আপনার জীবনের প্রথম স্মৃতি কোনটি? খুব বেশিকিছু হয়ত আপনার মনে পড়বে না। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, দুই বা তিন বছর বয়সের আগের কোনো কথা আমাদের মনে থাকে না। কখনো কি ভেবে দেখেছেন কেন এমন হয়?
ফাবিহা বিনতে হক

আপনার জীবনের প্রথম স্মৃতি কোনটি? একটু শান্ত হয়ে ভেবে দেখুন তো। খুব বেশিকিছু হয়ত আপনার মনে পড়বে না। যেমন ধরুন, আমার জীবনের প্রথম স্মৃতিটি বেশ মজার। আমার ছোট ভাইকে প্রথমবার হাসপাতাল থেকে বাড়িতে আনা হচ্ছিল। বাবা আর মা তাকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিলেন। তাকে একটা সুন্দর নীল রঙের দোলনায় রাখা হলো। তখন আমার বয়স ছিল আড়াই বছর। স্মৃতিটা যে খুব পরিষ্কার এমন নয়।
আপনার ক্ষেত্রেও হয়ত ঠিক এমনটাই ঘটেছে। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, দুই বা তিন বছর বয়সের আগের কোনো কথা আমাদের মনে থাকে না। মানুষের জীবনের প্রথম স্মৃতিগুলো সাধারণত কোনো বিশেষ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকে। অথবা কোনো আবেগের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকে। যেমন আমার ক্ষেত্রে ছিল ছোট ভাইয়ের পৃথিবীতে আসার দিনটি। কিন্তু এর আগের সময়টা যেন আমাদের মন থেকে একদম মুছে গেছে। কখনো কি ভেবে দেখেছেন কেন এমন হয়?
জীবনের প্রথম দুই-তিন বছরের কথা ভুলে যাওয়ার এই ব্যাপারকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ইনফ্যান্টাইল অ্যামনেশিয়া’। বাংলায় একে ‘শৈশব স্মৃতিভ্রম’ বলা যায়। মানুষ কেন তাঁর জীবনের প্রথম বছরগুলোর কথা মনে রাখতে পারে না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের অনেক কৌতূহল আছে। এর সঠিক উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে এ বিষয়ে বেশ কিছু গবেষণা আছে। রয়েছে বেশকিছু তত্ত্বও।
আগে মানুষ ভাবত ছোট শিশুরা হয়ত কোনো স্মৃতিই তৈরি করতে পারে না। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন এই ধারণা ভুল। ছোট শিশুরাও চারপাশের অনেককিছু মনে রাখতে পারে। তারা মায়ের মুখ চিনে ফেলে। দুই-তিন মাস বয়সেই পরিচিত মানুষ দেখলে হাসে। এর মানে হলো, প্রিয় মানুষদের তারা ঠিকই চিনতে পারছে, মনেও রাখতে পারছে।
শিশুরা আসলেই কতটা মনে রাখতে পারে—এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্যারোলিন রোভি কলিয়ার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তিনি ছয় মাসের কম বয়সী কয়েকজন শিশুকে নিয়ে কাজ শুরু করেন। প্রথমে তিনি শিশুদের একটি আরামদায়ক দোলনায় শুইয়ে দেন। এরপর তাদের মাথার ওপরে একটি সুন্দর খেলনা ঝুলিয়ে দেন। খেলনাটি এমনভাবে রাখা হয় যাতে শিশুদের সহজেই নজর কাড়ে।
এরপর ক্যারোলিন সুতো হাতে নেন। সুতোর এক মাথা শিশুর পায়ের সাথে বাঁধেন। অন্য মাথা বাঁধেন ওপরের খেলনায়। শিশুরা পা ছুঁড়লেই খেলনাটি নড়ে ওঠে। বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার ফলে শিশুরা খুব দ্রুত ব্যাপারটা বুঝে ফেলে। তারা বুঝতে পারে পা ছুঁড়লেই ওপরের খেলনাটা নড়ছে। তাই তারা মনের আনন্দে আগের চেয়ে অনেক বেশি পা ছুঁড়তে থাকে।

