leadT1ad

সুমন সাজ্জাদ

সিনেমা দেখার দিনগুলো

স্ট্রিম গ্রাফিক

লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন...ফ্ল্যাশব্যাক। আমরা এখন পিছিয়ে যাবো এই সময় থেকে অন্য এক সময়ে। বাংলাদেশের তখন দেড় দশক, যখন ঘরে ঘরে টিভি ছিল না, যখন শাড়ি দিয়ে ঘিরে দেয়া হতো মেয়েদের রিকশা, সোভিয়েত রাশিয়া তখনও ভাঙেনি, হকারেরা তখনও ঘরে ঘরে দিয়ে যায় ‘উদয়ন’, পত্রিকা বলতে সেই ‘ইত্তেফাক’ আর ‘বিচিত্রা’। গল্পগুলো সেই সময়ের কিংবা সেই সময়ে ছুঁয়ে থাকা এইসব গল্প।

দৃশ্য: ১

লংশট।

Ad 300x250

দূর থেকে দেখা যাবে আঁকাবাঁকা মাটির রাস্তা। ঝোপঝাড়। বাঁশবন। শ্যাওড়া গাছ। শিউলি গাছ। সেই পথে একদল শিশু। খালি পা। দল বেঁধে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে। চোখেমুখে আনন্দ। মাটির রাস্তা পেরিয়ে মূল রাস্তায় উঠল তারা। ইটের রাস্তা। শিশুর দল মোড় ঘুরল।

মিড শট।

ঝুমুর সিনেমা হল। রঙিন পোস্টার। টিকিট কাউন্টার। সিনেমার বিশাল হোর্ডি। লম্বামতো একটা ছেলে। ওর হাতে প্লাস্টিকের প্যাঁচানো ফালি। বোঝা যাচ্ছে, ছেলেদের মধ্যে ও-ই নেতা।

ক্লোজ আপ।

লম্বামতো ছেলেটির হাতে রিল। বাকিদের দেখিয়ে বলছে, ‘এইটা দিয়েই সিনেমা দেখায়। এইটাই রিল।’ অন্যরা বিস্ময় নিয়ে দেখছে। রিল! কে যেন বলল, ওই তো শাবানা! কেউ বলল, নাহ, ববিতা!

চার দশক পেরিয়ে গেলে এরকম একটি চিত্রনাট্যই মঞ্চস্থ হতে দেখি স্মৃতির আলো-ছায়ার রুপালি পর্দায়। ১৯৮৬ সালের ছোট্ট এক মফস্বলে একদিন ঠিক এভাবেই পেয়ে গিয়েছিলাম সিনেমার রিল। কিন্তু অপেক্ষা করছিল আরও এক বিস্ময়। লম্বামতো দুষ্টুদের অধিপতি সেই ছেলেটি বলল, সন্ধ্যায় সবাইকে সিনেমা দেখাবে। টিকিট পঁচিশ পয়সা।

বাড়ি থেকে প্রত্যেকে পঁচিশ পয়সা করে নিয়ে দলবেঁধে হাজির। ঝোপঝাড়, বাঁশবন আর শ্যাওড়া গাছের পাশে ছোট্ট একটা খুপরি ঘরে আলো জ্বলছে। আমাদের সামনে সাদা পর্দা। পেছনে একটা অংশে কালো কাপড়ের আড়াল। সেখানে সেই ছেলেটির দপ্তর। সে বলল, এখন আলো নেভানো হবে। কেউ যেন ভয় না পায়।

একটু পর ওর দপ্তর থেকে আলোর ঝলক পেরিয়ে ছবি ফুটে উঠল সাদা পর্দায়। সত্যি সত্যিই সাদা-কালো আমরা দেখতে পেলাম রাজ্জাক ও শাবানার ছবি। সিনেমা হলে সিনেমা দেখার আগে এ-ই ছিল আমাদের সিনেমা-দর্শন!

