leadT1ad

৫০ বছর পর আবার চাঁদে যাচ্ছে মানুষ, কেন?

৫০ বছর পর চাঁদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছে চার নভোচারী। ছবি: নাসার ওয়েবসাইট

১৯৬৯ সালের জুলাই। মানব ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত একটি বাক্য ভেসে আসে চাঁদের মাটি থেকে— ‘একজন মানুষের জন্য ছোট ধাপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য বিশাল এক পদক্ষেপ।’ নীল আর্মস্ট্রংয়ের সেই প্রথম পদচিহ্ন, মানবজাতির এক নতুন ইতিহাস। তবে, এই ঘটনাটি শুধু প্রযুক্তির জয় ছিল না, ছিল এক রাজনৈতিক সময়ের প্রতীক।

অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পর, আবার মানুষ চাঁদের পথে। কিন্তু এই যাত্রা আর আগের মতো নয়। এবারের চন্দ্রাভিযান হচ্ছে মানবজাতির মহাকাশ ভাবনার এক নতুন অধ্যায় শুরু করতে।

Ad 300x250

এবারের চন্দ্রযানের নাম আর্টেমিস-২। ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর আবারও মানববাহী এই যান যাত্রা শুরু করবে স্থানীয় সময় ২ এপ্রিল। এবার এটি চাঁদে অবতরণ করবে না বরং চাঁদের চারপাশে ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসবে। দশ দিনের এই অভিযানে চারজন নভোচারী অংশ নিচ্ছেন। এবারের মিশনে মূলত মহাকাশে মানবযাত্রার প্রযুক্তিগত পরীক্ষা করা হবে। এই মিশনের সাফল্য-ব্যর্থতা থেকেই নির্ধারণ করা হবে আর্টেমিস-৩ এর ভবিষ্যত। কারণ এরপর আর্টেমিস-৩ যাত্রা করবে চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির উদ্দেশ্যে। এছাড়া মানবজাতির মঙ্গলগ্রহে যাত্রার ইচ্ছা তো আছেই!

অ্যাপোলো: প্রতিযোগিতার যুগে বিজয়ের প্রতীক

অ্যাপোলো ১১ প্রথম সফলভাবে চাঁদে অবতরণ করলেও, এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) মধ্যে কে আগে চাঁদে পৌঁছাবে এই প্রতিযোগিতা থেকেই জন্ম নেয় এই মিশন। এখানে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেখানোই ছিল মূল লক্ষ্য।

স্নায়ুযুদ্ধের সময়ই স্পুটনিক ও ইউরি গ্যাগরিনকে প্রথম মানব হিসেবে মহাকাশে পাঠানোর মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রকে এক ধরনের চাপের মধ্যে ফেলে। এর ধারাবাহিকতায়ই ১৯৬১ সালে প্রেসিডেন্ট কেনেডি ঘোষণা দেন এই দশক শেষের আগেই মানুষকে চাঁদে পাঠানো হবে। এমনকি পরে নাসাও স্বীকার করেছে, এটি ছিল শুধু একটি ‘স্পেস রেস’ যার লক্ষ্যই ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে ছাড়িয়ে যাওয়া।

এই প্রেক্ষাপটে অ্যাপোলো ১১ হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রতীকী বিজয়। প্রায় ৬০ কোটি মানুষ যখন সরাসরি এই অবতরণ দেখছিল, তখন এটি ছিল গোটা বিশ্বের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আধিপত্য প্রদর্শনের মুহূর্ত। তাই এটি ছিল শুধুই একটি প্রতিযোগিতা এবং এক শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা।

