ডেঙ্গুর একাল-সেকাল, বাঁচবেন যেভাবে

ডেঙ্গু এখন আর কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়, এটি ক্রমেই ভয়াবহ মহামারির রূপ নিচ্ছে। মানুষের জীবনের ডেঙ্গুর ইতিহাস দীর্ঘ। আর বর্তমান বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ও মৃত্যু হার দ্রুত বাড়ছে। ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিরোধও হয়ে উঠছে কঠিন। ফলে জরুরি হয়ে পড়েছে সচেতনতা ও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

‘ডেঙ্গু’ যেভাবে এল

‘ডেঙ্গু’র প্রকোপ বহুকাল ধরেই ছিল। ডেঙ্গুর মতো উপসর্গের প্রথম লিখিত বিবরণ পাওয়া যায় ৯৯২ খ্রিস্টাব্দে, একটি চীনা চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিশ্বকোষে। সেটি চীন রাজবংশের (২৬৫–৪২০ খ্রিস্টাব্দ) শাসন আমলে লেখা হয়েছিল। সেখানে এই রোগকে বলা হয়েছিল ‘জলবিষ’। আর এই রোগ ছড়িয়ে যেত উড়ন্ত পোকামাকড়ের মাধ্যমে ।

১৬৩৫ সালে দক্ষিণ ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ ও ১৬৯৯ সালে মধ্য আমেরিকায় ডেঙ্গু জ্বরের মহামারি দেখা দেয়। ১৭৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শহর ফিলাডেলফিয়ায় আরও একটি বড় ডেঙ্গু মহামারি হয়। এরপর থেকে বিশ শতকের শুরু পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে এই রোগ প্রায় নিয়মিতভাবে দেখা দিতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে শেষ ডেঙ্গু মহামারির ঘটনা ঘটে ১৯৪৫ সালে–নিউ অরলিন্সে।

ডেঙ্গু বিস্তারের ইতিহাস

১৯৪০ সালের আগ পর্যন্ত ডেঙ্গুর মহামারির মধ্যে সাধারণত ১০ থেকে ৪০ বছরের বিরতি থাকত। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেই ধারা বদলে যায়। সৈন্য ও যুদ্ধ সরঞ্জামের চলাচলের মধ্য দিয়ে ডেঙ্গুবাহী মশা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপে পৌঁছে যায়।

সে সময় প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন (পিএএইচও) ব্যাপকভাবে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা নির্মূলের একটি অভিযান চালায়। যার ফলে প্রায় ২০ বছর ডেঙ্গু উধাও ছিল। কিন্তু ১৯৬৪ সালে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপে আবার ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

১৯৭০ সালের আগে মাত্র ৯টি দেশে মারাত্মক ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। বর্তমানে ১০০টির বেশি দেশে ডেঙ্গু ব্যাপকভাবে ছড়াচ্ছে। বিশ্বায়ন, বাণিজ্য, নগরায়ন, ভ্রমণ, নিরাপদ পানির অভাব ও উষ্ণ তাপমাত্রা—সব মিলিয়ে এডিস মশা ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত।

২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানায়, সে বছর ডেঙ্গুর সংক্রমণের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫.২ মিলিয়ন। বছরে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়।

যে মশা ডেঙ্গু ছড়ায়

সাধারণত ‘এডিস ইজিপ্টি’ এবং ‘এডিস এলবোপিকটাস’ নামের দুই ধরনের মশার মাধ্যমে এটি সংক্রমিত হয়। এর উৎস আফ্রিকা না এশিয়া, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো একমত নন। এডিস মশাকে অন্যান্য মশা থেকে আলাদা করা যায়। তাদের দেহে ও পায়ে কালো ও সাদা চিহ্ন রয়েছে। আর এডিস মশা শুধু দিনের বেলাতেই কামড় দেয়।

কীটপতঙ্গ বিশেষজ্ঞ ভি নাগপালেরর মতে, ১৯টি জায়গায় এডিস মশা বেশি বসবাস করে । এগুলো হলো পুরনো টায়ার, লন্ড্রি ট্যাংক, ঢাকনাবিহীন চৌবাচ্চা, ড্রাম বা ব্যারেল, বদ্ধ জলাধার, নির্মাণাধীন ভবনের ব্লক, ফেলে রাখা বোতল ও টিনের ক্যান, গাছের ফোকর ও বাঁশ, দেয়ালে ঝুলে থাকা বোতল, পুরোনো জুতা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত খেলনা, ছাদ, ইটের গর্ত, অপরিচ্ছন্ন সুইমিংপুল ইত্যাদি।

ডেঙ্গু থেকে যেভাবে বাঁচবেন

ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা সবচেয়ে কার্যকর উপায়। জমে থাকা পানি নিয়মিত সরিয়ে ফেলুন। ফুলের টব, টায়ার, বালতি, ছাদ ও বাথরুমে বিশেষ নজর দিন। পানি ঢেকে রাখুন এবং ঝোপঝাড় পরিষ্কার করুন। মশার কামড় থেকে বাঁচতে ফুলহাতা জামা, মশারি, মশারোধী ক্রিম বা জাল ব্যবহার করুন। ঘর পরিষ্কার রাখুন। ডেঙ্গু হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন, প্রচুর পানি পান করুন এবং বিশ্রাম নিন। ব্যথানাশক ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাবেন না। প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে অবশ্যই নির্দিষ্ট ডোজে ও চিকিৎসকের নির্দেশে।

বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৩ হাজার ৯ শ ৩১ জন এবং মারা গেছেন ৫৪ জন। অথচ ২০২৪ সালের একই সময়ে আক্রান্ত ছিলেন ৪ হাজার ২ শ ৮ জন এবং মারা যান ৪৭ জন। এতে দেখা যাচ্ছে, এই বছরের জুলাইয়ের প্রথম ১০ দিনেই রোগী বেড়েছে সাড়ে ৬ গুণ এবং মৃত্যু ৪ গুণ।

শুধু জুলাই মাসের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম ১০ দিনে ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ৬ শ ৩৫ জন এবং মারা গেছেন ১২ জন–যেখানে গত বছর একই সময়ে রোগী ছিলেন ৫৫৭ জন এবং মৃত্যু হয় ৩ জনের।

সবচেয়ে বিপর্যস্ত বরিশাল বিভাগ, যেখানে রোগী বেড়েছে প্রায় ১১ গুণ এবং মৃত্যু দ্বিগুণ। বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বরগুনায়। বরগুনা পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৫টি ওয়ার্ডকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইইডিসিআরবি।

এ ছাড়া ডেঙ্গুর ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। এখন আর আগের মতো সহজে মোকাবিলা করা যাচ্ছে না। বরগুনায় ডেঙ্গুর ডেন-২ ও ডেন-৩ সোরোটাইপের প্রকোপ বাড়ছে বলে জানিয়েছে আইইডিসিআরবি।

সম্পর্কিত