রাজ্জাক ও শাবানা। সংগৃহীত ছবি
রাজ্জাক ও শাবানা। সংগৃহীত ছবি

এরপর ‘উদয়নে’র পাতা কেটে জোড়া দিলাম সারি সারি রঙিন ছবি। ছবিগুলোর দুই মাথায় আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিলাম দুটো পাটকাঠি। দেখে মনে হলো, ছবির লম্বা রিল। একটা কাগজের কার্টুন কেটে পাটকাঠির দুই মাথা এমন লাগিয়ে দিলাম, যাতে করে একটা কাঠি ঘুরালে অন্য কাঠিটাও ঘোরে আর একটার পর একটা ছবি দেখা যায়। কার্টুনের সামনের অংশ চৌকোণা করে কেটে দিলাম। আমরা এই বাকশোর নাম দিলাম ‘সিনেমা’।

দৃশ্য: ২

লংশট।

ভটভট শব্দ তুলে ছুটে যাচ্ছে বেবিট্যাক্সি। ট্যাক্সির চারদিকে সিনেমার পোস্টার। মাইক বাজছে। মাইকম্যান বলছে, ‘সিনেমা সিনেমা সিনেমা। হ্যাঁ ভাই... আসিতেছে... কাকলী সিনেমায়... গান বাজছে, ‘তুমি ডুব দিও না/ জলের কন্যা/ ঝিনুক খুঁজে পাইবা না...।’

ক্লোজআপ।

হঠাৎ বেবিট্যাক্সি থেকে ছড়িয়ে দেয়া হবে ছোট ছোট লিফলেট। ছেলেমেয়েরা হুমড়ি খেয়ে কুড়াতে থাকবে। যারা কুড়াতে পেরেছে, তাদের মুখে পরিতৃপ্তি। হাসিহাসি মুখে তারা দেখছে লিফলেটের ছবি।

আশি থেকে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি এরকম দৃশ্য চোখে পড়ত। পড়বে না কেন! আমাদের শহরে ছিল একটা নয়, দুইটা নয়, ছয়টি সিনেমা হল—সত্যবতী, রূপকথা, কাকলী, পদ্মা, লিখন, মেঘনা। আরও একটা নাকি ছিল, পরে টাউন হল বানানো হয়েছে। ভাবা যায়! ছোট্ট একটা শহরে ছয়টি সিনেমা হল। সব হলেই দর্শক টইটম্বুর। ম্যাটিনি শো, ইভিনিং শো, নাইট শো...! আসনবিন্যাসেরও বাহারি নাম স্টল, ড্রেস সার্কেল, ডিসি, ভিআইপি!

ঈদের সময় একই অবস্থা। অধিকাংশ বন্ধুর গন্তব্য সিনেমা হল। সব কয়টা হলের সব সিনেমা দেখা ছিল অহংকার আর গৌরবের ব্যাপার। সেই গৌরব প্রাপ্তির সুযোগ আমার হয় নি। বন্ধুরা এসে সিনেমার গল্প শোনায়। সিনেমার নাম ‘বন্ধু আমার’, ‘ডিস্কো ড্যান্সার’। মাসের পর মাস আমাদের শহরে চলতে থাকে তোজাম্মেল হক বকুলের ‘বেদের মেয়ে জোস্না’।

বেশির ভাগ সময় আমরা বসতাম ড্রেস সার্কেলে। সিনেমা হলের পরিচিতদের সূত্রে বিনা পয়সায় কিংবা কম পয়সায় দেখতে চাইলে বসতে হতো স্টল-এ। পর্দার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘাড় ব্যথা হয়ে যেত। একবার শুনেছিলাম পর্দায় ফণা তোলা সাপ দেখে ছাতা দিয়ে গুঁতা মেরে হলের পর্দা ছিঁড়ে ফেলেছিল এক বুড়ো লোক।