গবেষক দেখতে চেয়েছিলেন, শিশুরা এই ব্যাপারটা মনে রাখতে পারে কিনা। একদিন বা দুইদিন পর ওই শিশুদের আবার দোলনায় আনা হয়। অবাক করা ব্যাপার হলো, দুই মাস বয়সী শিশুরাও খেলনাটি দেখামাত্রই আবার পা ছুঁড়তে শুরু করে। এর মানে হলো, শিশুরা একদম ছোটবেলা থেকেই স্মৃতি ধরে রাখতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মনে রাখার সময়ও বাড়তে থাকে।
তাহলে সমস্যা আসলে কোথায়? জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় ভালোবাসাপূর্ণ দিনগুলোর কথা আমাদের মনে থাকে না কেন? গবেষকেরা বলছেন, এর উত্তর লুকিয়ে আছে স্মৃতির ধরনের মধ্যে।
পা ছুঁড়লে খেলনা নড়বে, এটা এক ধরনের স্মৃতি। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘প্রসিডিউরাল মেমোরি’। বাংলায় একে ‘পদ্ধতিগত স্মৃতি’ বলা যায়। কিন্তু আমার ছোট ভাইকে বাড়িতে আনার স্মৃতি অন্যরকম। এটা আমার নিজের জীবনের একটি ঘটনার স্মৃতি। একে বলা হয় 'অটোবায়োগ্রাফিক্যাল মেমোরি'। বাংলায় একে আত্মজৈবনিক স্মৃতি বলে। এই দুই ধরনের স্মৃতি একদম আলাদা।
একটা বিষয় খেয়াল করবেন, জীবনের বিশেষ কোনো ঘটনা মনে রাখার জন্য সময়ের হিসাব বুঝতে হয়। অর্থাৎ কোন সময়ে ঘটনাটি ঘটেছে। সেসময় শীতকাল ছিল না গ্রীষ্মকাল কিংবা দিন ছিল না রাত, সবই আমাদের মনে থাকে।
কিন্তু ছোট শিশুদের সময়ের কোনো ধারণা থাকে না। গবেষকেরা বলছেন, নিজের জীবনের গল্প মনে রাখার জন্য নিজেকে বুঝতে হয়। নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হয়। আঠারো মাস বয়সের আগে শিশুদের আত্ম-চেতনা পুরোপুরি গড়ে ওঠে না।
স্মৃতি ধরে রাখার ক্ষেত্রে ভাষার ভূমিকাও অনেক বড়। বারো থেকে আঠারো মাস বয়সের আগে শিশুদের ভাষা দিয়ে স্মৃতি সংগঠিত করার ক্ষমতা খুব সীমিত থাকে। আর ভাষা না থাকলে দীর্ঘস্থায়ী ব্যক্তিগত স্মৃতি গড়ে তোলা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
শৈশবের স্মৃতি মনে রাখতে না পারার আরেকটি বড় কারণ হলো আমাদের মস্তিষ্ক। আমাদের মস্তিষ্কের গঠন বেশ জটিল। এর ভেতরে অনেক ছোট ছোট অংশ আছে। স্মৃতি ধরে রাখার জন্য মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অংশ কাজ করে। এই অংশটির নাম হলো ‘হিপোক্যাম্পাস’। কোনো ঘটনা ঘটলে এই হিপোক্যাম্পাস তা মস্তিষ্কে জমা করে রাখে।
কিন্তু জন্মের পরপর মস্তিষ্কের এই অংশটি পুরোপুরি তৈরি হয় না। এটি ধীরে ধীরে বড় হয়। এর কাজ করার ক্ষমতাও ধীরে ধীরে বাড়ে। যেহেতু প্রথম দুই তিন বছর হিপোক্যাম্পাস পুরোপুরি পরিণত থাকে না, তাই এই সময়ের স্মৃতিগুলোও শিশুর মস্তিষ্কে স্মৃতি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ কঠিন হয়। এই কারণেই জীবনের প্রথম দুই-তিন বছরের স্মৃতিগুলো বড় হয়ে আমরা সাধারণত মনে করতে পারি না।

মাঝেমধ্যে আমরা কেউ কেউ দাবি করি, দুই বছর বয়সের আগের অনেক কথা আমাদের মনে আছে। গবেষকেরা বলছেন, আসলে এগুলো পুরোপুরি আমাদের নিজেদের স্মৃতি নয়। বড়দের মুখে গল্প শুনতে শুনতে আমাদের মনের ভেতর একটি ছবি তৈরি হয়। আমরা ভাবি কথাগুলো আমাদের মনে আছে।
আমার প্রথম স্মৃতির ক্ষেত্রেও এমনটা হতে পারে। হয়ত কিছু অংশ সত্যি। আর বাকিটা হয়ত আমার মায়ের বলা গল্পের প্রভাব।
