বেলা তার কি শুধুই সিনেফাইলদের জাতে ওঠার সিঁড়ি

স্ট্রিম গ্রাফিক

হাঙ্গেরিয়ান মাস্টার ফিল্মমেকার বেলা তার মারা যাওয়ার খবরটা ব্রেকিং নিউজে আসার পর আমার সোশ্যাল মিডিয়া ফিড অদ্ভুত এক প্যারাডক্সের মুখোমুখি দাঁড়ায়ে আছে ৷

পরিচিত ভাইব্রাদার, যারা স্করসেজির 'দ্য আইরিশম্যান' দেখতে দেখতে মাঝপথে ঘুমায় যাওয়ার পোস্ট দিছিলেন, তারাও দেখলাম 'রেস্ট ইন পিস লেজেন্ড' লেইখা ফেসবুকে একের পর এক স্ট্যাটাস মারতেছেন ৷ আরেক দল ভাইব্রাদার আছেন যারা জিগাইতেছেন, ‘কিসের তার?’ আর সাথে সাথে গুগল সার্চবারে ডেস্পারেটলি টাইপ করতেছেন ‘Béla Tarr famous movies’ ৷ আর এর ঠিক মাঝামাঝি আছেন কিছু সিরিয়াস সিনেফাইল ভাইব্রাদার, যারা তাদের লেটারবক্সড প্রোফাইলটারে সিভির থিকাও বেশি মেনটেইন করেন, তারা দুঃখের চোটে এতোটাই কাবু হয়ে পড়ছেন যে তাদের সাথে স্বাভাবিক আলাপটাও চালায়ে নিতে পারতেছিনা ৷

পপ কালচারে বেলা তার ইজ নট অ্যান অর্ডিনারি নেইম ৷ টারান্টিনো, নোলান বা ফিঞ্চার দেখাটা যদি হয় বিগিনার বা ইন্টারমিডিয়েট লেভেলের ঘটনা, তবে বেলা তার দেখাটা আসলে একটা প্রো লেভেলের জিনিস ৷ বেলা তারকে দেখা, বোঝা এবং হজম করা— এই ডিজিটাল জমানায় একটা আল্টিমেট ফ্লেক্স ৷

বেলা তার। ছবি: ইন্টারনেট
বেলা তার। ছবি: ইন্টারনেট

কিন্তু প্রশ্ন হইলো, কেন? কেন এই হাঙ্গেরিয়ান ফিল্মমেকারের বিষাদমাখা, স্লো পেস ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ওয়ার্ল্ড এত হাইপের? কেন তার মুভি না দেখলে আপনি নিজেরে এলিট সিনেফাইল দাবি করতে পারবেন না?

টাইমের সাথে কোনো রকম কম্প্রোমাইজ করবেন না বইলা বেলা তার জেনারেলি সিনেমায় কোনো কাট ইউজ করেন না ৷ এই কারণে দেখা যায়, তার ক্যারেক্টাররা ১০ মিনিট ধইরা স্ক্রিনে খালি হাঁটতেই থাকে আর স্ক্রিনে বৃষ্টি পড়তে থাকে অনন্তকাল ৷ এই টেম্পোরাল রিয়েলিজম হয়তো সরাসরি এন্টারটেইন করে না, কিন্তু অডিয়েন্সকে এমনভাবে পরিস্থিতির ভেতর ঢুকায় দেয় যে সেখান থেকে সহজে বের হয়ে যাওয়াও একটা কসরতের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় ৷

রিলাসক্ত ব্রেইনের ত্রাস

আমরা বাস করতেছি এক ডোপামিন অ্যাডিকশনের যুগে ৷ কবির ভাষায় আমাদের অ্যাটেনশন স্প্যান নাকি গোল্ডফিশের চেয়েও কম ৷ ১৫ সেকেন্ড বা দেড় মিনিটের রিল বা শর্টস দেখতে দেখতে আমাদের ব্রেইন এমন হয়া গেছে যে ৫ মিনিটের ইউটিউব কন্টেন্টরে ডকুমেন্টারি মনে হয় ৷ ঠিক এই সময়ে দাঁড়ায়ে বেলা তার আমাদের সামনে হাজির হন তার মাস্টারপিস 'সাতান্তাঙ্গো' নিয়া ৷

