leadT1ad

জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস

চলচ্চিত্র শিক্ষায় স্থবিরতা

স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশে গত এক দশকে চলচ্চিত্র নিয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিধি কাগজে-কলমে বাড়লেও, বাস্তব চিত্র বলছে—প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, লোকবল সংকট এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কবলে পড়ে প্রায় স্থবির হয়ে আছে। চলচ্চিত্র নির্মাণের কারিগর তৈরির সূতিকাগারগুলোর অবস্থা খুবই জরাজীর্ণ।

আজ ৩ এপ্রিল, জাতীয় চলচ্চিত্র দিবসে এসব আলোচনা আবার সামনে এসেছে। ১৯৫৭ সালের এই দিনে তৎকালীন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (এফডিসি) বিল উত্থাপন করেছিলেন। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ২০১২ সাল থেকে প্রতি বছর দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে।

Ad 300x250

দেশের চলচ্চিত্র শিক্ষার প্রসারে সরকারি উদ্যোগে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘বাংলাদেশ ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট’ (বিসিটিআই)। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান চিত্র হতাশাজনক। এই ইনস্টিটিউটের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এখন প্রায় অকার্যকর। বিসিটিআইয়ের ফেসবুক পেজে শেষ পোস্ট দেওয়া হয়েছে গত ১৫ মার্চ। ইউটিউব চ্যানেলের অবস্থা আরও শোচনীয়; এক বছর ধরে কোনো নতুন ভিডিও নেই, সাবস্ক্রাইবার মাত্র ৩৮০ জন।

বাংলাদেশ ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট’ (বিএফটিআই)। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট’ (বিএফটিআই)। ছবি: সংগৃহীত

বিসিটিআইয়ের প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের উপপরিচালক মো. মোকছেদ হোসেনের বক্তব্যে এই সংকটের গভীরতা স্পষ্ট হয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের লোকবল সংকট। অনিয়মিতভাবে যারা কাজ করতেন তাদেরও কন্টাক্ট শেষ হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠান বাঁচাতে গেলে প্রজেক্ট চালু করা দরকার। কিন্তু প্রজেক্ট চালু হবে কিনা, তাও আমরা জানি না।’ এমনকি নিজস্ব অবকাঠামো সংকটে জাতীয় গণমাধ্যমক ইনস্টিটিউটের (নিমকো) একটি ক্যাফেটেরিয়ায় এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কোনো আয়োজন নেই। আলাদা কোনো গবেষণাও এখানে হয় না। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গ্যাঁড়াকলে পড়ে এটি একটি ‘মৃতপ্রায়’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট (যেখানে বিসিটিআই গড়ে উঠেছে) থেকে ২০১০-১১ সেশনে কোর্স করেছিলেন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা বিপ্লব সরকার। তাঁর মতে, আগে মানজারে হাসীন মুরাদ, সালাউদ্দিন জাকী বা মহিউদ্দিন ফারুকের মতো গুণী শিক্ষকেরা থাকলেও পরবর্তী সময়ে সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল সমস্যা ছিল কারিকুলাম। কোনো কারিকুলাম ঠিক ছিল না। প্রযুক্তিগত কোনো সুবিধা ছিল না। এখনও অবশ্য নেই। আর এখন তো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রতিষ্ঠানটি মৃতপ্রায়।’ মাত্র তিন বা ছয় মাসের কোর্সে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ না থাকায় দক্ষ নির্মাতা তৈরি হচ্ছে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

গত দেড় দশকে চলচ্চিত্র শিক্ষা বিভাগগুলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে পারেনি। অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যোগ্যতার চেয়ে ‘রাজনৈতিক আনুগত্য’কে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ বলছেন, চলচ্চিত্র একটি কারিগরি ও সংবেদনশীল বিষয় যেখানে বৈশ্বিক সিনেমার নন্দনতত্ত্ব ও ব্যাকরণ জানা জরুরি। কিন্তু দলীয় প্যানেল থেকে আসা অনেক শিক্ষক ক্লাসে সিনেমার ব্যাকরণের চেয়ে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা বা দলীয় আদর্শ প্রচারে বেশি আগ্রহী ছিলেন। যোগ্য, পেশাদার ও গবেষকদের বাদ দিয়ে ‘নিজেদের লোক’ দিয়ে ক্লাস নেওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

গবেষণার বেহাল দশা

বাংলাদেশে সিনেমা নিয়ে উচ্চতর গবেষণার (এমফিল/পিএইচডি) ক্ষেত্রটিও অত্যন্ত সংকীর্ণ। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের পরিচালক ফারহানা রহমান জানান, তারা প্রতি বছর ১০ জনকে ফেলোশিপ দিলেও শেষ পর্যন্ত ৩-৪ জন তা শেষ করতে পারেন। আর্কাইভের রিসোর্স ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও আধুনিক ডিজিটাইজড ব্যবস্থার অভাবে গবেষকরা পিছিয়ে পড়ছেন। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্রের ওপর আলাদা কোনো রিসার্চ জার্নাল নেই। ফলে আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র সমালোচক বা তাত্ত্বিক এ দেশে তৈরি হচ্ছে না।

জাতীয় চলচ্চিত্র দিবসে যত আয়োজন

জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস উপলক্ষে বিএফডিসিতে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বিএফডিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা হিমাদ্রি বড়ুয়া জানান, ৩ এপ্রিল সকাল ১০টায় র‍্যালি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা এবং দুপুর ২টায় চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন রয়েছে। তবে বিএফডিসি ঘটা করে দিবসটি পালন করলেও মূল কারিগর তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিরাজ করছে স্থবিরতা।

জানা যায়, চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে দিবসটি পালিত হচ্ছে না। যেমন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিটিউট, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো ধরনের আয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন সেখানকার কর্মকর্তারা।

চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মতে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে, রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ এবং আধুনিক কারিগরি সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিক্ষা কেবল ডিগ্রি প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, প্রকৃত মানের নির্মাতা তৈরি হবে না।

leadT1ad

সম্পর্কিত

leadT1ad
leadT1ad