আমাদের স্মৃতি কোনো ভিডিও রেকর্ডিং নয়। ভিডিও যেমন সব সময় একই থাকে, আমাদের মনের স্মৃতিগুলো সবসময় তেমন থাকে না। এটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হয়ে যায়। অনেক সময় স্মৃতি বদলে যায়। বিশেষ করে ছোট শিশুরা অন্যের কথায় খুব দ্রুত প্রভাবিত হয়।
শিশুদের স্মৃতি কতটা দুর্বল হতে পারে, তা নিয়ে গবেষক স্টিফেন সিসি এবং তাঁর দলের গবেষণা আছে। তাঁরা প্রি-স্কুল বয়সী শিশুদের নিয়ে পরীক্ষা করেন। স্কুলে গিয়ে শিশুদের কাছে গল্প বলেন। গল্পটি ছিল স্যাম স্টোন নামের একজন মানুষকে নিয়ে। তাঁকে খুব বোকা আর মজার মানুষ হিসেবে গল্পে তুলে ধরা হয়। শিশুদের বলা হয়, সে অনেক অদ্ভুত কাণ্ড করে বেড়ায়।
শিশুরা খুব আগ্রহ নিয়ে গল্প শোনে। এর কিছুদিন পর সত্যি সত্যি একজন মানুষ তাদের ক্লাসে আসেন। তাঁর নাম ছিল স্যাম স্টোন। কিন্তু তিনি কোনো মজার কাণ্ড করেননি। তিনি একদম চুপচাপ ক্লাসের এক কোণায় বসে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি চলে যান।
আরও কিছুদিন পর গবেষকরা শিশুদের কাছে স্যাম স্টোনের বিষয়ে জানতে চান। তাঁরা জানতে চান ক্লাসে এসে স্যাম স্টোন কী করেছিল। শিশুরা তখন এমন সব অদ্ভুত গল্প বলতে শুরু করে যা আদৌ ঘটেনি। গবেষকরা বারবার বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন করলে শিশুরা আরও বেশি ভুল তথ্য দেয়। এই পরীক্ষা থেকে গবেষকেরা বুঝতে পারেন, শিশুদের স্মৃতি খুব সহজেই অন্যের কথায় বদলে যায়। তাঁরা সহজেই ভুল স্মৃতি তৈরি করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, একদম ছোটবেলায় আমরা স্মৃতি তৈরি করতে পারি ঠিকই। কিন্তু সেগুলো গল্প বলার মতো স্মৃতি নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অনেক স্মৃতি আমরা পরে মনে করতে পারি না বা পরিবর্তিত হয়ে যায়। অনেক স্মৃতি আবার নতুন রূপ পায়। তাই ছোটবেলার স্মৃতি খুঁজে পাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হয়ত গল্পই—পরিবারের মানুষের মুখে শোনা গল্প। সেসব গল্পের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে আমাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশব।

আপনার জীবনের প্রথম স্মৃতি কোনটি? একটু শান্ত হয়ে ভেবে দেখুন তো। খুব বেশিকিছু হয়ত আপনার মনে পড়বে না। যেমন ধরুন, আমার জীবনের প্রথম স্মৃতিটি বেশ মজার। আমার ছোট ভাইকে প্রথমবার হাসপাতাল থেকে বাড়িতে আনা হচ্ছিল। বাবা আর মা তাকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিলেন। তাকে একটা সুন্দর নীল রঙের দোলনায় রাখা হলো। তখন আমার বয়স ছিল আড়াই বছর। স্মৃতিটা যে খুব পরিষ্কার এমন নয়।
আপনার ক্ষেত্রেও হয়ত ঠিক এমনটাই ঘটেছে। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, দুই বা তিন বছর বয়সের আগের কোনো কথা আমাদের মনে থাকে না। মানুষের জীবনের প্রথম স্মৃতিগুলো সাধারণত কোনো বিশেষ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকে। অথবা কোনো আবেগের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকে। যেমন আমার ক্ষেত্রে ছিল ছোট ভাইয়ের পৃথিবীতে আসার দিনটি। কিন্তু এর আগের সময়টা যেন আমাদের মন থেকে একদম মুছে গেছে। কখনো কি ভেবে দেখেছেন কেন এমন হয়?