ছবি: আইএমডিবি
ছবি: আইএমডিবি

এর ডিউরেশন? সাড়ে সাত ঘণ্টা, টু বি এক্স্যাক্ট ৪৫০ মিনিট ৷

বিঞ্জ ওয়াচ তো দূরের কথা, এই সিনেমা দেখাটা ম্যারাথনে দৌঁড়ানো বা আয়রন ম্যান ট্রায়ালথনে পার্টিসিপেট করার কাছাকাছি একটা ঘটনা, বা এইটারে একটা এন্ডিউরেন্স টেস্টও বলা যাইতে পারে ৷ টাইমের সাথে কোনো রকম কম্প্রোমাইজ করবেন না বইলা বেলা তার জেনারেলি সিনেমায় কোনো কাট ইউজ করেন না ৷ এই কারণে দেখা যায়, তার ক্যারেক্টাররা ১০ মিনিট ধইরা স্ক্রিনে খালি হাঁটতেই থাকে আর স্ক্রিনে বৃষ্টি পড়তে থাকে অনন্তকাল ৷ এই টেম্পোরাল রিয়েলিজম হয়তো সরাসরি এন্টারটেইন করে না, কিন্তু অডিয়েন্সকে এমনভাবে পরিস্থিতির ভেতর ঢুকায় দেয় যে সেখান থেকে সহজে বের হয়ে যাওয়াও একটা কসরতের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় ৷

এই জন্য যখন কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘সাতান্তাঙ্গো’ দেখার এক্সপেরিয়েন্স শেয়ার করেন, তিনি যে আসলে ফাস্টফুড কালচারের পার্ট না, তিনি যে হার্ড আর্ট কনজিউম করতে পারেন এমন স্টেটমেন্টই হয়তো এন্ডোর্স করতে চান ৷ আমার ধারণা এই ব্র্যাগিং রাইটই বেলা তারকে পপ কালচারের কাল্ট ফিগারে পরিণত করেছে ৷

বেলা তার কি শুধুই আঁতলামি?

বেলা তারকে নিয়া এই যে আঁতেল বা স্নব ট্যাগ, এইটা থিকা একবার বাইর হইলে ফিল্ম হিস্ট্রির কঠিন এক ফিলোসফির মুখোমুখি হইতে পারা যাবে ৷

ফিল্ম থিয়োরির ভাষায় বেলা তারের কাজগুলারে ‘স্কাল্পটিং ইন টাইম’ বলা যায় ৷ তিনি যে সিনেমায় কাট দিতে চাইতেন না এর মেইন কারণ হইলো উনি মনে করতেন সিনেমায় কাট দেয়া মানে অডিয়েন্সের লগে প্রতারণা করা ৷ বেলা তার চাইছিলেন আমরা যেন বোরডমরে নতুন কইরা ডিসকাভার করি ৷

ছবি: আইএমডিবি
ছবি: আইএমডিবি

ফলে উনার বিখ্যাত লংটেকগুলা কোনো কারিকুরি দেখানোর পায়তারা না ৷ এই জিনিসটা আপনি ফিল করবেন যখন ‘তুরিন হর্সের’ বাপ মাইয়ার ডেইলি একই ওয়েতে সেদ্ধ আলু খাওয়ার সিনটা দেখেন ৷ কোনো ডায়লগ নাই, কোনো বিজিএম নাই, খালি চামচ নাড়া আর বাতাসের হাহাকার মাখা সাউন্ড ৷ কী যে বিউটিফুল! জীবন মানেই যে খালি ড্রামা আর ক্লাইম্যাক্সের ঘটনা না, জীবন মানে যে রেগুলার একই কাজ কইরা যাওয়া আর এক্সিস্টেন্স টিকায় রাখার ক্লান্ত বোরডম- বেলা তার আমাদের এই সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন বারবার ৷ আর এই জন্যই মেবি লং টেকগুলা উনার নিতে হইছে ৷