বন্ধুদের কেউ কেউ তখন স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখে। নাম কী? ‘র‍্যাম্বো’, কিংবা ‘নতিজা’, ‘অবুঝ দুটি মন’; বাড়ি ফিরে শত মিথ্যার ফুলঝুড়ি। কিন্তু শার্টে সিগারেটের গন্ধ। অতএব অপ্রসন্ন ভাগ্য। চড়-চাপড়। ভাত বন্ধ। এই ছিল এক বিপদ—সিনেমা হলে যাওয়ার মানে হলো তিন ঘণ্টায় সিগ্রেটের গন্ধে সিদ্ধ হয়ে আসা। যেকেউ ধরে ফেলতে পারত।

বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। ভাই-বোন-বন্ধুরা মিলে সিনেমা দেখতে যাই। দেখতে দোষ নেই। সিনেমার নাম ‘শিমুল পারুল’ অথবা মিঠুন চক্রবর্তীর ‘অবিচার’, মান্না-চম্পা কিংবা সালমান শাহ-শাবনূরের কোনো ছবি। আমরা তখন নায়ক-নায়িকাদের নাম মুখস্থ করি। ভিলেনদের নাম বড় অদ্ভুত জাম্বো, ড্যানি সিডাক, গাঙ্গুয়া।

দুর্গাপূজায় আলোর উচ্ছ্বাসে ভরে উঠেছে পুরো শহর। আমরা সিনেমা হলে ঢুকি। সিনেমার নাম ‘আলোমোতি প্রেমকুমার’, ‘নাগ-নাগিনীর প্রেম’। আমিত্তি খেতে খেতে আমার কোনো কোনো বন্ধু এক হলের সিনেমা শেষ করে অন্য হলে যায়।

ঈদের সময় একই অবস্থা। অধিকাংশ বন্ধুর গন্তব্য সিনেমা হল। সব কয়টা হলের সব সিনেমা দেখা ছিল অহংকার আর গৌরবের ব্যাপার। সেই গৌরব প্রাপ্তির সুযোগ আমার হয় নি। বন্ধুরা এসে সিনেমার গল্প শোনায়। সিনেমার নাম ‘বন্ধু আমার’, ‘ডিস্কো ড্যান্সার’। মাসের পর মাস আমাদের শহরে চলতে থাকে তোজাম্মেল হক বকুলের ‘বেদের মেয়ে জোস্না’।

সিনেমা হল ছিল অদ্ভুত এক জায়গা। হইচই, হাসি, মারামারি কী নেই! গল্পের কারণে কোনো কোনো সিনেমায় নায়ক-নায়িকার প্রবেশ একটু দেরিতে হতো। ধরা যাক, দশ মিনিট। দর্শকরা তাতেই অধৈর্য হয়ে পড়তেন। নায়িকা আসামাত্র সে কী উচ্ছ্বাস। নায়ক-নায়িকা একটু ঘনিষ্ঠ হলে শিসের পরিমাণ বেড়ে যেত। অ্যাকশন সিনেমায় নায়ক যখনই ভিলেনকে কুপোকাৎ করত তখনই তালি বাজাত হলভর্তি দর্শক, ‘...দে মাইর।’ সিনেমার অ্যাকশন দেখতে দেখতে কখন মারামারি লেগে যেত দর্শকদের মধ্যে।

নতুন সিনেমা হল হচ্ছে—‘মেঘনা’; ঘুরে ঘুরে দেখি, পর্দা থাকবে কোথায়, কোথায় দর্শক বসবে, কোত্থেকে চলবে প্রজেকশনের কাজ। শহর থেকে খানিকটা দূরে ‘লিখন’ সিনেমা হলের নবায়ন হচ্ছে। ‘চল, যাই, দেখে আসি’—হেঁটে হেঁটে আমরা পেরিয়ে যাই শহর। লম্বা, বড়সড় সিনেমা হল। আমরা তুলনা দেই, যশোরের ‘মণিহারে’র পর ‘লিখন’ই বোধ হয় বড় হল।