জীবনের প্রথম দুই-তিন বছরের কথা ভুলে যাওয়ার এই ব্যাপারকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ইনফ্যান্টাইল অ্যামনেশিয়া’। বাংলায় একে ‘শৈশব স্মৃতিভ্রম’ বলা যায়। মানুষ কেন তাঁর জীবনের প্রথম বছরগুলোর কথা মনে রাখতে পারে না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের অনেক কৌতূহল আছে। এর সঠিক উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে এ বিষয়ে বেশ কিছু গবেষণা আছে। রয়েছে বেশকিছু তত্ত্বও।
আগে মানুষ ভাবত ছোট শিশুরা হয়ত কোনো স্মৃতিই তৈরি করতে পারে না। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন এই ধারণা ভুল। ছোট শিশুরাও চারপাশের অনেককিছু মনে রাখতে পারে। তারা মায়ের মুখ চিনে ফেলে। দুই-তিন মাস বয়সেই পরিচিত মানুষ দেখলে হাসে। এর মানে হলো, প্রিয় মানুষদের তারা ঠিকই চিনতে পারছে, মনেও রাখতে পারছে।
শিশুরা আসলেই কতটা মনে রাখতে পারে—এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্যারোলিন রোভি কলিয়ার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তিনি ছয় মাসের কম বয়সী কয়েকজন শিশুকে নিয়ে কাজ শুরু করেন। প্রথমে তিনি শিশুদের একটি আরামদায়ক দোলনায় শুইয়ে দেন। এরপর তাদের মাথার ওপরে একটি সুন্দর খেলনা ঝুলিয়ে দেন। খেলনাটি এমনভাবে রাখা হয় যাতে শিশুদের সহজেই নজর কাড়ে।
এরপর ক্যারোলিন সুতো হাতে নেন। সুতোর এক মাথা শিশুর পায়ের সাথে বাঁধেন। অন্য মাথা বাঁধেন ওপরের খেলনায়। শিশুরা পা ছুঁড়লেই খেলনাটি নড়ে ওঠে। বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ার ফলে শিশুরা খুব দ্রুত ব্যাপারটা বুঝে ফেলে। তারা বুঝতে পারে পা ছুঁড়লেই ওপরের খেলনাটা নড়ছে। তাই তারা মনের আনন্দে আগের চেয়ে অনেক বেশি পা ছুঁড়তে থাকে।

গবেষক দেখতে চেয়েছিলেন, শিশুরা এই ব্যাপারটা মনে রাখতে পারে কিনা। একদিন বা দুইদিন পর ওই শিশুদের আবার দোলনায় আনা হয়। অবাক করা ব্যাপার হলো, দুই মাস বয়সী শিশুরাও খেলনাটি দেখামাত্রই আবার পা ছুঁড়তে শুরু করে। এর মানে হলো, শিশুরা একদম ছোটবেলা থেকেই স্মৃতি ধরে রাখতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মনে রাখার সময়ও বাড়তে থাকে।
তাহলে সমস্যা আসলে কোথায়? জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় ভালোবাসাপূর্ণ দিনগুলোর কথা আমাদের মনে থাকে না কেন? গবেষকেরা বলছেন, এর উত্তর লুকিয়ে আছে স্মৃতির ধরনের মধ্যে।
পা ছুঁড়লে খেলনা নড়বে, এটা এক ধরনের স্মৃতি। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘প্রসিডিউরাল মেমোরি’। বাংলায় একে ‘পদ্ধতিগত স্মৃতি’ বলা যায়। কিন্তু আমার ছোট ভাইকে বাড়িতে আনার স্মৃতি অন্যরকম। এটা আমার নিজের জীবনের একটি ঘটনার স্মৃতি। একে বলা হয় 'অটোবায়োগ্রাফিক্যাল মেমোরি'। বাংলায় একে আত্মজৈবনিক স্মৃতি বলে। এই দুই ধরনের স্মৃতি একদম আলাদা।