বেলা তারের সিনেমার কথা আসলেই আপনার হাঙ্গেরিয়ান নভেলিস্ট, নোবেল প্রাইজ উইনার লাসলো ক্রাজনোহরকাইয়ের আলাপ তুলতে হবে ৷ বেলা তার কিন্তু শুরু থিকাই স্লো মুডে ছিলেন না। উনার গিয়ার শিফটিংয়ের ঘটনাটাই সম্ভবত উনার লাইফে লাসলোর সবচেয়ে বিগেস্ট ইম্প্যাক্ট। লাসলোর উপন্যাস অবলম্বনে বেলা তারের ড্যামনেশন, ওয়ের্কমেইস্টার হারমোনিজ আর ‘সাতান্তাঙ্গো’ বানানো হইছিলো।

লোন উলফ ফেনোমেনা ভার্সেস রিয়েলিটি

ফিল্মে দেখবেন ডিরেক্টররে খালি সর্বেসর্বা বানায়া পূজা করবার চল আছে সব জায়গায় ৷ বেলা তারের বেলায়ও আমরা এই ঘটনা দেখছি। এই ঘটনা জায়েজ করতে কেউ কেউ আবার বেলা তারের ওই কোটটা শেয়ার মারেন যেখানে বেলা তার বলতেছিলেন, ‘আমার কোনো পাওয়ারটাওয়ার নাই, খালি ক্যামেরাটাই আছে।’ ঘটনা সত্যি বাট বেলা তার কোন লোন উলফ নন ৷ তার ইউনিক ভিজ্যুয়াল স্টাইল, অনন্ত বিষাদ বা কসমিক নিহিলিজম— এইটা তার একক সৃষ্টি বইলা মানতে আমি অন্তত নারাজ ৷

আমার কাছে বরাবরই উনার সিনেমারে একটা কালেক্টিভ আর্টের ঘটনা মনে হইছে ৷

লাসলো ক্রাজনোহরকাই। সংগৃহীত ছবি
লাসলো ক্রাজনোহরকাই। সংগৃহীত ছবি

কারণ, বেলা তারের সিনেমার কথা আসলেই আপনার হাঙ্গেরিয়ান নভেলিস্ট, নোবেল প্রাইজ উইনার লাসলো ক্রাজনোহরকাইয়ের আলাপ তুলতে হবে ৷ বেলা তার কিন্তু শুরু থিকাই স্লো মুডে ছিলেন না। উনার গিয়ার শিফটিংয়ের ঘটনাটাই সম্ভবত উনার লাইফে লাসলোর সবচেয়ে বিগেস্ট ইম্প্যাক্ট। লাসলোর উপন্যাস অবলম্বনে বেলা তারের ড্যামনেশন, ওয়ের্কমেইস্টার হারমোনিজ আর ‘সাতান্তাঙ্গো’ বানানো হইছিলো। স্ক্রিনপ্লেতেও লাসলো সরাসরি কাজ করছিলেন বেলা তারের সাথে । তুরিন হর্সের কো রাইটারও ছিলেন লাসলো ৷

জটিল বাক্য লেখায় লাসলোর খ্যাতি আছে ৷ এই জটিলতাই বেলা তারের ফিল্মে লং শটে ট্রান্সফর্মড হইছে বইলা আমার মাঝেমধ্যে মনে হয় ৷ শুধু তা-ই না, বেলা তারের সিনেমা জগতের যে স্লো পেস, দার্শনিক ভার আর অস্তিত্ববাদী অন্ধকার এইটার জন্য লাসলো ক্রাজনোহরকাইয়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।

