কেন মানুষ ‘আন্ডাররেটেড’ জিনিসের প্রতি টান অনুভব করে

স্ট্রিম গ্রাফিক

আগে আমি গান করতাম। আমার কিছু গান এখনো ইউটিউবে পাওয়া যায়, যা মোটামুটি ১০ থেকে ৪০ হাজার মানুষ শুনছেন। একদিন আমার চ্যানেলের কমেন্ট সেকশন ঘাটতে গিয়া একটা কমেন্টে চোখ আটকায় গেল। একজন লিখছেন: ‘ব্রো, প্লিজ এরকম আন্ডাররেটেডই থাইকেন!’

কমেন্টটা দেইখা একটু খটকা লাগল। মানে, আমি তো বড় হইতে চাই, আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাইতে চাই! কিন্তু উনি কেন চান আমি ‘ছোট’ থাকি?

Ad 300x250
ছবি: স্টিভেন উইলসন
Ad 300x250
ছবি: স্টিভেন উইলসন
Ad 300x250

কিছুদিন আগে অফিসের এক কলিগের সাথে উনার মিউজিক টেস্ট নিয়া আলাপ হচ্ছিল। কথায় কথায় তিনি জানাইলেন, উনি আন্ডাররেটেড জিনিসপাতির ফ্যান। স্টিভেন উইলসন, পরকুপাইন ট্রি তার সবচেয়ে ফেভারিট। আবার আজকে সকালে অন্য এক কলিগের সাথে আলাপ হইতেছিল; তিনি আক্ষেপ কইরা বললেন, আলী শেঠি আর প্রতীক কুহাড় যতদিন আন্ডাররেটেড ছিলেন, ততদিনই তাদের উনার ভাল্লাগতো। যখনই তারা মেইনস্ট্রিম হয়া উঠলেন, কেন যেন তাদের গান উনি আর শুনতে পারেন না।

তখনই মাথায় প্রশ্নটা এল, মানুষ আন্ডাররেটেড জিনিসের প্রতি এত টান অনুভব করে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আজকে লেখতে বসা। আন্ডাররেটেড আর্ট লাভাররা, গোল হয়া আসেন একটু । আপনাদের মনোজগত নিয়া আমার একটু অবজার্ভেশন আছে!

হিস্ট্রি-ফিস্ট্রি

মডার্ন পপ কালচারে ‘আন্ডাররেটেড’ শব্দটা এখন আর মোটেও অ্যাডজেক্টিভ হিসেবে ইউজ হয় না। এইটা অ্যাডজেক্টিভের ব্যারিয়ার ভাইঙ্গা এখন কালচারাল কারেন্সির মর্যাদা পাইছে। সহজভাবে বলতে গেলে, যে জিনিসের গুণমান অনেক বেশি কিন্তু সেই তুলনায় পরিচিতি বা বাণিজ্যিক সফলতা কম, তাকেই আমরা আন্ডাররেটেড বইলা ডাকি।

ইংরেজি ‘আন্ডাররেটেড’ ওয়ার্ডটার ফার্স্ট ইউজের হিস্ট্রি পাওয়া যায় ১৬০০ সালের দিকে। ‘রেট’ শব্দটির মূল অর্থ ছিল কোনো কিছুর দাম বা কর নির্ধারণ করা। যখন কোনো জিনিসের প্রকৃত মূল্যের চাইতে কম দাম ধরা হইত, তখন তারে বলা হইত আন্ডাররেটেড। এইট্টিন্থ ও নাইন্টিন্থ সেঞ্চুরির দিকে এই শব্দটা অর্থনৈতিক গন্ডি পার হইয়া আর্ট এবং স্পোর্টসের দুনিয়ায় এন্ট্রি নেয়।

ছবি: থিয়োডোর অ্যাডর্নো
ছবি: থিয়োডোর অ্যাডর্নো

টুয়েন্টিস্থ সেঞ্চুরির শুরুতে আর্ট কালচার যখন ব্যাপকভাবে বিজনেসসেন্ট্রিক হইতে শুরু করল, তখন একদল ইন্টেলেকচুয়াল এবং আর্টিস্ট, বিশেষ কইরা ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের দার্শনিক থিওডোর অ্যাডর্নো এবং ম্যাক্স হোর্খাইমার মনে করতেন, যা কিছু সাধারণ মানুষ বা ম্যাস (Mass) লাইক করে, তার মান নিচু। উনাদের বিখ্যাত প্রবন্ধ 'দ্য কালচার ইন্ডাস্ট্রি’তে (১৯৪৪), উনারা দেখাইছেন কীভাবে কমার্শিয়াল এন্টারটেইনমেন্ট রিয়েল আর্টরে সাইড কইরা দেয়। অইখান থিকাই ‘হাই আর্ট ভার্সেস লো আর্ট’ এর ধারণাটা একটা নতুন মাত্রা পায়। যারা মনে করতেন সাধারণের ভিড়ে প্রকৃত শিল্প হারায় যাচ্ছে, তারাই প্রথম আন্ডাররেটেড শিল্পীদের খুঁজে বাইর করার এবং তাদের আলাদা ডিগিনিটি দেওয়ার প্রথা স্টার্ট করেন।