একটা বিষয় খেয়াল করবেন, জীবনের বিশেষ কোনো ঘটনা মনে রাখার জন্য সময়ের হিসাব বুঝতে হয়। অর্থাৎ কোন সময়ে ঘটনাটি ঘটেছে। সেসময় শীতকাল ছিল না গ্রীষ্মকাল কিংবা দিন ছিল না রাত, সবই আমাদের মনে থাকে।
কিন্তু ছোট শিশুদের সময়ের কোনো ধারণা থাকে না। গবেষকেরা বলছেন, নিজের জীবনের গল্প মনে রাখার জন্য নিজেকে বুঝতে হয়। নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হয়। আঠারো মাস বয়সের আগে শিশুদের আত্ম-চেতনা পুরোপুরি গড়ে ওঠে না।
স্মৃতি ধরে রাখার ক্ষেত্রে ভাষার ভূমিকাও অনেক বড়। বারো থেকে আঠারো মাস বয়সের আগে শিশুদের ভাষা দিয়ে স্মৃতি সংগঠিত করার ক্ষমতা খুব সীমিত থাকে। আর ভাষা না থাকলে দীর্ঘস্থায়ী ব্যক্তিগত স্মৃতি গড়ে তোলা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
শৈশবের স্মৃতি মনে রাখতে না পারার আরেকটি বড় কারণ হলো আমাদের মস্তিষ্ক। আমাদের মস্তিষ্কের গঠন বেশ জটিল। এর ভেতরে অনেক ছোট ছোট অংশ আছে। স্মৃতি ধরে রাখার জন্য মস্তিষ্কের একটি বিশেষ অংশ কাজ করে। এই অংশটির নাম হলো ‘হিপোক্যাম্পাস’। কোনো ঘটনা ঘটলে এই হিপোক্যাম্পাস তা মস্তিষ্কে জমা করে রাখে।
কিন্তু জন্মের পরপর মস্তিষ্কের এই অংশটি পুরোপুরি তৈরি হয় না। এটি ধীরে ধীরে বড় হয়। এর কাজ করার ক্ষমতাও ধীরে ধীরে বাড়ে। যেহেতু প্রথম দুই তিন বছর হিপোক্যাম্পাস পুরোপুরি পরিণত থাকে না, তাই এই সময়ের স্মৃতিগুলোও শিশুর মস্তিষ্কে স্মৃতি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ কঠিন হয়। এই কারণেই জীবনের প্রথম দুই-তিন বছরের স্মৃতিগুলো বড় হয়ে আমরা সাধারণত মনে করতে পারি না।

মাঝেমধ্যে আমরা কেউ কেউ দাবি করি, দুই বছর বয়সের আগের অনেক কথা আমাদের মনে আছে। গবেষকেরা বলছেন, আসলে এগুলো পুরোপুরি আমাদের নিজেদের স্মৃতি নয়। বড়দের মুখে গল্প শুনতে শুনতে আমাদের মনের ভেতর একটি ছবি তৈরি হয়। আমরা ভাবি কথাগুলো আমাদের মনে আছে।
আমার প্রথম স্মৃতির ক্ষেত্রেও এমনটা হতে পারে। হয়ত কিছু অংশ সত্যি। আর বাকিটা হয়ত আমার মায়ের বলা গল্পের প্রভাব।
আমাদের স্মৃতি কোনো ভিডিও রেকর্ডিং নয়। ভিডিও যেমন সব সময় একই থাকে, আমাদের মনের স্মৃতিগুলো সবসময় তেমন থাকে না। এটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হয়ে যায়। অনেক সময় স্মৃতি বদলে যায়। বিশেষ করে ছোট শিশুরা অন্যের কথায় খুব দ্রুত প্রভাবিত হয়।
শিশুদের স্মৃতি কতটা দুর্বল হতে পারে, তা নিয়ে গবেষক স্টিফেন সিসি এবং তাঁর দলের গবেষণা আছে। তাঁরা প্রি-স্কুল বয়সী শিশুদের নিয়ে পরীক্ষা করেন। স্কুলে গিয়ে শিশুদের কাছে গল্প বলেন। গল্পটি ছিল স্যাম স্টোন নামের একজন মানুষকে নিয়ে। তাঁকে খুব বোকা আর মজার মানুষ হিসেবে গল্পে তুলে ধরা হয়। শিশুদের বলা হয়, সে অনেক অদ্ভুত কাণ্ড করে বেড়ায়।
