পাবনার সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী গ্রাম জোতকাকুড়িয়া। চৈত্রের কাঠফাটা রোদে শুকিয়ে যাওয়া পদ্মার ধূ ধূ বালুচর আর হাঁটুজল পাড়ি দিয়ে এখানে পৌঁছাতে হয় মাইলের পর মাইল পথ হেঁটে। বর্ষায় নৌকা চললেও শুষ্ক মৌসুমে এই জনপদ হয়ে পড়ে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। কৃষিপণ্য পরিবহন কিংবা মুমূর্ষু রোগী—সবার জন্যই তখন ঘোড়ার গাড়িই একমাত্র ভরসা।
গ্রামের বাসিন্দা সুজন বিশ্বাস গত বছর ঠিক সময়ে প্রসূতি স্ত্রীকে হাসপাতালে নিতে না পারায় অনাগত সন্তানকে হারান তাঁরা। আবেগতাড়িত হয়ে তিনি বলছিলেন, ‘গতবার সন্তান হারিয়ে শিক্ষা হয়েছে। এবার স্ত্রীর প্রসবের তারিখ এই মাসের শেষে। তাই কোনো ঝুঁকি না নিয়ে আগেই তাকে নদীর ওপারে শ্বশুরবাড়িতে রেখে এসেছি।’
জোতকাকুড়িয়ার মতো পাবনার সদর, সুজানগর ও বেড়া উপজেলার নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে এমন ধূসর, দুর্গম প্রায় বিচ্ছিন্ন জনপদে অন্তত দুই লাখ মানুষের বসতি। এই আধুনিক যুগেও যেখানে জীবন থমকে আছে আদিম এক স্বাস্থ্য-সংকটে। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, চিকিৎসক-সেবাকেন্দ্রের অভাবে ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত পদ্মা যমুনা চরাঞ্চলের এই মানুষেরা। এখানে সাধারণ রোগের চিকিৎসাই দুঃসাধ্য লড়াই, আর হৃদরোগ, বড় দুর্ঘটনা কিংবা মাতৃত্বকালীন আকস্মিক জটিলতায় চিকিৎসাপ্রাপ্তি চরবাসীর কাছে যেন ‘সোনার হরিণ’। প্রকৃতির খেয়ালে নদীর ভাঙাগড়ায় যাদের আজন্ম মিতালি, রোগে শোকে তাদের জীবনের প্রতিটি গল্পই যেন বৈষম্য আর বঞ্চনার আখ্যান।
সরেজমিনে কয়েকটি চরের ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে প্রমাণ মিলল সে দৈন্যদশার। যেমন ১৫ বছরের প্রতিবন্ধী তানিয়া, যার উন্নত পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়মিত চিকিৎসা প্রয়োজন; কিংবা বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত সত্তরোর্ধ্ব আক্কাস বিশ্বাস, যাকে প্রায়ই হাসপাতালে নিতে হয়। কিন্তু দুর্গম পথ আর যাতায়াত খরচের ভার বইতে না পেরে থমকে যায় তাদের চিকিৎসা। গর্ভবতী মা ও শিশুদের জন্য নেই কোনো প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা। সাপে কাটা বা দুর্ঘটনার মতো জরুরি মুহূর্তে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অনেক সময় ফুরিয়ে যায় চরের মানুষের আয়ু।
তানিয়ার কৃষক বাবা আব্দুল মান্নান বলেন, ‘শহরের প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের বাবা-মা কতরকম চিকিৎসা দেয়। হয়তো সঠিক চিকিৎসা পেলে আমার সন্তানও অনেকটা সুস্থ হতো। কিন্তু আমার মতো কৃষকের পক্ষে ঘোড়ার গাড়ি, নৌকা, ভ্যান এসব মিলিয়ে শহরের হাসপাতালে যেতেই ৭০০ টাকার মতো লাগে। কাজ ফেলে রোজ অত দূরে কীভাবে যাই?’