ছবি: হোর্খাইমার
ছবি: হোর্খাইমার

১৯৫০ থেকে ৬০ এর দশকে ফিল্ম অ্যান্ড মিউজিক ক্রিটিকরা এই আইডিয়াটারে পপুলার কইরা তোলেন। বিশেষ কইরা ‘কাইয়ে দ্যু সিনেমা’ (Cahiers du Cinéma) ম্যাগাজিনের অঁদ্রে বাজাঁ বা ফ্রঁসোয়া ত্রুফোর মতো ফ্রেঞ্চ ক্রিটিকরা এমন অনেক পরিচালকরে (যেমন: অ্যালফ্রেড হিচকক বা হাওয়ার্ড হকস) তখন ‘আন্ডাররেটেড’ বইলা তুইলা ধরতেন, যাদেরকে হলিউড স্রেফ ‘কানিং ক্রাফটসম্যান’ মনে করত এবং কোনো পাত্তা দিত না। অর্থাৎ, ক্রিটিকদের কলমেই ‘আন্ডাররেটেড’ ওয়ার্ডটা একটা ইন্টেলেকচুয়াল স্ট্যান্ডার্ড হিসাবে প্রাইমারিলি এস্টাবলিশড হয়।

ছবি: কাইয়ে দ্যু সিনেমা ম্যাগাজিন কাভার
ছবি: কাইয়ে দ্যু সিনেমা ম্যাগাজিন কাভার

কেনওওওও?

ওকে, অনেক হইল জ্ঞানের কথা। চলেন, এইবার একটু বুঝি কেন কিছু পিপল খালি ‘আন্ডাররেটেড’ জিনিসপাতি ভালোবাসে!

‘সবাই যা শোনে, আমিও যদি তাই শুনি, তাইলে আমার বিশেষত্ব কই?’–আপনার আশেপাশের ভাই বেরাদারদের মধ্যে দেখবেন এমন একটা পার্সেপশন আছে! সেভেন্টিজের দিকে সাইকোলজিস্ট সি. আর. স্নাইডার এবং হাওয়ার্ড ফ্রমকিন তাদের ‘নিড ফর ইউনিকনেস’ (NfU) থিয়োরিতে দেখাইছিলেন যে, মানুষ যখন দেখে সে ভিড়ের অংশ হয়ে যাইতেছে, তখন তার মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। এই অস্বস্তি থিকাই জন্ম নেয় হিপস্টার স্নোবারি। হিপস্টার স্নোবারি বিষয়টা হইল এমন একটা সাইকোলজিক্যাল এবং সোসাইটাল পজিশন, যেইখানে একজন ব্যক্তি কোনো সাংস্কৃতিক বিষয় (গান, সিনেমা, ফ্যাশন) পছন্দ করার মাধ্যমে নিজেরে অন্যদের চেয়ে রুচিবোধে উন্নত বা কুল প্রমাণ করতে চান। আমি এমন কিছু চিনি যা তোমরা কেউ জানো না–এই রকম ফিলিংস মানুষকরে একধরনের ইন্টেলেকচুয়াল কিক দেয়।

সহজ কথায়, আন্ডাররেটেড জিনিসপাতি পছন্দ করা আসলে অনেকের কাছে কালচারাল ক্যাপিটাল জাহির করার একটা শর্টকাট উপায়।

মানুষ যে আন্ডাররেটেড জিনিসপাতি লাইক করে এইটার সাথে সাইকোলজিক্যাল ওউনারশিপ নামে মনস্তাত্ত্বিক একটা জিনিসেরও কানেকশন আছে। আমরা যখন কোনো আন্ডাররেটেড শিল্পী বা গান খুঁইজা পাই, তখন অবচেতনভাবে নিজেরে একজন আবিষ্কারক মনে করি। তখন আপনার মনে হয়, এই জেমটা তো আমি খুঁইজা বাইর করছি, তাই এইটার ওপর আমার একটা অলিখিত অধিকার আছে। এই যে একটা পার্সোনাল কানেকশন, এইটা মেইনস্ট্রিম বা পপুলার জিনিসের ক্ষেত্রে তেমনভাবে তৈরি হয় না।