শিশুরা খুব আগ্রহ নিয়ে গল্প শোনে। এর কিছুদিন পর সত্যি সত্যি একজন মানুষ তাদের ক্লাসে আসেন। তাঁর নাম ছিল স্যাম স্টোন। কিন্তু তিনি কোনো মজার কাণ্ড করেননি। তিনি একদম চুপচাপ ক্লাসের এক কোণায় বসে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি চলে যান।
আরও কিছুদিন পর গবেষকরা শিশুদের কাছে স্যাম স্টোনের বিষয়ে জানতে চান। তাঁরা জানতে চান ক্লাসে এসে স্যাম স্টোন কী করেছিল। শিশুরা তখন এমন সব অদ্ভুত গল্প বলতে শুরু করে যা আদৌ ঘটেনি। গবেষকরা বারবার বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন করলে শিশুরা আরও বেশি ভুল তথ্য দেয়। এই পরীক্ষা থেকে গবেষকেরা বুঝতে পারেন, শিশুদের স্মৃতি খুব সহজেই অন্যের কথায় বদলে যায়। তাঁরা সহজেই ভুল স্মৃতি তৈরি করতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, একদম ছোটবেলায় আমরা স্মৃতি তৈরি করতে পারি ঠিকই। কিন্তু সেগুলো গল্প বলার মতো স্মৃতি নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অনেক স্মৃতি আমরা পরে মনে করতে পারি না বা পরিবর্তিত হয়ে যায়। অনেক স্মৃতি আবার নতুন রূপ পায়। তাই ছোটবেলার স্মৃতি খুঁজে পাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হয়ত গল্পই—পরিবারের মানুষের মুখে শোনা গল্প। সেসব গল্পের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে আমাদের হারিয়ে যাওয়া শৈশব।

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্কও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। কমে যায় স্মৃতিশক্তি, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
৩ ঘণ্টা আগে
জেনে অবাক হবেন যে ১০০-১৫০ বছর আগে বৃহত্তর ঢাকায় অর্ধেকের বেশি মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হতো শুধু ‘জ্বর’। চৌকিদারের খাতায় গড়মিল পরিসংখ্যান, দূষিত পানি, ভয়াবহ কলেরা আর সীমিত চিকিৎসা মিলিয়ে কেমন ছিল সেই সময়ের জনস্বাস্থ্য? ১৯১২ সালে প্রকাশিত বি সি অ্যালান-এর ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার (ঢাকা)
৫ ঘণ্টা আগে
অ্যালার্ম দেওয়ার জন্য ফোনটা হাতে নিতেই ভাবি, ‘আচ্ছা, একটু রিলস দেখি… মাত্র পাঁচ মিনিট।’ তারপর কী হয়? পাঁচ মিনিট কখন যে এক ঘণ্টা হয়ে যায়, বুঝতেই পারি না। যখন হুঁশ ফেরে, দেখি রাত অনেক হয়ে গেছে।
৯ ঘণ্টা আগে
নির্মাতা নূরুল আলম আতিকের সঙ্গে কথোপকথনে উঠে এসেছে তাঁর শুরুর দিন, তারেক মাসুদের সঙ্গে পরিচয়, এনালগ থেকে ডিজিটাল হয়ে ওঠার সময়ের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমানের এআই যুগ নিয়ে ভাবনা। একই সঙ্গে তিনি নতুন নির্মাতাদের জন্যও একটি কথা মনে করিয়ে দেন—নিজের মাটির গল্প, নিজের ভাষায় বলার সাহসই সবচেয়ে জরুরি। ঢাকা স্ট্রিমে
১ দিন আগে