২০০ ডলার ছাড়ানোর শঙ্কা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬, ২২: ০৯
ইরানের তেলের ডিপোতে হামলা। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

ইরান যুদ্ধের জেরে বৈশ্বিক তেলবাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা এখন আর শুধু ১০০ ডলারের ঘরে সীমাবদ্ধ নেই। বুধবার (১৮ মার্চ) ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরায়েলের হামলা এবং কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল-গ্যাস স্থাপনায় ইরানের পাল্টা আঘাতের পর তেলের দাম ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি যদি আগামী কয়েক সপ্তাহও কার্যত বন্ধ থাকে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে এমনকি ২০০ ডলারের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারে। কয়েক সপ্তাহ আগেও যে আশঙ্কাকে অতিরঞ্জিত মনে করা হচ্ছিল, এখন সেটিই ক্রমে বাস্তব শঙ্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে প্রথম হামলা চালানোর পরই বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছিলেন, যুদ্ধ তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে ঠেলে দিতে পারে। এখন সংঘাতের তিন সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই সেই আশঙ্কা আরও বড় আকার নিয়েছে। গত ৯ মার্চ ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ১২০ ডলারে ওঠে। আর ১৩ মার্চের পর থেকে তা আর ১০০ ডলারের নিচে নামেনি। বুধবার হামলার পর অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের ওপরে উঠে যায়।

বিশ্লেষকদের বড় অংশের মত হলো, পরিস্থিতি এখানেই থেমে থাকার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই এখন প্রশ্ন আর এই নয় যে দাম বাড়বে কি না, বরং কতটা বাড়বে, সেই হিসাবই করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তেলবাজার বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভান্ডা ইনসাইটসের প্রতিষ্ঠাতা বন্দনা হরি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ওমান ও দুবাই ক্রুডের মতো বেঞ্চমার্ক তেলের দাম ইতোমধ্যে ১৫০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। তাঁর ভাষায়, ব্রেন্ট বা ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের ক্ষেত্রেও ২০০ ডলার এখন আর কল্পনাতীত নয়। তিনি বলেন, এখান থেকে তেলের দাম কতদূর বাড়বে, তা প্রায় পুরোপুরি নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালি আর কত দিন বন্ধ থাকে তার ওপর।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সমন্বয়ে বিভিন্ন দেশ জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, হরমুজ হয়ে পরিবহন বন্ধ থাকার ঘাটতি তা দিয়ে পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। সিঙ্গাপুরভিত্তিক ওসিবিসি গ্রুপ রিসার্চের হিসাবে, জরুরি মজুত হিসাবেও ধরলে বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষকেরা গত সপ্তাহেই বলেছিলেন, ব্রেন্টের দাম দ্রুত ১৫০ ডলারে যেতে পারে এবং ২০২৬ সালে ২০০ ডলারও ‘অসম্ভবের বাইরে নয়’। ইরানও গত সপ্তাহে এক সামরিক মুখপাত্রের মাধ্যমে ২০০ ডলারের তেলের ইঙ্গিত দিয়ে বিশ্বকে ‘প্রস্তুত থাকার’ বার্তা দিয়েছে।

শিল্পবিষয়ক প্রকাশনা রিগজোনের প্রেসিডেন্ট চ্যাড নরভিল বলেন, কৌশলগত মজুত ও বিকল্প সরবরাহ কিছু সময়ের জন্য বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে পারে, যদি বাজার বিশ্বাস করে যে সরবরাহ শেষ পর্যন্ত চাহিদা মেটাতে পারবে। কিন্তু হরমুজ দিয়ে তেল প্রবাহ যদি দীর্ঘ সময় বাস্তবভাবে ব্যাহত থাকে, তবে ১০০ ডলারের অনেক ওপরে, এমনকি ২০০ ডলারের কাছাকাছি দামও একেবারে অস্বাভাবিক হবে না।

ব্রেন্ট ক্রুডের ইতিহাসে সর্বোচ্চ দাম ছিল ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময়, ব্যারেলপ্রতি ১৪৭ দশমিক ৫০ ডলার। বর্তমান মূল্যে সেটির সমমান প্রায় ২২৪ ডলার।

তবে সব বিশ্লেষক সমানভাবে হতাশ নন। লন্ডনভিত্তিক মেরেক্সের জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক সাশা ফস ২০০ ডলারের ব্রেন্টকে ‘খুবই অতিরঞ্জিত’ শঙ্কা বলে মনে করেন। তাঁর যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও গায়ানাসহ বিভিন্ন দেশে উৎপাদন বাড়ছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মতো বিকল্প সরবরাহপথও কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। তাঁর ভাষায়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরও দেখা গেছে, উচ্চ দামই শেষ পর্যন্ত আরও বেশি উৎপাদনের পথ তৈরি করে।

তবু বাজারের গতিপথ শুধু সরবরাহের ওপর নির্ভর করবে না, চাহিদাও এখানে বড় ভূমিকা রাখবে। অর্থনীতিতে একটি পরিচিত ধারণা হলো ‘ডিমান্ড ডেস্ট্রাকশন’ বা চাহিদা হ্রাস। অর্থাৎ দাম একটি নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে গেলে ক্রেতারা পণ্য ও সেবা কম কিনতে শুরু করেন। তেলের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা তুলনামূলক ধীর, কারণ এর বিকল্প সহজ নয়। তবু দাম খুব বেশি বেড়ে গেলে একসময় ব্যবহারও কমতে শুরু করে, আর তখন বাজারে কিছুটা ভারসাম্য ফেরে।

র‌্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকন্যালি বলেছেন, এই সীমা ঠিক কোথায়, তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না। তবে তা আগের সর্বোচ্চ ১৪৭ ডলারের স্তরেরও ওপরে হতে পারে।

ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের জননীতি ও অর্থনীতির অধ্যাপক গ্রেগর সেমিয়েনিউক মনে করেন, শেষ পর্যন্ত তেলের দাম কতদূর যাবে, তা নির্ধারিত হবে দুই বিপরীত প্রবণতার সংঘাতে। একদিকে থাকবে কমে যাওয়া সরবরাহের জন্য ক্রেতাদের যেকোনো দামে তেল কিনে নেওয়ার চেষ্টা, অন্যদিকে থাকবে উচ্চমূল্যের চাপে বাজার থেকে ক্রেতাদের ধীরে ধীরে সরে যাওয়া।

সব মিলিয়ে বাজারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় নির্ধারক একটাই—হরমুজ প্রণালি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়। সেটি যদি দ্রুত খুলে না যায়, তবে তেলের দাম শুধু ১৫০ ডলার নয়, ২০০ ডলারেও পৌঁছাতে পারে, এমন আশঙ্কা এখন আর একেবারে অসম্ভব বলে মনে করছেন না বাজারসংশ্লিষ্টরা।

সংঘাতের শুরুর দিকে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে এবং জাহাজে হামলার হুমকি দেয়। প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে নৌবহর গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড়ে ব্যর্থ হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এদিকে বিভিন্ন দেশ নিরাপদ চলাচলের জন্য ইরানের সঙ্গে আলাদা সমঝোতার চেষ্টা করছে। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কেবল ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক ও চীনের পতাকাবাহী হাতে গোনা কয়েকটি জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা

সম্পর্কিত