অনেকেরই হয়তো অজানা, অ্যাপোলো ১১ এর পরেও মানুষ ছয়বার চাঁদে নেমেছে। সেসময় অভিযানগুলোর উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা। শুধু চাঁদে পৌঁছানো ও ফিরে আসা—এই মামুলি লক্ষ্য হওয়ার কারণে ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭ মিশনের মাধ্যমে মানুষের চাঁদে যাওয়া থেমে যায়। বাজেট কমে যাওয়া, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বদল এবং জনআগ্রহ হ্রাস—সব মিলিয়ে চাঁদ হয়ে ওঠে ‘অতীতের অর্জন’।

আর্টেমিস-২: ফিরে আসা নয়, ভবিষ্যতের প্রস্তুতি

এ্যাপোলো থেকে আর্টেমিসের এই লম্বা যাত্রায় পরিবর্তন হয়েছে অভিযানের উদ্দেশ্যও। এ্যাপোলোর লক্ষ্য ছিল বের করা যে, ‘মানুষ কি আসলেও চাঁদে যেতে পারে?’ আর এবারের মূল লক্ষ্য হলো, ‘মানুষ কি সেখানে থাকতে পারে?’

তবে এবার যুক্তরাষ্ট্র রাজনীতির প্রতিযোগিতা ছাপিয়ে সহযোগিতামূলক মনোভাবে এগিয়েছে। এর প্রমাণ হিসেবে আমরা দেখি, নাসা এখন কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির সঙ্গে আন্তর্জাতিক অংশীদার হয়ে কাজ করছে। আর্টেমিসের চারজন নভোচারীর মধ্যেও একজন কানাডার নাগরিক। এই পরিকল্পনায় ভবিষ্যতে আরও দেশ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বৈচিত্র্য

রাজনৈতিক বা অন্য যেকারণেই হোক, এবার অভিযাত্রীদের মধ্যে আছে বেশ বৈচিত্র্য। অ্যাপোলো মিশনে অংশগ্রহণকারী সবাই ছিলেন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ, তবে আর্টেমিসের মিশনে প্রথমবারের মতো যোগ দিচ্ছেন নারী নভোচারী। এছাড়াও আছেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী। আমেরিকান মিশনে অন্যদেশের অংশগ্রহণও এই প্রথম। সেটি হচ্ছে কানাডা।

প্রযুক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গি

আগের অভিযানের সঙ্গে এবারের অভিযানের অন্যতম পার্থক্য হলো, এর সময়সীমা। অ্যাপোলো স্বল্পমেয়াদি অভিযান হলেও আর্টেমিস দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো তৈরির দিকে এগোচ্ছে। এর পরিকল্পনায় আছে চাঁদের কক্ষপথে স্পেস স্টেশন স্থাপন করা। এছাড়াও চাঁদের পৃষ্ঠে স্থায়ী ঘাঁটি ও ভবিষ্যৎ মঙ্গল মিশনের প্রস্তুতিও এর অংশ।

১৯৬৯ সালে চাঁদে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্যে ছিল, কে আগে পৌঁছাতে পারে। তবে এবার তা বদলে হয়েছে মানুষ কি চাঁদে বা মহাকাশে বসতি গড়তে পারবে কি না।

গন্তব্য নয়, এক নতুন সূচনা

চাঁদ এখন আর শুধু গন্তব্য নয়। এটি হয়ে উঠতে চলেছে এক মধ্যবর্তী স্টেশন, পৃথিবী থেকে আরও দূরের যাত্রার জন্য। অ্যাপোলো অভিযানের অর্জন টিকিয়ে রাখাই এবারের লক্ষ্য। ৫০ বছর আগে চাঁদে পা রাখা মানুষ এবার দেখতে চায় সেখানে বসবাস করা যায় কি না। এই যাত্রাই মানুষকে তার অসীম আগ্রহের মহাবিশ্বকে আরও খুঁটিয়ে দেখার রাস্তা করে দেবে, পৃথিবী ছাড়িয়ে মহাবিশ্বের পথে এটি আরেক নতুন ধাপ।

সূত্র: নাসা, সিবিএস নিউজ ও স্পুটনিক

leadT1ad

সম্পর্কিত

leadT1ad
leadT1ad