leadT1ad

রাজশাহী বিভাগের ২৬ এলাকায় ছড়াচ্ছে হাম, আক্রান্তের বেশিরভাগই শিশু

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাজশাহী

প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১১: ২১
স্ট্রিম ছবি

রাজশাহী বিভাগে সংক্রামক রোগ হাম নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইতোমধ্যে বিভাগের ২৬টি এলাকায় রোগটির প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হয়েছে এবং আক্রান্তদের বড় একটি অংশই ছয় মাসের কম বয়সী শিশু। তবে শুধু শিশু নয়, বড়রাও এই সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না। বৃহস্পতিবারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৪.৭০ শতাংশে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হাসপাতালে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রোববার থেকে শুরু হচ্ছে টিকাদান কার্যক্রম।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ৫২০ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে ১৪৩ জনের শরীরে হামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বর্তমানে বিভাগজুড়ে ২২৯ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের মধ্যে কেউ নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত, আবার কেউ উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন।

Ad 300x250

স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, যেসব এলাকায় একাধিক রোগী শনাক্ত হয়েছে সেগুলোকে প্রাদুর্ভাব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এমন ২৬টি এলাকা ইতোমধ্যে শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পাবনায় সর্বোচ্চ ১০টি এলাকা আক্রান্ত। রাজশাহীতে রয়েছে ছয়টি এলাকা, যার পাঁচটিই মহানগরীর ভেতরে। এছাড়া নওগাঁয় পাঁচটি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে তিনটি এবং নাটোর ও সিরাজগঞ্জে একটি করে এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে আক্রান্ত এলাকার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান স্ট্রিমকে জানান, যেসব এলাকায় একাধিক রোগী পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোকে ‘আউটব্রেক এরিয়া’ হিসেবে বিবেচনা করে সেখানে টিকাদান কার্যক্রমে বিশেষ জোর দেওয়া হবে।

এদিকে হামের রোগী বেড়ে যাওয়ায় চাপ বেড়েছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে। শুধু রাজশাহী নয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, ফরিদপুর ও রাজবাড়ী জেলা থেকেও রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসছেন। এই হাসপাতালে প্রতিদিনই বাড়ছে ভর্তি রোগীর সংখ্যা। গত কয়েকদিনের ব্যবধানে হাসপাতালে ভর্তি রোগী ৯৩ জন থেকে বেড়ে ১৩২ জনে পৌঁছেছে। গত বুধবার দুপুর থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত নতুন ভর্তি হয়েছেন ২০ জন, ছাড়পত্র পেয়েছেন মাত্র চারজন।

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস স্ট্রিমকে জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৪০ শয্যার একটি পৃথক হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি শিশু ও মেডিসিন বিভাগের প্রতিটি ওয়ার্ডে আইসোলেশন কর্নার রাখা হয়েছে। রোগীর চাপ বাড়লে আরও একটি শিশু ওয়ার্ডকে আইসোলেশন ইউনিটে রূপান্তরের প্রস্তুতি রয়েছে। শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (পিআইসিইউ) বেড সংখ্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ১৮টি করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি হাম আক্রান্তদের জন্য নির্ধারিত। সাধারণ শিশু ওয়ার্ডেও অতিরিক্ত অক্সিজেন সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে।

হামের জটিল রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিতে বিকল্প ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে রোগীদের রাজশাহীর হার্ট ফাউন্ডেশনে স্থানান্তর করা হচ্ছে, যদিও চিকিৎসা দিচ্ছেন রামেক হাসপাতালের চিকিৎসকরাই। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দুজনকে হার্ট ফাউন্ডেশনে পাঠানো হয়েছে পিআইসিইউ সুবিধার জন্য।

মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি থাকলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, এখন পর্যন্ত অন্তত একজন শিশু হামে মারা গেছে। উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা যাচাই করা হচ্ছে। সর্বশেষ বুধবার ভোরে নিবিড় পরিচর্যায় থাকা এক শিশুর মৃত্যু হয়। মারা যাওয়া শিশু আব্দুর রহমান চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রাজারামপুর গ্রামের মাহবুর রহমানের ছেলে। ছয় মাস বয়সী এই শিশুকে বাঁচাতে পরিবারটি লম্বা সময় ধরে চিকিৎসা চালালেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে হারাতে হয়।

চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্করাও রয়েছেন। আইসোলেশন সেন্টারে ৫০ বছর বয়সী রিকশাচালক মো. কাইমুদ্দীন, ৩৫ বছর বয়সী কৃষক বদরুল ইসলাম এবং ১৪ বছর বয়সী কিশোর শাহাদী ইসলামসহ কয়েকজন বড় রোগীও হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ার মতো জটিলতাও দেখা যাচ্ছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। যদিও রাজশাহীতে নতুন টিকা আসেনি। তবে আগে থেকে মজুত ৩৮ হাজার ৫৯০ ডোজ দিয়েই রোববার থেকে কার্যক্রম শুরু হবে।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জেলার ৫৬ হাজার ৪৯০ জন শিশু ৯ মাস বয়সে হামের প্রথম ডোজ টিকা পেয়েছে। ১৫ মাস বয়সে পেয়েছে ৫৫ হাজার ৫০৩ জন শিশু। আর ২০২৫ সালে ৫৯ হাজার ২৫৯ জন প্রথম ডোজ ও ৫৮ হাজার ৩০২ জন দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে। এবার ছয়মাস বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া শুরু হচ্ছে।

তবে রামেক হাসপাতালের আইসোলেশন সেন্টারে দেখা গেছে, চিকিৎসা নিতে আসা বেশিরভাগ শিশুর বয়স ৬ মাসের কম। আর ৬৫ শতাংশ শিশু ৯ মাসের আগেই আক্রান্ত হয়েছে। এ অবস্থায় ৬ মাস বয়স পর্যন্ত টিকা দিয়ে হাম নিয়ন্ত্রণ কতটা সম্ভব হবে জানতে চাইলে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘হবে। এটা করোনার মতো ছড়িয়ে পড়বে না। কারণ করোনার সময় আমাদের হাতে টিকা ছিল না। এখন শুরুতেই টিকা আছে। টিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সংক্রমণ কমাতে পারলে ৬ মাসের নিচের শিশুরাও আক্রান্ত হবে না।’

leadT1ad

সম্পর্কিত

leadT1ad
leadT1ad