স্মার্ট হেরিটেজ হ্যাকিং: যেভাবে মিউজিয়াম হ্যাং আউট হবে ১০০/১০০

স্ট্রিম গ্রাফিক

মিউজিয়াম নিয়ে বেশ কুখ্যাত একটা জোক আছে। অনেকেই বলেন, 'আ মিউজিয়াম ইজ আ প্লেস হোয়ার উই পে টু লুক এট আওয়ার অ্যানসেস্টরস ট্র্যাশ।' তবে আপনি যদি আমার মতো মিউজিওফাইল হন, তবে এই জোকে আপনার একটু বাট হার্টেড হবার চান্স আছে।

কিন্তু একটা বিষয় খেয়াল করেছেন কি? আজকাল ডেটিং বা হ্যাং আউটের জন্য দেশের বিভিন্ন মিউজিয়াম বেশ ইন থিং হয়ে উঠেছে । বিশেষ করে যারা একটু অফবিট ডেট পছন্দ করেন বা ভাই ব্রাদারের সামনে নিজের রুচি আর কালচারাল ক্যাপিটাল জাহির করতে চান, তাদের কাছে মিউজিয়াম কিন্তু এখন হ্যাং আউটের ওয়ান অফ দ্য টপ চয়েজ হয়ে উঠেছে । মিউজিয়ামে ঢুকে সিনেমাটিক রিল বানানো, ডার্ক অ্যাকাডেমিয়া ভাইবের ছবি তোলা আর ইনস্টাগ্রামে 'A Day well Spent' ক্যাপশনে আপলোডের যে হিড়িক দেখা যায়, জিনিসটা আমি ব্যক্তিগতভাবে খুবই এনজয় করি!

তবে প্রবলেমটা হলো আমাদের দেশের অধিকাংশ মিউজিয়ামের কিউরেশন। বাংলাদেশের অধিকাংশ মিউজিয়ামের কিউরেশন এতটাই প্রি হিস্টোরিক যে কিছুক্ষণ ঘোরার পরেই জায়গাটাকে স্রেফ পুরনো আমলের ধুলোমাখা ঘরবাড়ি মনে হতে থাকে। কাচের ওপারে রাখা পুরনো শোপিসগুলোকে কেবলমাত্র ছবি বা রিলের ব্যাকড্রপ মনে হয়। এতে মিউজিয়াম হ্যাং আউট অনেকের কাছেই বোরিং লাগতে শুরু করে।

তবে প্যারা নাই! কিছু ট্রিকস আছে, যেগুলো ফলো করতে পারলে আপনার হ্যাং আউটটা স্রেফ কয়েকটা রিল আর ছবির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, একটা শক্তিশালী ডিসকভারি হয়ে উঠতে পারে । আজকের লেখায় আমরা সেসব স্মার্ট হেরিটেজ হ্যাকিং টিপস অ্যান্ড ট্রিকস নিয়ে আলাপ করবো। এতো সিরিয়াসলি না পড়ে, হালকা একটু চোখ বুলান আর জলদি একটা মিউজিয়াম ডেটের প্ল্যান সাজিয়ে ফেলুন!

মিউজিয়ামে ঢোকার আগেই আপনার এক্সপ্লোরেশন শুরু করা উচিত। কেন? কারণ মিউজিয়ামের কালেকশনগুলো টুপ করে উড়ে আসেনি; ওগুলো ওই এলাকারই মাটি আর মানুষের কয়েকশ বছরের লিগ্যাসি।

সাইনবোর্ড পড়ার ট্র্যাপে পা দেবেন না!

বাংলাদেশের যেকোনো মিউজিয়ামে ঘুরতে গেলে দেখবেন, মিউজিয়ামের সামনে একটা সাইনবোর্ডে মিউজিয়ামের হিস্ট্রির একটা বোরিং, আনক্রিয়েটিভ থিসিস লেখা আছে। এইসব সাইনবোর্ড অনেকটা সিনেমার শুরুতে আসা দীর্ঘ ক্রেডিট লাইনের মতো, যা শেষ হতে হতে আপনার মিউজিয়াম দেখার এনার্জি অর্ধেক শেষ হয়ে যায়। মিউজিয়াম অথরিটি সম্ভবত ভাবেন, দর্শকরা রোদে দাঁড়িয়ে কয়েক হাজার শব্দের বোরিং এই হিস্ট্রি পড়তেই টিকিট কেটেছেন! ডোন্ট ফল ফর ইট!