সব সিনেমা দেখতে পারি না। সেই দুঃখ ঘোচাবার পথ দুটি—এক. টিভির সামনে বসে সিনেমা দেখা, দুই. সিনেমার গানের বই কিনে আনা; সুযোগ পেলে ‘চিত্রালী’, ‘বিচিত্রা’ অথবা ‘তারকালোক’ পড়া। পত্রিকার পাতায় ছাপানো সিনেমার বিজ্ঞাপন পড়া, দুপুরে রেডিওতে সিনেমার গান শোনা।

‘চিত্রালী’তে পাওয়া যেত সিনেমার সব খবর। তবে সেসব পড়ায় দোষ ছিল। বড়রা চাইতেন না ছোটরা সেসব দেখুক বা পড়ুক। কারণও মোক্ষম। খোলামেলা পোশাক। কথা কিন্তু সত্য। ‘বিচিত্রা’ কিংবা ‘চিত্রালী’র বিনোদন অংশের বেশ খানিকটাই ছিল উষ্ণতা-জাগানিয়া। তবু মানতে হবে যে, এসব ছিল সিনেমারই দোসর।

শুক্রবার ছিল সিনেমার দিন। আদতে উৎসব। সব বাড়ি মোটামুটি প্রস্তুত। দুপুর তিনটার মধ্যে খেয়েদেয়ে সোজা টিভির সামনে। যাদের বাড়িতে টিভি নেই, তারা নিঃসঙ্কোচে চলে যেত টিভিওয়ালাদের বাড়ি। অন্যের বাড়িতে টিভি দেখা ছিল সামাজিক যোগাযোগের অংশ। টিভিওয়ালাদের কেউ কেউ যে কটুকথা বলতেন না, তাও নয়।

সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে ফুরিয়ে যেত সিনেমা। ততক্ষণ পর্যন্ত সম্মিলিত হাসি অথবা সম্মিলিত ক্রন্দন। ‘পিতা মাতা সন্তান’ সিনেমা দেখার পর এই সম্মিলিত অশ্রুপাত আমি দেখেছিলাম; সিনেমায় দেখানো হয়েছিল একটি পরিবারের মর্মান্তিক অবসান। আর তাতেই দর্শকেরা চোখ মুছতে মুছতে হল থেকে বাড়ি ফিরেছে। মনে পড়ে, ‘শুভদা’, ‘রামের সুমতি’, ‘চাঁপা ডাঙার বউ’, ‘বিরাজ বৌ’ দেখে আমাদের প্রচণ্ড মন খারাপ হয়েছিল।

দ্যা ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই’ সিনেমার একটি দৃশ্য।
দ্যা ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই’ সিনেমার একটি দৃশ্য।

‘মুভি অব দ্য উইক’ ছিল বিদেশি সিনেমার প্রধান উৎস। ‘দ্যা ব্রিজ অন দ্য রিভার কাওয়াই’ দেখেছিলাম এই আয়োজনের ভেতর। চোখে ভাসছে কিছু কাউবয় মুভির দৃশ্য। ছুটন্ত ট্রেনকে লক্ষ্য করে দৌড়াচ্ছে ঘোড়সওয়ার ডাকাতদল।

সার্ক সম্মেলনের সময় দেখা যেত অন্য দেশের ছবি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে দেখানো হতো ভারতের সিনেমা। একবার দেখলাম রাজেন তরফদারের ‘পালঙ্ক’, আরেকবার ‘গঙ্গা’, দেখলাম সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালী’। অসমিয়া ভাষার একটা ছবিও বোধ হয় দেখেছিলাম।