চরবাসীর জন্য হার্ট অ্যাটাক বা জরুরি কোনো শারীরিক সংকটে সময় পাওয়াটা যেন অনেকটা অসম্ভব। বিশেষ করে প্রসূতি মায়েদের জন্য দুর্গম এই পথ পাড়ি দেওয়া নরক যন্ত্রণার চেয়ে কম কিছু নয়। দীর্ঘ পথ আর যানবাহনের তীব্র ঝাঁকুনিতে অনেক সময় গর্ভেই প্রাণ হারায় অনাগত সন্তান।
একই সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরে সোবহান বিশ্বাস জানালেন, ‘দুই নাতনির জন্মের সময় রাতে ব্যথা উঠলে কোনো উপায় ছিল না। পুরো জীবনটাই যেন তখন আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া। একবার ভাইয়ের বউয়ের প্রসব বেদনা উঠলে ঘরের কপাট খুলে, দুই পাশে বাঁশ ও রশি বেঁধে কাঁধে নিয়ে দুই ঘণ্টা ধরে নদী পার করেছি।’
কৃষিপণ্য পরিবহন কিংবা মুমূর্ষু রোগী—সবার জন্য ঘোড়ার গাড়িই একমাত্র ভরসা। স্ট্রিম ছবিচর মধুপুরের প্রবীণ বাসিন্দা আফতাব মিঞার অভিজ্ঞতায় এই চিত্র আরও করুণ। ৬৫ বছরের জীবনে তিনি নিজ গ্রামেই অন্তত ১০টি শিশুকে সঠিক সময়ে হাসপাতালে নিতে না পারার কারণে মারা যেতে দেখেছেন।
কাগজে-কলমে স্বাস্থ্যসেবা প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর দাবি করা হলেও, বাস্তবে এসব এলাকায় নেই কোনো সচল কমিউনিটি ক্লিনিক। স্থানীয় বরাদ্দের ক্ষেত্রেও চরম বৈষম্যের শিকার চরবাসী। ভাঁড়ারা ইউপি চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ খান বলেন, ‘বইয়ে পড়েছিলাম ঈশ্বর থাকেন ভদ্রপল্লীতে, আমাদের নীতিনির্ধারকদের অবস্থাও হয়েছে তাই। চরের ভাগ্যহত মানুষগুলোর জন্য আলাদা পরিকল্পনা, বরাদ্দের জন্য বারবার বলেও কাজ হয়নি।’
একই চিত্র বেড়া উপজেলার যমুনার চরগুলোতেও। হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের চরনাগদহ ও চরপেঁচাকোলা; নতুন ভারেঙ্গা ইউনিয়নের চরসাফুল্লা, পূর্বশ্রীকন্ঠদিয়া ও আগবাগসোয়ারচর; এবং পুরান ভারেঙ্গা ইউনিয়নের চরকল্যানপুর, পেংগুয়ারচর, দেওলাই, পুকুরপাড়, বোড়ামারা, বক্তারপুর, সিংহাসন, গোংগাইদারচর ও ঢালারচরসহ বিস্তীর্ণ জনপদে প্রায় এক লাখ মানুষের বসবাস। নদীপথের খেয়া পারাপারই এই বিশাল জনগোষ্ঠীর যাতায়াতের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার চরম দুরবস্থার কারণে আধুনিক সব নাগরিক সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অবহেলা এখানকার মানুষের জীবনকে দিন দিন আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
নতুন ভারেঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান আবু দাউদ জানান, চরগুলোতে সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য নামমাত্র যে কয়টি কমিউনিটি ক্লিনিক বা প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে, সেগুলোর অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। সংকটাপন্ন রোগীদের সেবা দেওয়া তো দূরের কথা, এসব কেন্দ্রে সামান্য কিছু সাধারণ ওষুধ ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। ফলে সামান্য অসুস্থতাও চরের মানুষের জন্য দীর্ঘ ভোগান্তি আর অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বেড়া উপজেলায় একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবলের অভাবে সেটি পানিতে নামার আগেই পড়ে আছে অযত্নে। চুরি হয়ে গেছে ইঞ্জিনসহ কলকবজা।
পাবনা সিভিল সার্জন মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ভৌগোলিক প্রতিকূলতার প্রতিবন্ধকতা কাটাতে স্বাস্থ্যনীতিতে চরাঞ্চলের জন্য আলাদা পরিকল্পনা প্রয়োজন। দুর্গম চর বা বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে সপ্তাহে অন্তত দুদিন ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা পেলে আমরা এটি বাস্তবায়ন করতে পারব।’
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জান চৌধুরী বলেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে কাজের পরিধি বাড়ছে। মোট জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয়ের কথা ভাবছে সরকার। এর আওতায় বিচ্ছিন্ন এলাকার বা চিকিৎসা সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতের উদ্যোগও নেওয়া হবে।