ইন্টারনেট থেকে নেওয়া ছবি
ইন্টারনেট থেকে নেওয়া ছবি

আপনার স্মার্টফোনটাকে আপনার পার্সোনাল গাইড হিসেবে ব্যবহার করুন। মিউজিয়ামে যাওয়ার আগের রাতে বা যাওয়ার পথে একটু গুগল বা ইউটিউব স্ক্রল করে মিউজিয়াম, তার কালেকশনের ব্যাকস্টোরিটা জেনে নিন। “That belongs in a museum!” মিম তো সবাই দেখেছেন। কিন্তু একটা জিনিস কেন মিউজিয়ামে থাকার যোগ্য, সেই হিস্টোরিক্যাল ড্রামা আপনার জানা না থাকলে আপনার কাছে মিউজিয়াম কালেকশনের বেশিরভাগ জিনিসকে জাস্ট র‍্যান্ডম থিংস মনে হতে পারে। কন্টেক্সট ছাড়া মিউজিয়াম অবজেক্ট দেখা আর সাবটাইটেল ছাড়া বিদেশি সিনেমা দেখা প্রায় একই কথা। সো মিউজিয়াম কালেকশনের ভেতরকার ইমোশন মিস ফিল করতে চাইলে মিউজিয়ামে ঢোকার আগে হালকা গুগল করে ঢুকুন।

একা যাবেন না !

একা ঘুরতে অনেকেই ভালোবাসেন, কিন্তু আমি সাজেস্ট করবো একা না যাওয়ার জন্য। হয় পার্টনার নিয়ে যান, নয়তো ভাইব্রাদার। কারণ হেরিটেজ কেবলমাত্র দেখার বিষয় না, হেরিটেজ নিয়ে ডিসকাশন দেখার আনন্দকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে তুলতে পারে। আর যাই হোক ট্রান্সপোর্ট আর ফুড কস্টিংটা ভাগাভাগি করলে পকেটের ওপর চাপটা তো অন্তত কমে।

এআই জেনারেটেট ছবি
এআই জেনারেটেট ছবি

দিনশেষে আড্ডায় বসে যখন মিউজিয়ামের কোনো অদ্ভুত রিলিক নিয়ে নিজেদের মনগড়া থিওরি কপচাবেন, তখন কালচারাল ক্যাপিটাল জাহির করার যে চখাম একটা ফিল আছে, ঐটা যে একবার পেয়েছে সেই জানে দোকা ট্রিপের মজা কী ! একা ঘুরে এই কালেক্টিভ মেমোরি তৈরির সুযোগটা আলগোছে মিস করবেন না।

আগে এলাকা দেখুন!

মিউজিয়ামে ঢোকার আগেই আপনার এক্সপ্লোরেশন শুরু করা উচিত। কেন? কারণ মিউজিয়ামের কালেকশনগুলো টুপ করে উড়ে আসেনি; ওগুলো ওই এলাকারই মাটি আর মানুষের কয়েকশ বছরের লিগ্যাসি।

তাই মিউজিয়ামে ঢোকার আগে ওই এলাকার অলিগলি আর জীর্ণ পুরনো বাড়িঘরগুলো একটু ঘুরে দেখুন। যদি পাশে কোনো পুরনো নদী থাকে, তবে নদীর পাড় থেকেই এক্সপ্লোর করা শুরু করুন। প্রাচীন নগরীগুলো সাধারণত নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠতো! মিউজিয়ামের কাচের বাক্সে সাজিয়ে রাখা ওই প্রাচীন আসবাব বা মূর্তির ব্যবহারকারীরা একসময় এই এলাকারই কোনো এক নগরে বা গ্রামে থাকতেন। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা জরাজীর্ণ ওই বিল্ডিংটা হয়তো আজ বড্ড বেমানান, কিন্তু ওটাও মিউজিয়ামে রাখা ইতিহাসেরই একটা জ্যান্ত অংশ।

ঢাকা সিটি অ্যাক্রস বুড়িগঙ্গা রিভার নামের ফ্রেডরিখ উইলিয়াম অ্যালেক্সান্ডারের পেইন্টিং
ঢাকা সিটি অ্যাক্রস বুড়িগঙ্গা রিভার নামের ফ্রেডরিখ উইলিয়াম অ্যালেক্সান্ডারের পেইন্টিং

সো, ইনসাইড স্টোরি বোঝার আগে আউটসাইড ভাইব নেওয়াটা মাস্ট!