ভারতীয় সরকারি চ্যানেল ডিডি ওয়ান ছিল আমাদের সিনেমা দেখার আরেক উৎস। তখনও ডিশ আসেনি। শুরু হয় নি ক্যাবল টিভির প্রচার। কিন্তু বাঁশের ডগায় বাঁধা অ্যান্টেনা ঘুরালে তখন ডিডি ওয়ান দেখা যেত। সম্ভবত শনিবারে সিনেমা দেখতাম। সেদিন ভারতের বিভিন্ন ভাষার ছবি দেখার সুযোগ ছিল। মনে পড়ে, কিছু তামিল ও তেলেগু ভাষার ছবিও দেখেছিলাম। বাচ্চাদের জন্য বানানো একটা রহস্যময়-ভৌতিক ছবি দেখার পর মনে হয়েছিল বাবা-মা-বোনদের ছেড়ে কোথায় চলে গিয়েছিলাম।

সে সময় রাস্তায় বাজত ডেকসেট। বড় বড় স্পিকারে হিন্দি সিনেমার গান বাজত। ভিসিআর আর টিভিসেট ভাড়া করে গ্রামে গ্রামে অস্থায়ী সিনেমা হলও বানানো হতো। বিশেষ করে ফসল কাটার মৌসুমে—কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাস থেকে শুরু করে ফাল্গুন-চৈত্র পর্যন্ত বাজারের মাঠে টিন দিয়ে ঘেরাও করে বসানো হতো সিনেমা দেখার ‘হল’। পনের-বিশ টাকায় টিকিট কেটে বাজারে আসা লোকেরা ভিসিআরে সিনেমা দেখত—হিন্দি অথবা বাংলা।

বার্ষিক পরীক্ষা শেষ করে আমরাও পিকনিকের আয়োজনে ভিসিআর ভাড়া করে আনতাম। পুকুর পারে, খেলার মাঠে কিংবা ধানকাটা উন্মুক্ত খেতের ভেতর আমরা সিনেমা দেখতাম ‘দিল’, ‘মোহরা’, ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’, ‘চাঁদনি’। পাশের বাাড়িতে গিয়ে দেখেছিলাম অমিতাভ বচ্চনের ‘কুলি’, সঞ্জয় দত্ত-সালমান খানের ‘সাজন’।

দৃশ্য : ৩

লংশট।

ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে রিকশা। রিকশার দুই পাশে নগ্ন-অর্ধনগ্ন সিনেমা পোস্টার। মাইকম্যান বলছে, ‘হ্যাল্লো, ইয়াং ম্যান। ওয়েলকাম টু... সিনেমা। ওয়ান টিকিট বাই টু পিকচার। এক টিকিটে দুই ছবি। হংকংয়ের বিখ্যাত নায়িকা… অভিনীত। দ্যা স্লাট। চলে আসুন।’ ঘোষণার মাঝে মাঝে বাজতে থাকে ইংরেজি গান।

আমাদের মধ্যে কানাঘুষা চলে। খারাপ সিনেমা, ন্যাকেড সিন। শহরের বিভিন্ন দেয়ালে পোস্টার। আমরা চোখ আড়াল করে মুখ লুকিয়ে পোস্টার দেখি। স্কুল থেকে ফেরার পথে, রাস্তা যখন নির্জন, তখন হলের ভেতরের দিকে থাকা ছোট ছোট ভিউকার্ড আকৃতির পোস্টারগুলো দেখে আসি। খোলামেলা, উদ্দীপক সব ছবি। আমাদের সময় হয়ে ওঠে ‘আবেদনময়ী’।

চোখের সামনে বদলে গেলো সিনেমার শহর। এক টিকিটে দুই ছবির রঙিন জগৎ মুহূর্তেই সিনেমার শহরটিকে লাসভেগাস বানিয়ে ফেলল। হলের পাশের রাস্তায় দেখা গেলো সস্তা দরের স্ট্রিট হকারদের। বয়সের ধর্ম মেনে আমরাও খুঁজতে থাকি নিষিদ্ধ সিনেমা দেখার সুবর্ণ সুযোগ। আমাদের ‘প্রাপ্তমনস্ক’ বন্ধুরা অবশ্য এরই মধ্যে সুযোগের সাধ্যমতো ব্যবহার করে ফেলেছে। একদিন আমাদের মতো ‘চিকেন হার্টেড’, ‘ভদ্রসভ্য’, ‘সুশীল’দের সামনেও আবির্ভূত হয় আবেদনময়ীরা।