আমার ইউটিউব ভিডিওর নিচে যে ভাই কমেন্ট করছিলেন— ‘ব্রো, প্লিজ এইরকম আন্ডাররেটেডই থাইকেন!’—উনার এই চাওয়ার পেছনে কিন্তু এই ‘মালিকানাবোধ’ কাজ করছে। উনি আমারে মেইনস্ট্রিম হইতে দেখতে চান না কারণ আমার সফলতা মানেই উনার সেই আবিষ্কারের গর্বের এজেন্সি নাই হয়ে যাওয়া। ইউজুয়ালি এই টাইপের মালিকানাবোধ থিকা গেটকিপিংয়ের জন্ম হয়। ভক্তরা তখন তাদের প্রিয় শিল্পীরে একটা ক্যাসেলের মধ্যে আগলায় রাখতে চায়। তারা চায় না তাদের প্রিয় ছোট সার্কেলটা বড় হোক। কারণ, বড় হওয়া মানেই সেখানে ‘নন-সিরিয়াস’ বা নতুন শ্রোতাদের আনাগোনা বাড়বে। তখন সেই শিল্পীকে নিয়ে আর অহংকার করা যাবে না।

ছবি: প্রতীক কুহাড়
ছবি: প্রতীক কুহাড়

আমার ওই কলিগ যে প্রতীক কুহাড় পপুলার হওয়ার পর আর শুনতে পারতেছেন না–এইটা টেস্ট চেঞ্জের ঘটনা না। বরং প্রতীক কুহাড় এখন ‘সবার হয়ে গেছেন’–এই সত্যটা নিতে না পারার সমস্যা। ফ্যানদের মধ্যে একটা বদ্ধমূল ধারণা আছে যে জনপ্রিয় হওয়া মানেই শিল্পী এখন বাজারের কাছে বিক্রি হয়ে গেছেন। মেইনস্ট্রিম হওয়া মানেই যেনো বা সবার মন জয় করার জন্য নিজের কাজের ধার কমায় দেওয়ার মতো একটা ঘটনা। তাই ম্যাক্সিমাম ফ্যানরা আন্ডাররেটেড থাকাকালীন কাজগুলারে অনেক বেশি র (Raw) এবং অনেস্ট মনে করে।

আন্ডাররেটেড কি একটা ওভাররেটেড ওয়ার্ড?

এখন কোনো কিছুর মান বিচারের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াইছে ঐটা কতজন চেনে। অনেক সময় দেখা যায়, একটা কাজ আসলে মিডিওকর, কিন্তু যেহেতু ঐটা খুব কম লোকে চেনে, তাই ফ্যানরা ‘আন্ডাররেটেড’ ট্যাগ দিয়ে ওইটারে জাতে তোলার ট্রাই করে। এই সব ক্ষেত্রে আর্টের চেয়ে ‘আননোন’ হওয়াটাই বড় পটেনশিয়াল হয়া দাঁড়ায়। কিন্তু আজকাল ফেসবুক বা রেডিটে নিজের প্রোফাইলরে ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ বা ‘কুল’ দেখানোর জন্য আন্ডাররেটেড ওয়ার্ডটা একটা সস্তা টুলে পরিণত হইছে। মানুষ অনেক সময় যা আসলেই ভালো লাগে তা না বলে, যা বললে তারে অন্যদের চেয়ে আলাদা দেখাবে, সেই কাজগুলারে ‘আন্ডাররেটেড’ বলে প্রচার করে। অর্থাৎ, শব্দটা এখন আর শিল্পের প্রশংসা নয়, বরং নিজের বিজ্ঞাপনের মাধ্যম। আর পপুলার হওয়া তো দোষের না। পপুলারিটি আর কোয়ালিটি যে আলাদা জিনিস, এই সহজ সত্যটা ‘আন্ডাররেটেড’ শব্দটার আড়ালে ঢাকা পইড়া যাচ্ছে না তো?

তো আন্ডাররেটেড ভাই ও বোনেরা, গোল আড্ডাটা এবার ভাঙি চলেন। যাওয়ার আগে শুধু একটা জিনিসই ভাইবেন, আপনার প্রিয় আন্ডাররেটেড শিল্পী যদি কাল হঠাৎ অস্কার বা গ্র্যামি পায়া যায়, আপনি কি আসলেই খুশি হবেন? নাকি তাকে মেইনস্ট্রিম গালি দিয়া প্লেলিস্ট থিকা রিমুভ কইরা দেবেন?

রুচি জিনিসটা কি শিল্পের আনন্দ নেওয়ার জন্য, নাকি নিজেরে অন্যদের চেয়ে আলাদা প্রমাণের টুল? এইটা আপনারা নিজেরা নিজেরা ঠিক কইরা নেন। ঠিক করতে গিয়া গ্যাঞ্জাম হইলে, একজন তৌহিদ আফ্রিদী লাগলে, আমারে ডাইকেন !

leadT1ad

সম্পর্কিত

leadT1ad
leadT1ad