মিউজিয়ামের অবজেক্টগুলো যদি শরীর হয়, তবে ওই এলাকার খাবার, আঞ্চলিক ভাষা আর লোকজ সংস্কৃতি হলো তার প্রাণ। শরীর (অবজেক্ট) দেখার পর তার প্রাণের (কালচার) স্বাদ না নিলে সেই দেখাটা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়।

টেস্ট দ্য লোকাল, টেস্ট দ্য হিস্ট্রি

ঘুরতে ঘুরতে টায়ার্ড হয়ে গেলে কোনো আল্ট্রা মডার্ন ক্যাফেতে ঢুকে বার্গার-পিৎজ্জা অর্ডার করে ভাইবটা নষ্ট করবেন না। বরং লোকাল কাউকে জিজ্ঞেস করে সেই এলাকার সবচেয়ে পুরনো খাবারের দোকানটিকে খুঁজে বের করুন। হেরিটেজ ট্রিপে গিয়ে লোকাল টেস্ট মিস করা মানে কিন্তু ইতিহাসের একটা বড় অংশই অজানা থেকে যাওয়া।

এই যে আপনি মিউজিয়ামের কাচের বক্সে শত বছর আগের কোনো থালা বা বাটি দেখলেন, সেটার পেছনের আসল কন্টেক্সট কিন্তু শুধু দেখেই বুঝে ফেলবেন–এমন নয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্বের প্রফেসর মাসউদ ইমরান মান্নু একবার আমাকে এই বিষয়ের ফিলোসফিটা দারুণভাবে বুঝিয়ে বলেছিলেন, 'একটা জাদুঘরের প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু কেবল মাটির নিচে পাওয়া কোনো ‘জিনিস’ নয়; এটি একটি বিশেষ সময়ের মানুষের জীবনযাপনের সাক্ষ্য। আর সেই বস্তুর পেছনের আসল আত্মা লুকিয়ে থাকে সেই এলাকার ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ বা মানুষের রীতিনীতি ও জীবনধারার মধ্যে।'

সহজ কথায়, মিউজিয়ামের অবজেক্টগুলো যদি শরীর হয়, তবে ওই এলাকার খাবার, আঞ্চলিক ভাষা আর লোকজ সংস্কৃতি হলো তার প্রাণ। শরীর (অবজেক্ট) দেখার পর তার প্রাণের (কালচার) স্বাদ না নিলে সেই দেখাটা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। শত বছর আগের যে মানুষটি মিউজিয়ামে রাখা মাটির পাত্রে খাবার খেত, তার উত্তরসূরিরা হয়তো আজও এলাকার কোনো দোকানে প্রাচীন সিক্রেট রেসিপিতে মিষ্টি বানাচ্ছে। সেই মিষ্টির স্বাদ বা ঐতিহ্যবাহী কোনো খাবারের নামের মধ্যেই সাধারণত লুকিয়ে থাকে সেই প্রাচীন জনপদের মানুষের পছন্দ-অপছন্দ আর জীবনধারা।

তাই আসল মুন্সিয়ানা হলো মিউজিয়ামের পাশাপাশি সেই এলাকার লোকালয়কেও ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করা। বিশ্বাস করুন, ওই লোকাল মিষ্টিতে একটা বাইট আপনাকে ইতিহাসের যতটা কাছাকাছি নিয়ে যাবে, কোনো থিওরি তা পারবে না!

মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ সবার জন্য সবকিছু সাজিয়ে রাখলেও, এর প্রতিটা অবজেক্ট যে আপনার ভালো লাগবে এমন কোনো কথা নেই। তাই আমার সাজেশন হলো পুরো মিউজিয়াম একবার ঝটিকা সফর দিয়ে আপনার পার্সোনাল ইন্টারেস্টের সাথে মেলে এমন ‘টপ থ্রি’ জিনিস খুঁজে বের করুন।

বি ইউর ওউন কিউরেটর

ঘোরাঘুরি, খাওয়া দাওয়া আর জিরিয়ে নেওয়া শেষ? এবার মূল গেমে হাজিরা দেয়ার পালা।

মিউজিয়ামে ঢুকে যখন দেখবেন শত শত প্রাচীন মুদ্রা, হস্তশিল্প কিংবা মিনিয়েচার মডেল আপনার দিকে তাকিয়ে আছে, তখন ওভারওয়েলমড হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। অধিকাংশ মানুষ যেটা করেন, সবকিছু একসাথে গোগ্রাসে গিলতে গিয়ে দিনশেষে কিছুই মনে রাখতে পারেন না।

মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ সবার জন্য সবকিছু সাজিয়ে রাখলেও, এর প্রতিটা অবজেক্ট যে আপনার ভালো লাগবে এমন কোনো কথা নেই। তাই আমার সাজেশন হলো পুরো মিউজিয়াম একবার ঝটিকা সফর দিয়ে আপনার পার্সোনাল ইন্টারেস্টের সাথে মেলে এমন ‘টপ থ্রি’ জিনিস খুঁজে বের করুন। সবকিছুর লেবেল পড়ে মাথা ভারি না করে এই তিনটা জিনিসের ওপর ফোকাস করুন। ওগুলোর নাম আর তারিখের একটা মেন্টাল নোট (বা ফোনের নোটপ্যাডে) নিয়ে রাখুন। মিউজিয়ামে শুধু এর অবয়বটা দেখুন, আর বাসায় ফিরে ওই তিনটা জিনিস নিয়ে হালকা গুগল করে ওগুলোর পেছনের হিস্টোরিক্যাল ড্রামা বা স্ক্যান্ডালগুলো খুঁজে বের করুন।

পুরো মিউজিয়ামের ইতিহাস এক দিনে মুখস্থ করার চেয়ে ওই তিনটি বস্তুর ব্যাক স্টোরি জানা আপনাকে অনেক বেশি তৃপ্তি দেবে।

সার্চ ফর লোকাল স্যুভেনিওর

মিউজিয়াম থেকে বের হওয়ার সময় গেটের পাশের গিফট শপে চড়া মূল্যে কিছু প্লাস্টিক বা সিরামিকের জেনেরিক শোপিস দেখে আপনার কেনার ঝোঁক চাপতেই পারে। একটা চেক ইন দেয়ার টোকেন হিসেবে এই ভুলটা করবেন না প্লিজ। বরং সাজেশন হলো, মিউজিয়ামের সেই ওভারপ্রাইসড গিফট শপে সময় নষ্ট না করে বরং ওই এলাকার লোকাল মৃৎশিল্পী বা তাঁতিদের খোঁজ করুন।

মিউজিয়ামের কাচের ভেতরে আপনি যে প্রাচীন মোটিফ দেখে মুগ্ধ হলেন, সেই লিগ্যাসির একটা অংশ হয়তো আজও ওই এলাকার কোনো কারিগরের হাতে জ্যান্ত অবস্থায় টিকে আছে। তাদের কাছ থেকে কিছু কেনা মানে সরাসরি সেই হেরিটেজ ট্র্যাডিশনটাকে জ্যান্ত রাখা।

এতে যেমন আপনার সংগ্ৰহটা অনেক বেশি ইউনিক আর এস্থেটিক হবে, তেমনি আপনার ড্রইংরুমে রাখা ওই জিনিসের পেছনে থাকবে একটা সত্যিকারের গল্প। মেড ইন ফ্যাক্টরির ভিড়ে একটা মেড ইন লোকাল হেরিটেজ স্যুভেনিওর আপনার পার্সোনাল আর্কাইভের ওজন অনেক গুণ বাড়িয়ে দেবে।

তো নেক্সট মিউজিয়াম হ্যাং আউটের প্ল্যানটা কবে করছেন? সে যবেই হোক না কেন, হ্যাপি মিউজিয়াম হান্টিং!

সম্পর্কিত