এক টিকিটে দুই ছবির রঙিন জগৎ মুহূর্তেই সিনেমার শহরটিকে লাসভেগাস বানিয়ে ফেলল। ফেসবুক থেকে নেওয়া ছবি
এক টিকিটে দুই ছবির রঙিন জগৎ মুহূর্তেই সিনেমার শহরটিকে লাসভেগাস বানিয়ে ফেলল। ফেসবুক থেকে নেওয়া ছবি

প্রাপ্তবয়স্কের সিনেমার এই যুগে বাংলা সিনেমায় ঢুকে পড়ে ‘কাটপিস’। বন্ধুদের মুখেই শব্দটি প্রথম শুনি। শুনতে পাই, ‘কাটপিস’ হলো সিনেমার সঙ্গে সম্পর্কহীন ‘যৌনদৃশ্য’। আর এও শুনি মেয়েরা এখন আর সিনেমা হলে যায় না। কারণ সিনেমা দেখার পরিবেশ নেই। সিনেমার দুনিয়ায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে মুনমুন ও ময়ূরীর নাম। সিনেমার পোস্টারে জ্বলজ্বল করে তাদের খোলামেলা ছবি। তাঁরা হয়তো বলেন, চিত্রনাট্যের জন্য তারা পোশাক খুলতেও রাজি।

স্মৃতির মন্তাজ

আমাদের ওই শহরের সিনেমা হলেও এসেছিল ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’। চলে নি। কয়েকজন রিকশাচালক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল, ‘পদ্মানদীর মাঝি দেখছি। পর্দা আন্ধার, কালা কুচকুচা, কিছুই দ্যাহা যায় না। হারিক্যান আর কুপিবাতি জ্বলে।’ পদ্মা নদীর অন্ধকারের দৃশ্যগুলোর কথাই তিনি বলেছিলেন। সিনেমার পর্দায় তারা হয়তো জীবনের রঙিন দৃশ্যই দেখতে চেয়েছেন।

আমার পুরোনো শহর ছেড়ে এসে দেখতে থাকি, ‘ললিতা’, ‘দ্য সেভিয়র’, ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’, ‘সান ফ্লাওয়ার’, ‘টু উইমেন’; দেখে ফেলি চার্লি চ্যাপলিনের মাস্টারপিসগুলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আয়োজনে টানা দেখতে থাকি ইরানের সিনেমাগুলো। সময়ের নিয়ম মেনে সিনেমা হল থেকে কখন সরে যাই, টেরও পাই না। আমাদের সিনেমা আটকে যায় কম্পিউটার স্ক্রিনে, সিডি-ডিভিডি প্লেয়ারে। এখন আটকে গেছে মোবাইলের স্ক্রিনে। হলকেন্দ্রিক সিনেমার সঙ্গে ধীরে ধীরে আমাদের নির্দয় বিচ্ছেদ ঘটে গেলো!

ওই শহরে বসে আমরা দেখি, জেমস ক্যামেরনের ‘টাইটানিক’। ভাই-বোনসমেত সিনেমাটা দেখেছিলাম। কেইট উইন্সলেটের উদোম শরীর দেখার আগে দশবার ভাবতে হয়েছিল। কারণ বোনেরা সঙ্গে আছে। ট্যাবু ভেঙে তবু দেখেছিলাম। আব্বা বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। হল থেকে ফিরতেই পড়লাম তাঁর সামনে। নিশ্চিত টের পেয়েছিলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কই গেছিলা?’ বললাম, ‘সিনেমা দেখতে।’ আব্বা বললেন, ‘কী সিনেমা?’ মুখ হাসি-হাসি করে বললাম, ‘টাইটানিক।’ আব্বার হাতে দা ছিল। জঙ্গলের গাছ কাটছিলেন। রেগেমেগে বললেন, ‘এককোপে গলা নামায় দিমু।’ আমার হাসিমুখ দপ করে নিভে গেলো। অধিকতর অপমানের ভয়ে আমি বাসায় ঢুকে গেলাম।