অ্যাগনেস হ্রানিৎস্কি। সংগৃহীত ছবি
অ্যাগনেস হ্রানিৎস্কি। সংগৃহীত ছবি

এর পাশাপাশি আরেকজনের কথা আমি বিশেষভাবে বলতে চাই ৷ বেলা তারের এডিটর,কো ডিরেক্টর অ্যান্ড ওয়াইফ অ্যাগনেস হ্রানিৎস্কি ৷ উনার সিনেমার রিদম অ্যান্ড পেসিংয়ের কারিগরি দিকটার মেইন ক্রেডিট অ্যাগনেসের ৷ বেলা তাররে মনে রাখতে হইলে উনার এই টিমরেও আমাদের স্মরণে রাখতে হবে ৷

২০১১ ‘তুরিন হর্স’ বানানোর পর বেলা তার ঘোষণা দিছিলেন, 'তুরিন হর্স দিয়া আমি এমন জায়গায় পৌঁছাইছি যেখানে আমার কাজ সমাপ্ত।' ফলে এই ডেথ কেবলমাত্র সেই নীরবতার এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ৷

এস্থেটিক বিষাদ

ইনস্টা বা টাম্বলারে আজকাল ডার্ক এস্থেটিক বা মুডি ভাইব বেশ পপুলার হইছে ৷ বেলা তার হইতেছেন সেই আর্টের গডফাদারসম এক ফিগার ৷

ওয়ের্কমেইস্টার হারমোনিজের দৃশ্য। সংগৃহীত ছবি
ওয়ের্কমেইস্টার হারমোনিজের দৃশ্য। সংগৃহীত ছবি

আমি তো জীবনেও ভুলোমুনা ওয়ের্কমেইস্টার হারমোনিজের ওই দৃশ্যটার কথা, যখন শহরের মাঝখানে ট্রাকে কইরা বিশাল তিমি মাছটারে নিয়ে আসা হইল ৷ ঐ তিমি মাছটা ছিল পোস্ট কমিউনিস্ট হাঙ্গেরির ধইসা পড়া স্বপ্ন, ভয় আর অনিশ্চয়তার একটা সিম্বল ৷ তার ফ্রেমে ফ্রেমে যে কুয়াশা, কাদা আর জরাজীর্ন দেয়াল— তা বারবার এমন এক ডিস্টোপিয়ান ওয়ার্ল্ডের ফিল দিতেছিলো, মনে হইতেছিল রাজনীতি যেন বা স্লোগান থিকা বের হয়ে গিয়ে এক ভিজ্যুয়াল মেটাফরে আইসা দাঁড়াইছে ৷

বেলা তারকে যে কারণে মিস করব?

২০১১ ‘তুরিন হর্স’ বানানোর পর বেলা তার ঘোষণা দিছিলেন, 'তুরিন হর্স দিয়া আমি এমন জায়গায় পৌঁছাইছি যেখানে আমার কাজ সমাপ্ত।' ফলে এই ডেথ কেবলমাত্র সেই নীরবতার এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ৷

তবে, আজকের এই কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের যুগে, সবাই যখন খালি লাইক, কমেন্ট, শেয়ার অ্যান্ড সাবস্ক্রাইবের পিছনে দৌঁড়াদৌড়ি করতেছে, সেই বাস্তবতায় বেলা তার উইল বি রিমেম্বার্ড এজ আ ফিল্ম মংক! উনি জানতেন উনার ফিল্ম এত লোক দেখবে না, উনি জানতেন উনারে লোকে বোরিং ভাববে, তারপরেও তার ক্রিয়েটিভিটি, ভিশন আর ওয়ার্কের সাথে আপস করেন নাই ৷ গাটসি আর্টিস্টিক ইমেইজের ভিতর ফ্রেইমড বেলা তার আমাদের শিখায় গেছেন একটানা বৃষ্টির দিকে তাকায় থাকাটা কোনো সময় নষ্টের ঘটনা না, বা নীরবতা সব সময় একটা ফাঁপা জিনিস না ৷ নীরবতারও ওজন আছে ৷ আর ঐ ওজনটা বিয়ার করার ক্ষমতাই হইলো বেলা তারের লিগ্যাসি ৷

এই আরকি !

বিষয়:

বেলা তার

সম্পর্কিত