মনে পড়ে, খুব ছোটবেলায় আব্বা আর আমি রাত জেগে একটা সিনেমা দেখেছিলাম। বিখ্যাত এক নায়ক ও নারীসাংবাদিকের গল্প নিয়ে বানানো ছবি। চোখে আটকে গিয়েছিল কয়েকটি দৃশ্য। যেমন নায়ক ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে, তার সামনে দিয়ে উড়ে যাচ্ছে অসংখ্য টাকা। সামনে পেছনে টাকার পাহাড়। টাকার ভেতর থেকে হাত বাড়াচ্ছে কঙ্কাল। একসময় টাকার পাহাড়ের ভেতর ডুবে যায় নায়ক। অনেক বছর পর জেনেছিলাম ওটা সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ সিনেমার দৃশ্য। অভিনয়ে ছিলেন উত্তমকুমার। আর সুদর্শনা অভিনেত্রীর নাম শর্মিলা ঠাকুর।

একদিন ছেড়ে আসি সেই শহর। আমার আর হলে গিয়ে সিনেমা দেখা হয় না। তবু একদিন বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে দেখি, ‘কদম আলী মাস্তান’; ‘কি বাত্তি লাগাইলি ওরে ও মাইনকা’-খ্যাত ডিপলজকে দেখি। তারও অনেক পরে বলাকায় দেখি ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’। আমার হৃদয় ও শ্রুতিকে স্তব্ধ করে দেয় সিনেমার গানগুলো। বহু বছর বাদে, এক বন্ধুর বিয়েতে বেড়াতে গিয়ে অন্য এক শহরে বসে দেখে ফেলি শাকিব খানের দুটি ছবি। তার একটি ‘প্রেমের শক্তি’।

আমার পুরোনো শহর ছেড়ে এসে দেখতে থাকি, ‘ললিতা’, ‘দ্য সেভিয়র’, ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’, ‘সান ফ্লাওয়ার’, ‘টু উইমেন’; দেখে ফেলি চার্লি চ্যাপলিনের মাস্টারপিসগুলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আয়োজনে টানা দেখতে থাকি ইরানের সিনেমাগুলো। সময়ের নিয়ম মেনে সিনেমা হল থেকে কখন সরে যাই, টেরও পাই না। আমাদের সিনেমা আটকে যায় কম্পিউটার স্ক্রিনে, সিডি-ডিভিডি প্লেয়ারে। এখন আটকে গেছে মোবাইলের স্ক্রিনে। হলকেন্দ্রিক সিনেমার সঙ্গে ধীরে ধীরে আমাদের নির্দয় বিচ্ছেদ ঘটে গেলো!

একসময় ঈদ বা পূজায় টিকিট কাটতে গিয়ে কাউন্টারে হাত ভাঙার জোগাড় হতো। সেখানে আর দর্শকের হুল্লোড় নেই। পুরি-সিঙারার দোকানে কোনো ভীড় নেই। আমাদের চোখের সামনে একের পর এক বন্ধ হয়ে গেলো সিনেমা হল। ‘সিনেমা’ নামক ব্যাপারটাই কি লুপ্ত হয়ে গেলো! সিনেমা হলের পর্দা যে একবার নামল তারপর আর উঠলই না। এখন ‘লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন’ বলে মাঝে মাঝে নিজের স্মৃতিগুলোকেই জোড়া দেই, রিল বানাই। একে বলি, ব্যক্তিগত স্মৃতির নিজস্ব সিনেমা। এই সিনেমা এখনও চলছে সগৌরবে!

leadT1ad

সম্পর্কিত

leadT1ad
leadT1ad